ডেস্ক রিপোর্ট :
অবিভক্ত বাংলার প্রধানমন্ত্রী শেরে বাংলা খ্যাত একে ফজলুল হকের মৃত্যুবার্ষিকী ছিল ২৭ এপ্রিল ।১৯৬২ সালের ২৭ এপ্রিল তিনি ইন্তেকাল করেন। । এ. কে. ফজলুক হক ১৮৭৩ সালে ২৬ অক্টোবর বরিশাল জেলার রাজাপুর থানার সাতুরিয়া গ্রামে মামার বাড়িতে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি কাজী মুহম্মদ ওয়াজেদ এবং সাইদুন্নেসা খাতুনের একমাত্র পুত্র ছিলেন।
ফজলুল হক ছিলেন বাঙালী মুসলমান জাতীয়তাবাদী রাজনীতির প্রাণপুরুষ।
তিনি প্রধান মন্ত্রী হয়ে নিপীড়িত মুসলমানদেরকে হিন্দু জমিদারদের করাল গ্রাস থেকে মুক্তি দিয়েছিলেন। এ ছাড়া তিনি অবৈতনিক শিক্ষা ব্যবস্থা চালু করেন। যার ফলে বাঙালি মুসলমানরা শিক্ষার আলো দেখতে পেয়েছিলেন । ১৯১৩ সালে মাত্র ৩৯ বছর বয়সে এ. কে. ফজলুক হক বঙ্গীয় আইন পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯১৫ সালে পুনরায় ঢাকা বিভাগ থেকে বঙ্গীয় আইন পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯১৩ থেকে ১৯১৬ সাল পর্যন্ত তিনি এ পরিষদের সভায় মোট ১৪৮ বার বক্তৃতা করেন। ১৪৮ বার বক্তৃতার ভেতর ১২৮ বার তিনি দাড়িয়ে ছিলেন মুসলমানদের শিক্ষা সম্পর্কে বক্তৃতা দেওয়ার জন্য। তার অদম্য চেষ্টার ফলে ১৯১৬ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় কারমাইকেল ও টেইলার হোস্টেল স্থাপন করা হয়েছিল।
পূর্ব বাংলার মানুষের উন্নতিকল্পে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠায় যে তিনজন মনীষীর অবদান সবচেয়ে বেশি তারা হলেন নবাব সলিমুল্লাহ,ধনবাড়ীর জমিদার সৈয়দ নওয়াব আলী চৌধুরী ও শেরেবাংলা আবুল কাশেম ফজলুল হক ।
শেরেবাংলা তখন শিক্ষামন্ত্রী। তিনি লক্ষ্য করলেন মুসলমান শিক্ষার্থীরা পরীক্ষা দেয় কিন্তু পাশ করে না । তিনি তদন্ত কমিটি গঠন করলেন,কেন শিক্ষার্থীরা পাশ করছে না । তদন্তে বেরিয়ে আসলো হিন্দু শিক্ষকরা মুসলমান নাম দেখলেই ঘেচাং করে দিতেন । আর ফেল করেই তারা হারিয়ে যেতো । সে কারণেই উচ্চ শিক্ষায় মুসলিম শিক্ষার্থী খুঁজে পাওয়া যেতো না । এভাবেই ইচ্ছা থাকা সত্বেও শিক্ষা ক্ষেত্রে মুসলমানরা পিছিয়ে পড়ে । শেরেবাংলা শিক্ষার্থীদের নাম বাদ দিয়ে নতুন পদ্ধতিতে রুল নাম্বার দিয়ে পরীক্ষা নেওয়ার ব্যবস্থা করলেন । এতে প্রত্যাশিত সাফল্য পাওয়া যায় । যা এখনও বহাল আছে ।
নতুন পদ্ধতি প্রয়োগের প্রথম বছরেই ফার্স্ট ক্লাস ফার্স্ট হন হুমায়ুন কবির, যিনি পরবর্তীতে ভারতের শিক্ষামন্ত্রী হয়েছিলেন ।
শেরেবাংলা বাংলার কৃষকদের জমিদার ও সুদখোর মহাজনদের হাত থেকে রক্ষার জন্য ঋণ সালিশি বোর্ড গঠন করেছিলেন । যে কারণে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের চালু করা মাইক্রো ক্রেডিট সিস্টেম বা সুদের ব্যবসা মাঠেমারা যায় ।
(বাংলাদেশের উন্নয়নের ইতিহাস :নওয়াব সলিমুল্লাহ থেকে খালেদা জিয়া-আবুল কাসেম হায়দার, পৃষ্ঠা ৭৫)
লাহোর প্রস্তাব উত্থাপন,জমিদারি প্রথা উচ্ছেদ,ঋণ শালিসি বোর্ডের প্রবর্তন এবং শিক্ষার ক্ষেত্রে বাংলার অবহেলিত মুসলমানদের উজ্জীবিত করার প্রয়াসের কারণে শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হক এ দেশের সাধারণ মানুষের হৃদয়ে মহানায়কের মর্যাদায় ভূষিত ছিলেন ।
