মোঃ মাহবুবুর রহমান খান
নিজ দেশের বদলে পাকিস্তানকে ভালোবাসার ফল পেয়েছে লাখ ত্রিশেক বাঙালি।। লেজুর ভিত্তি করলেও আটচল্লিশ বছরেও এদেরকে নাগরিকত্ব দেয়নি পাকিস্তান সরকার। আর শিক্ষা কর্মসংস্থানের অভাবে মানবেতর জীবন যাপন করছে।
গত কয়েক বছর ধরে দেন দরবার করে পাকিস্তান সরকারের চেষ্টা করে কিছুটা সাফল্য আসবে মনে হচ্ছিল যখন,।ঠিক তখনই পাকিস্তানি বিভিন্ন দল এদেরকে নাগরিকত্ব দেওয়ার বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভে রাজপথে নামে।
এখন সব মিলিয়ে এদের সংখ্যা ৩০ লাখের মতো এদের একটি বড় অংশের বসবাস করাচিতে।
পাকিস্তানপ্রেমী এই বাঙালিরা ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে করাচির ১০৫ টি বস্তিতে।
ওরাংগি টাউন, ইব্রাহিম হায়দার কলোনি, বিল্লাল কলোনি, মুসা কলোনি, জিয়াউল হক কলোনি এবং লেরির বাঙালি পাড়ায় বাঙালি বসতি সবচেয়ে বেশি।
১৯৪৭ সালের দেশ বিভাগের সময়ে পাকিস্তানের ভূখণ্ডের বাইরে থেকে যারা এসেছিলেন তাদেরকে বলা হয় মুহাজির। মুহাজারিয়া পাকিস্তানের জনসংখ্যার প্রায় ৮%।
এদের রাজস্হানি, মারাঠি, কনকানি, হায়দ্রাবাদি বংশোদ্ভূত মুজাহিদের বেশিরভাগই অবস্থান সিন্ধু প্রদেশে ।তবে অন্য জাতিদেরকে মুহাজির হিসেবে একটু সহমর্মিতার দৃষ্টিতে দেখলেও বাঙ্গালীদের কে দেখা হয় চরম অপমান
আর ঘৃণার দৃষ্টিতে।
পাকিস্তানের প্রভাবশালী সংবাদ মাধ্যম ‘দ্যা ডনের’ প্রতিবেদন অনুযায়ী শুধু করাচিতেই পাকিস্তান প্রেমী বাঙ্গালী জনসংখ্যা শহরে মোট জনসংখ্যার ৭.৫ শতাংশ। সংখ্যায় তা ১৫ থেকে ২০ লাখের মত।
তাদের বেশিরভাগ পোশাক শ্রমিক হিসেবে এবংবাসা বাড়িতে কাজ করে। এছাড়া নিম্নমানের কাজ করে মানবেতর জীবন যাপন করে।
এদের পূর্বপুরুষরা ১৯৭১ সালে তখনকার পশ্চিম পাকিস্তানে মুক্তিযুদ্ধের বিরুদ্ধে সোচ্চার ছিল এখনও বাংলাদেশ বিরোধী সভা সমাবেশ করে যাচ্ছে তবুও মন গলছে না পাকিস্তান সরকারের।
মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে বাংলাদেশেও জামাতে ইসলামী মুসলিম লীগ নেজামী ইসলামী পার্টিসহ ধর্মভিত্তিক দলের পাশাপাশি চীনপন্থী কিছু বাম দল দাঁড়িয়ে ছিল বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরুদ্ধে। নিজ দেশের মানুষদের গণহত্যায় করেছে সহযোগিতা।
সে সময় পাকিস্তানের পশ্চিম অংশেও বসবাস করত তো উল্লেখযোগ্য সংখ্যক বাঙালি। এদের একটি অংশযুদ্ধের সময়ও ফিরে আসেন কেউ কেউ আসে যুদ্ধের পরে।
আর একটি অংশ পাকিস্তান প্রেমে মশগুল হয়ে ভুলে যায় নিজ দেশকে। কেবল তাই না পাকিস্তানিদের মন জয়ে বাংলাদেশের দুর্নাম করতে থাকে।
স্বাধীনতার প্রায় চার দশক পর বাংলাদেশে মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারের প্রতিবাদেও পাকিস্তানে ক্ষোভে ফেটে পড়ে একাত্তরের উত্তরসুরিরা। কিন্তু এতসব করেও মর্যাদা অর্জন করতে পারিনি পাকিস্তান প্রেমীরা। ৪৭ বছর পরও অধিকার চেয়ে দ্বারে দ্বারে ঘুরতে হচ্ছে তাদের। নানা ধরনের নিম্নমানের কাজ করে বেঁচে থাকতে হচ্ছে তাদের। নাগরিকত্ব না থাকায় দুর্দশার মাত্রা সীমাহীন।
