শিরোনাম :
বাউফলে গণকবরস্থানে চাঁদা চেয়ে হামলা, প্রশাসনের বিরুদ্ধে ঘুষ দাবীর অভিযোগ। সাবেক ডিজিএফআই এর মহাপরিচালক জেনারেল আকবর এবং এস এসএফ প্রধান লে. জেনারেল মুজিবুর রহমান এখন ভারতে মোদির আশ্রয়ে। জিয়া পরিবারের চার দশকের ঠিকানা হারানোর পেছনে তৎকালীন সেনাপ্রধান মুবীন। আজ ১২ জানুয়ারি বিপ্লবী যোদ্ধা মাস্টার দা সূর্য সেন এর প্রয়াণ দিবসে শ্রদ্ধাঞ্জলী। ইমাম খোমেনি ও আমেরিকার গুঁটিচাল। সম্রাট বাবরের পরাজয় এবং শানে শাহ ওবায়দুল্লাহ আহরার (রহঃ)। এক যে ছিল নেতা–দেবারতী মুখোপাধ্যায়। রাজনীতির রহস্য মানব সিরাজুল আলম খান। ভোলায় ক্রিকেট খেলাকে কেন্দ্র করে বন্ধুর হাতে বন্ধু খুন। গ্যাস সংকটে জ্বলছে না চুলা।  সিলিন্ডার ব্যবসায়ীদের কাছে জিম্মি ভোক্তাগণ।  এটি ভোক্তাদের সঙ্গে সরাসরি প্রতারণা —-ক্যাব সভাপতি। 
বৃহস্পতিবার, ১৫ জানুয়ারী ২০২৬, ০৯:০১ পূর্বাহ্ন

ইরান-ইসরাইল যুদ্ধে ভারতের বিমান পরিবহন ব্যবস্হার নাজেহাল তথ্য

Reporter Name / ১৪৩ Time View
Update : রবিবার, ১৫ জুন, ২০২৫

মাহবুবুর রহমান খান :

ভারত যেন হঠাৎ করেই এক আকাশের কারাগারে বন্দী হয়ে পড়েছে। পশ্চিমে পাকিস্তানের সাথে চলমান যুদ্ধের কারণে প্রধান আকাশপথ রুদ্ধ। সাম্প্রতিক ইসরায়েল-ইরান যুদ্ধের লেলিহান শিখা ইরানের আকাশকে গ্রাস করেছে, যা সকল দেশের জন্য বন্ধ। উত্তরের হিমালয়ের প্রাকৃতিক বাধার পাশাপাশি চীনের সাথে বৈরী সম্পর্ক সেই পথকেও করেছে অগম্য। এই নানামূখী অবরোধের ফলে ভারত আজ এক অভূতপূর্ব বিচ্ছিন্নতার শিকার। এই সংকট ভারতের বিমান চলাচল শিল্পকে কেবল দেউলিয়া হওয়ার দিকেই ঠেলে দিচ্ছে না, বরং দেশটির বৈশ্বিক সংযোগ, অর্থনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা এবং কৌশলগত সার্বভৌমত্বকে এক কঠিন পরীক্ষার মুখে ফেলে দিয়েছে।

এই আকাশ-কারাগারের গঠন বুঝতে হলে এর অদৃশ্য আকাশ দেয়ালগুলোকে পৃথকভাবে বিশ্লেষণ করতে হবে। প্রথম এবং সবচেয়ে কঠিন দেয়ালটি হলো পাকিস্তান। অপারেশন সিন্দুর চালাতে গিয়ে তৈরি হওয়া যুদ্ধের কারণে পাকিস্তানের আকাশপথ বন্ধ হওয়াটা ভারতের জন্য সবচেয়ে বড় আঘাত, কারণ এটিই ছিল ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকায় যাওয়ার প্রাকৃতিক এবং সবচেয়ে লাভজনক ‘এরিয়াল হাইওয়ে’। দ্বিতীয় এবং তৃতীয় দেয়ালটি হলো ইরান। এই দেশটি তাদের আকাশপথ বন্ধ করেছে এমন এক আঞ্চলিক যুদ্ধের কারণে, যার সাথে ভারতের সরাসরি কোনো সম্পর্ক নেই। এটি ‘কল্যাটরাল ড্যামেজ’ বা সমান্তরাল ক্ষতির এক ভয়াবহ উদাহরণ, যা দেখিয়ে দেয় যে বিশ্বের অন্য প্রান্তের সংঘাত কীভাবে একটি দেশকে তার ইচ্ছার বিরুদ্ধে হাঁটু গেড়ে বসতে বাধ্য করতে পারে। পাকিস্তানের আকাশপথ বন্ধ হওয়ার পর ভারত বিকল্প পথে ইরানের ওপর দিয়ে ইউরোপ ও পশ্চিমের সাথে যোগাযোগ রক্ষা করত। কিন্তু ইরান-ইসরায়েল সংঘাতে ইরানের আকাশও বন্ধ।