জমিদারদের হাত থেকে বাংলার কৃষকদের বাঁচানোর মতো বিশাল অবদান থাকার পরও ফজলুল হকের রাজনীতির কোনো ধারাবাহিকতা ছিল না । কোনো একটি রাজনৈতিক বিশ্বাসে তিনি দীর্ঘদিন স্হির থাকতে পারতেন না । ক্ষমতার রাজনীতির পাকে পড়ে তিনি বারবার নিজের মত বদলিয়েছেন,রাজনীতির বাঁক ঘুরিয়ে দিয়েছেন । তার মতো জনপ্রিয় নেতার এই অস্হিরমতি রাজনীতি বাঙালি মুসলমানের জাতি হিসেবে অত্মবিকাশে স্বভাবতই বড় রকমের প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়িয়েছে । আজকের বাঙালি মুসলমানের দোদুল্যমান চরিত্র নির্মাণে তার নেতাদের এই অস্হিরমতি রাজনীতি যে একটা বড় ভূমিকা রেখেছে,তাতে কোনো সন্দেহ নাই । ফজলুল হক নিখিল ভারত কংগ্রেসের সাধারণ সম্পাদক ও নিখিল ভারত মুসলিম লীগের সভাপতি পর্যন্ত হয়েছিলেন । কিন্তু তার অস্হিরমতি রাজনীতি তাকে শেষ পর্যন্ত সর্বভারতীয় নেতা না বানিয়ে স্রেফ প্রাদেশিক নেতা হওয়ার মধ্যে আটকে রেখেছিল ।
যে ফজলুল হক লাহোর প্রস্তাব উত্থাপন করেছিলেন,সেই তিনি কিছুদিন পর মুসলিম লীগ ছেড়ে দিয়ে উগ্র সাম্প্রদায়িক,আজকের বিজেপির ভাবগুরু শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জির সাথে মিলেমিশে কোয়ালিশন সরকার গঠন করেছিলেন ।
গবেষক ফাহমিদ উর রহমান লিখেছেন :
১৯৫৪ সালে পূর্ব বাংলার মুখ্যমন্ত্রী হয়ে ফজলুল হক একবার কলকাতায় যান এবং সেখানে আবেগাপ্লুত হয়ে যা বলেন,তা মোটেই একজন কুশলী রাজনীতিকের লক্ষণ নয় । সেখানে তিনি অখণ্ড বাংলার পক্ষে মত দেন এবং প্রকারান্তরে মুসলিম জাতীয়তাবাদের ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করেন । ১৯৫৪ সালের ৩ মে কলকাতায় তাকে প্রদত্ত সংবর্ধনার জবাবে তিনি বলেন:”একটি দেশের রাজনৈতিক বিভাগে আমি বিশ্বাস করি না । প্রকৃতপক্ষে হিন্দুস্তান ও পাকিস্তান-এই দুটি বিভেদাত্মক শব্দের সঙ্গে আমি এখন পর্যন্ত সুপরিচিত হতে পারিনি ।–যারা আমার এই সোনার দেশকে দুভাগ করেছে,তারা দেশের দুশমন । আমার মতে,পাকিস্তান বলতে কিছুই বোঝায় না । এই শব্দটি বিভ্রান্তি সূচনা করার ও স্বার্থসিদ্ধির একটি পন্হা মাত্র”।
পাকিস্তান সরকার ওই বক্তব্যের জন্য তাকে রাষ্ট্রদ্রোহী বলেছিল,তাকে গৃহবন্দী করে রেখেছিল ।
তাইতো দেখি ফজলুল হক পাকিস্তান আন্দোলনের নেতা হতে পারেননি । সেই নেতৃত্ব চলে যায় নাজিমুদ্দীন,সোহরাওয়ার্দী ও আবুল হাশিমের কাছে ।
গবেষক ও ইতিহাসবিদ জয়া চ্যাটার্জি লিখেছেন :
শেরে বাংলা ফজলুল হকের রাজনীতিতে কয়েকটি বিষয়ের অপূর্ব সমন্বয় ঘটে;এর মধ্যে ছিল তাঁর নিজস্ব ধর্মনিরপেক্ষ জাতীয়তাবাদ,বাঙালি স্বদেশপ্রেম ও মুসলমান জনপ্রিয়তাবাদ । অবস্থানুযায়ী তিনি যে কোনো একটি বিষয়কে গুরুত্ব দিতেন । সুযোগ সন্ধানী ছিলেন তিনি;বিশেষ কোনো সময়ে তিনি যে কাজ করতেন তা তিনি নিজে বিশ্বাস করার মতো করেই সম্পাদন করতেন ।
(বাংলা ভাগ হল-জয়া চ্যাটার্জি,পৃষ্ঠা৮০)