‘দ্যা ডন’ এর একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নাগরিকত্ব না থাকায় এবং তাদের বৈধ কোন ডকুমেন্টস না থাকায় তারা স্বাধীনভাবে কোন ব্যবসা বা কাজ করতে পারেনা কি। কেউ কেউ গোপনে কাজ করলেও পুলিশের হাতে ধরা খেলে থাকতে হয় কারাগারে। নিম্মমানের
কাজ করা এসব বাঙালিকে পরবর্তীতে ছেড়ে দিলেও মোটা অংকের ঘুষ দিতে হয়। এসব বাঙালিকে জুলফিকার আলী ভুট্টো বৈধতা দিলেও পরে। পুনরায় বৈধ করা হয়নি। তাছাড়া পাকিস্তানের জাতীয় তথ্য রেজিস্ট্রি দপ্তর এনএডিআর থেকে বলা হয় তাদের card নবায়ন করা হবে না। কারণ তারা বাংলাদেশী। পাকিস্তানি নয়। পাকিস্তান প্রেমি বাঙ্গালীদের চলাফেরা এবং সাধারণ কাজকর্ম করার জন্য ‘ন্যাশনাল আইডেন্টি কার্ড’ নামের অস্থায়ী একটি কার্ড দেয়া সরকারি দপ্তর। খুব চড়া দামে প্রাপ্ত এ কার্ডও সকলের ভাগ্যে জোটে না।
খাইরুদ্দিন নামের এক বাঙালি পাকিস্তানের শীর্ষ গণমাধ্যম ‘ডন’ কে দেয়া এক সাক্ষাতকারে বলেন, আমার জন্ম পাকিস্তানে। এখানেই বসবাস করছি। আমার।বাবাও পাকিস্তানে স্থানে বসবাস করছে। বাংলাদেশের সাথে আমাদের কোন সম্পর্ক নেই।
পাকিস্তান প্রেমী বাঙ্গালীদের অধিকার আদায়ে গড়ে ওঠেছে সংগঠন ‘পাকিস্তানি বাঙালি অ্যাকশন কমিটি।’ এদের তথ্য অনুযায়ী করাচির সবচেয়ে বড় জেলে বস্তিতে বসবাস করেন আনুমানিক লক্ষাধিক মানুষ। এদের ৭৫ শতাংশই বাঙ্গালি।
‘পাক মুসলিম এলায়েন্স’ নামের একটি রাজনৈতিক দলের প্রধান খাজা সালমান খাইরুদ্দিন। তার পিতা খাজা খাইরুদ্দিন পাকিস্তান গঠনের সময় অন্যতম নেতা ছিলেন। ১৯৬০ সালে পূর্ব পাকিস্তানের রাজধানী ঢাকার মেয়র ছিলেন খাইরুদ্দিন।
দলটি করাচির বাঙালি সম্প্রদায়ের মধ্যে সক্রিয়। সালমান খাইরুদ্দিন বলেন, বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর অনেক বাঙালি পাকিস্তান ছেড়ে বাংলাদেশের চলে যায়, আবার অনেকে পাকিস্তান থেকে যায়, তারা সেসময় বাংলাদেশের অর্থনৈতিক কারণে পাকিস্তান ছেড়ে যায়নি।
গত বছর পাকিস্তানে বসবাসরত বাঙ্গালীদের কে স্হায়ী নাগরিকত্ব দেয়ার সিদ্ধান্ত নেয় সংসদীয় স্থায়ীকমিটি। তা এখনো কার্যকর করা হয়নি। আর বাঙালিদের নাগরিকত্ব না দেয়ার সিদ্ধান্তে পাকিস্তানে বিক্ষোভ প্রদর্শিত হয়।
বাঙ্গালীদের নাগরিকত্ব না দেওয়ার দাবিতে বিক্ষুব্ধ সিন্ধি রাজনৈতিক দলগুলো বিরোধিতা করে আসছে পাকিস্তান প্রেমীদের নাগরিকত্ব না দেয়ার ব্যাপারে ।২০১৬ সালের ডিসেম্বরে করাচিতে, প্রেস ক্লাব অভিমুখে বিক্ষোভ করে “জয় সিন্ধ মাহাজ” নামের একটি দল।
দলটির প্রধান আব্দুল খালিদ জুনেজু বলেন, দেশের ভেতরে ও বাইরে ব্যাপক হারে স্হানান্তর অভিবাসনের ধারা সিন্ধি জনগণকে যেন নিজ প্রদেশেই সংখ্যালঘু করে দেওয়া হচ্ছে,বাঙ্গালীদের বৈধকরণের বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থান নিয়ে জুনেজু বলেন, সরকারের উচিত এদের বাংলাদেশে পাঠিয়ে দেওয়া এবং তার আগে নিশ্চিত করা যে তারা যেন ভোট দিতে বা রাষ্ট্রীয় অন্যান্য অধিকার ভোগ করতে না পারে।
তথ্য সূত্র:
# ‘দ্যা ডন'(পাকিস্তানভিত্তিক সংবাদ মাধ্যম)
# পাক মুসলিম এ্যালায়েন্স
#পাকিস্তানি বাঙ্গালি এ্যাকশন কমিটি
ছবি
সংগৃহিত।
#ইনসেটে করাচী শহরে বাঙালি বস্হির ছবি।
প্রতিবেদক-
সম্পাদক- প্রকাশক,দৈনিক জনতার দেশ।