ফলে, ভারতের সামনে এখন একটিই পথ খোলা—দক্ষিণে আরব সাগরের ওপর দিয়ে এক দীর্ঘ, ঝুঁকিপূর্ণ এবং অত্যন্ত ব্যয়বহুল পথ পাড়ি দেওয়া। এই নতুন পথের গাণিতিক বিশ্লেষণ করলেই সংকটের আসল চেহারা স্পষ্ট হয়। ধরা যাক, মুম্বাই থেকে ফ্রাঙ্কফুর্টের স্বাভাবিক আকাশপথের দূরত্ব প্রায় ৬,৬০০ কিলোমিটার, যা পাড়ি দিতে ৯ ঘণ্টার মতো সময় লাগত। এখন এই চতুর্মুখী অবরোধের কারণে একটি বিমানকে প্রথমে দক্ষিণে ওমানের দিকে উড়ে, তারপর সৌদি আরব এবং মিশরের বিশাল ভূখণ্ড পাড়ি দিয়ে, লিবিয়ার ওপর দিয়ে ভূমধ্যসাগরে প্রবেশ করে ইউরোপের দিকে যেতে হবে। এই ঘুরপথে মোট যাত্রার দূরত্ব বেড়ে দাঁড়াবে প্রায় ১০,১০০ কিলোমিটার। অর্থাৎ, অতিরিক্ত পথ পাড়ি দিতে হবে প্রায় ৩,৫০০ কিলোমিটার।

এর সরাসরি প্রভাব পড়বে ভ্রমণ সময় এবং খরচের ওপর। ঘণ্টায় ৮৫০ কিলোমিটার গতিতে এই অতিরিক্ত পথ পাড়ি দিতে সময় লাগবে ৪ ঘণ্টারও বেশি। একটি আধুনিক দূরপাল্লার বিমানের জন্য প্রতি ঘণ্টায় অতিরিক্ত জ্বালানি ও পরিচালন খরচ বিশাল। সব মিলিয়ে, প্রতিটি ফ্লাইটের জন্য ভারতীয় মুদ্রায় প্রায় ৩০ লক্ষ টাকা অতিরিক্ত ব্যয় হবে। যদি আমরা ধরে নিই যে ভারত থেকে প্রতিদিন প্রায় শতাধিক ফ্লাইট এই পথে পশ্চিমে যাতায়াত করে, তাহলে দৈনিক মোট অতিরিক্ত খরচের পরিমাণ দাঁড়াবে ৩০ কোটি টাকার বেশি। এই বিপুল আর্থিক বোঝা কোনো বিমান সংস্থার পক্ষে একা বহন করা অসম্ভব। এর অনিবার্য পরিণতি হবে টিকিটের মূল্য বৃদ্ধি। মুম্বাই-ফ্রাঙ্কফুর্ট রুটের একমুখী ভাড়া হয়তো সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যাবে, যা পর্যটন, ব্যবসায়িক ভ্রমণ এবং বিদেশে থাকা ভারতীয়দের জন্য এক দুঃস্বপ্নে পরিণত হবে।