উপমহাদেশের রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক ইতিহাসে ভাষার প্রশ্ন সবসময়ই একটি গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হিসেবে বিবেচিত হয়েছে। বিশেষ করে ব্রিটিশ শাসনামলে বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মধ্যে সাংস্কৃতিক পরিচয়, শিক্ষানীতি ও রাজনৈতিক ঐক্য গড়ে তোলার ক্ষেত্রে ভাষা একটি কার্যকর মাধ্যম হিসেবে উঠে আসে। এই প্রেক্ষাপটে বাংলার তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেরে বাংলা এ. কে. ফজলুল হক ভাষানীতি সংক্রান্ত কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাব উত্থাপন করেন, যা সে সময়ের রাজনৈতিক বাস্তবতা ও সামগ্রিক উপমহাদেশীয় প্রেক্ষাপটকে প্রতিফলিত করে।
১৯৩৮ সালের ১ অক্টোবর কলকাতায় অনুষ্ঠিত নিখিল ভারত মুসলিম শিক্ষা সম্মেলনে বাংলার প্রধানমন্ত্রী হিসেবে সভাপতির ভাষনে ফজলুল হক হিন্দির পরিবর্তে উর্দুকে ভারতের সাধারণ ভাষা (Lingua franca)রূপে গ্রহণের প্রস্তাব করেন। ওই একই সম্মেলনে আরবি হরফে বাংলা লেখার প্রস্তাবও গৃহীত হয়। শুধু তাই নয়, ফজলুল হক বাঙালি মুসলিম ছাত্রদের জন্য স্কুলে বাংলার পরে উর্দুকে দ্বিতীয় ভাষা হিসেবে পড়ানোর কথাও বলেন।
এ ছাড়া ১৯৩৮ সালের ৩ এপ্রিল বর্ধমানের আসানসোলে মুসলিম লীগ সম্মেলনে ফজলুল হক মুসলিমদের সাংস্কৃতিক ঐক্যের প্রয়োজনে উর্দুর ওপর জোর দিয়ে সব মুসলিম বালকের জন্য উর্দুকে দ্বিতীয় বাধ্যতামূলক ভাষা করার অনুরোধ জানান।
(আ মরি বাংলা ভাষা -ফাহমিদ উর রহমান, পৃষ্ঠা ৫৯-৬০/বাংলাদেশের ইতিহাস -রমেশচন্দ্র মজুমদার, চতুর্থ খন্ড /ভাষা আন্দোলন প্রসঙ্গ :কতিপয় দলিল -বদরুদ্দীন উমর, দ্বিতীয় খন্ড)
ফজলুল হকের এই প্রস্তাবগুলোকে সেই সময়ের বৃহত্তর রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক বাস্তবতার আলোকে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন। উপমহাদেশে বিভিন্ন ভাষাভাষী জনগোষ্ঠীর মধ্যে যোগাযোগ, শিক্ষা বিস্তার এবং একটি সমন্বিত পরিচয় গড়ে তোলার প্রয়াস থেকেই তিনি উর্দুর ওপর গুরুত্বারোপ করেছিলেন। একই সঙ্গে এসব উদ্যোগ ভাষা, সংস্কৃতি ও রাজনীতির পারস্পরিক সম্পর্ককে স্পষ্টভাবে তুলে ধরে এবং তৎকালীন নেতৃত্বের চিন্তাধারার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হিসেবে ইতিহাসে স্থান করে নিয়েছে।শেরে বাংলা এ. কে. ফজলুল হক ছিলেন এক জটিল, বহুমাত্রিক এবং যুগান্তকারী রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব—যার জীবন ও কর্ম একই সঙ্গে গৌরবময় এবং বিতর্কিত। একদিকে তিনি নিপীড়িত কৃষক ও প্রান্তিক মানুষের মুক্তির জন্য সংগ্রাম করেছেন, শিক্ষার প্রসারে যুগান্তকারী পদক্ষেপ নিয়েছেন এবং বাংলার মুসলমান সমাজকে জাগ্রত করার ক্ষেত্রে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছেন। অন্যদিকে তার রাজনৈতিক অবস্থানের ঘনঘন পরিবর্তন, আদর্শগত অস্থিরতা এবং কৌশলগত সিদ্ধান্তগুলো তার সামগ্রিক নেতৃত্বকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।
তথ্যসূত্র ও ছবি:
# উইকিপিডিয়া থেকে সংগৃহীত।