এই আর্থিক সংকটের বাইরেও এর অর্থনৈতিক প্রভাব আরও সুদূরপ্রসারী। ভারতের উচ্চ-মূল্যের রপ্তানি শিল্প, যেমন ফার্মাসিউটিক্যালস, ইলেকট্রনিক্স এবং হীরা, তাদের সময়নিষ্ঠ সরবরাহের ক্ষমতার ওপর নির্ভরশীল। পরিবহনের সময় ৪-৫ ঘণ্টা বেড়ে যাওয়া এবং খরচ ৫০-৬০% বৃদ্ধি পাওয়ার অর্থ হলো আন্তর্জাতিক বাজারে ভারতীয় পণ্যের প্রতিযোগিতার সক্ষমতা প্রায় শূন্য হয়ে যাওয়া। চীন, ভিয়েতনাম বা থাইল্যান্ডের মতো প্রতিযোগী দেশগুলো যখন কম খরচে তাদের পণ্য ইউরোপের বাজারে পৌঁছে দেবে, তখন ভারতীয় রপ্তানিকারকরা কেবল দর্শকের ভূমিকা পালন করতে বাধ্য হবেন। এটি ভারতের ‘মেক ইন ইন্ডিয়া’ উদ্যোগ এবং বিশ্বব্যাপী সাপ্লাই চেইনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হওয়ার স্বপ্নকে গুরুতরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করবে।

কৌশলগতভাবে, এই পরিস্থিতি ভারতের জন্য এক চরম অস্বস্তিকর। এটি প্রমাণ করে যে, ভারতের বৈশ্বিক সংযোগ কয়েকটি দেশের দয়ার ওপর নির্ভরশীল। আজ ওমান, সৌদি আরব এবং মিশর তাদের আকাশপথ খোলা রেখেছে, কিন্তু ভবিষ্যতে যদি এই অঞ্চলে কোনো নতুন সংঘাত বা রাজনৈতিক অস্থিরতা তৈরি হয়, তাহলে ভারতের জন্য এই একমাত্র লাইফলাইনটিও বন্ধ হয়ে যেতে পারে। তখন ভারত কি সত্যিই একটি বিচ্ছিন্ন দ্বীপে পরিণত হবে? এই সংকট ভারতের কূটনীতির জন্য সবচেয়ে বড় পরীক্ষা। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ফ্রান্স এবং উপসাগরীয় মিত্র দেশগুলোর ওপর চাপ সৃষ্টি করে এই একমাত্র দক্ষিণ দিকের করিডোরটিকে সুরক্ষিত এবং স্থিতিশীল রাখাই এখন ভারতের প্রধান কাজ।

এই চতুর্মুখী আকাশপথ অবরোধ কেবল একটি লজিস্টিক সমস্যা নয়, এটি ভারতের জাতীয় নিরাপত্তার ওপর এক সরাসরি আঘাত। এই সংকট থেকে শিক্ষা নিয়ে ভারতকে তার কৌশলগত চিন্তাভাবনায় আমূল পরিবর্তন আনতে হবে। অবিলম্বে অতি-দূরপাল্লার বিমান কেনার কথা ভাবতে হবে, যা একবার জ্বালানি নিয়ে ১৫-১৬ হাজার কিলোমিটার পাড়ি দিতে পারে এবং এই ধরনের অবরোধকে পাশ কাটাতে সক্ষম। একই সাথে, আকাশপথের অধিকারকে কেন্দ্র করে নতুন কৌশলগত জোট গঠন করতে হবে, যেখানে পারস্পরিক ওভারফ্লাইট অধিকার নিশ্চিত করা হবে। আজকের এই কারাগার থেকে বের হওয়ার পথ ভারতকে নিজেকেই তৈরি করতে হবে। কারণ একবিংশ শতাব্দীর পৃথিবীতে কোনো দেশের উত্থান-পতন যে কেবল তার স্থল বা জলসীমার ওপর নয়, বরং তার মাথার ওপরের খোলা আকাশ কতটা স্বাধীন, তার ওপরও নির্ভর করে।

প্রতিবেদক: সম্পাদক – প্রকাশক

দৈনিক জনতার দেশ ও জনতার দেশ tv


তথ্যসূত্র: ইন্টারনেট।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category