আন্তর্জাতিক ডেস্ক |জনতারদেশ :
আধুনিক মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী এবং প্রভাবশালী ব্যক্তিত্বদের একজন আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি। ১৯৮১ থেকে ১৯৮৯ সাল পর্যন্ত ইরানের প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালনের পর, ১৯৮৯ সাল থেকে তিনি দেশটির ‘সর্বোচ্চ নেতা’ (Supreme Leader) হিসেবে নিয়ন্তা শক্তির ভূমিকা পালন করছেন। গত চার দশকে তার নেতৃত্ব ইরানকে একদিকে যেমন সামরিক ও বৈজ্ঞানিক স্বনির্ভরতার চূড়ায় পৌঁছে দিয়েছে, অন্যদিকে তেমনি এনে দিয়েছে তীব্র আন্তর্জাতিক সমালোচনা এবং অভ্যন্তরীণ মনস্তাত্ত্বিক দ্বন্দ্ব। আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের চোখে আলী খামেনির শাসনকাল এক জটিল, বহুমাত্রিক ও চরম বৈপরীত্যে ভরা এক দীর্ঘ অধ্যায়।
১. ‘রেজিস্ট্যান্স ইকোনমি’ ও প্রতিরক্ষা সক্ষমতার উত্থান
আলী খামেনির দীর্ঘ শাসনামলের সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা ও বৈশ্বিক চাপের মুখে ইরানকে একটি ‘স্বনির্ভর রাষ্ট্র’ হিসেবে গড়ে তোলার নীতি। আন্তর্জাতিক পরিভাষায় তার এই দর্শনকে বলা হয় ‘রেজিস্ট্যান্স ইকোনমি’ (Resistance Economy) বা প্রতিরোধমূলক অর্থনীতি।
সামরিক ও পারমাণবিক অগ্রগতি: তার সরাসরি তত্ত্বাবধানে ইরান দেশীয় প্রযুক্তিতে দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন প্রযুক্তিতে ঈর্ষণীয় সাফল্য অর্জন করেছে। পশ্চিমা অবরোধের মধ্যেও পারমাণবিক গবেষণাকে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে দেশটি।
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি: প্রকৌশল, ন্যানো-প্রযুক্তি এবং চিকিৎসা গবেষণার ক্ষেত্রে ইরানকে স্বাবলম্বী করতে তিনি উচ্চশিক্ষায় ব্যাপক বিনিয়োগের নীতি সমর্থন করেন, যা মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য দেশের তুলনায় ইরানের অভ্যন্তরীণ শিল্পোৎপাদনকে বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।
২. আঞ্চলিক ভূ-রাজনীতি এবং ‘এক্সিস অব রেজিস্ট্যান্স’
পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে খামেনি ইরানকে কেবল একটি ভৌগোলিক সীমারেখার মধ্যে আবদ্ধ রাখেননি। ফিলিস্তিনি ইস্যুতে তার দীর্ঘদিনের আপসহীন অবস্থান এবং প্রকাশ্য সমর্থন মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে ইরানকে মুসলিম বিশ্বের একটি বড় অংশের কাছে জনপ্রিয় করে তোলে।
বিশ্লেষকদের মতে, খামেনি প্রথাগত যুদ্ধের চেয়ে ‘কৌশলগত গভীরতা’ (Strategic Depth) নীতিতে বিশ্বাসী। তার নির্দেশনায় মধ্যপ্রাচ্য জুড়ে গড়ে উঠেছে এক বিশাল প্রক্সি নেটওয়ার্ক, যা আন্তর্জাতিক মহলে ‘এক্সিস অব রেজিস্ট্যান্স’ নামে পরিচিত। লেবাননের হিজবুল্লাহ, ইয়েমেনের হুথি এবং ইরাক ও সিরিয়ার বিভিন্ন প্রতিরোধ গোষ্ঠী এই নেটওয়ার্কের অংশ, যার মাধ্যমে ইরান সরাসরি পরাশক্তিগুলোর সাথে এক মনস্তাত্ত্বিক ও সামরিক ভারসাম্য বজায় রেখে চলেছে।
৩. ‘গভীর রাষ্ট্র’ ও ক্ষমতার অভ্যন্তরীণ বিন্যাস
ইরানের শাসনকাঠামো বুঝতে হলে খামেনির তৈরি করা প্রাতিষ্ঠানিক নেটওয়ার্কের দিকে তাকাতে হবে। তিনি দেশটির ক্ষমতাকে কেবল সংবিধানের অধীনে রাখেননি, বরং ইসলামিক রেভোলিউশনারি গার্ড কোরের (IRGC) মতো একটি শক্তিশালী প্যারা-মিলিটারি বাহিনীকে রাষ্ট্রের মূল চালিকাশক্তিতে পরিণত করেছেন। এই বাহিনী এখন ইরানের অর্থনীতি, গোয়েন্দা নেটওয়ার্ক এবং সামরিক সিদ্ধান্তের মূল নিয়ন্ত্রক। এই ‘গভীর রাষ্ট্র’ (Deep State) কাঠামোর কারণে আন্তর্জাতিক শত চাপেও খামেনির শাসনব্যবস্থা গত চার দশক ধরে অটুট রয়েছে।
৪. মুদ্রার উল্টো পিঠ: মানবাধিকারের সংকট ও রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ
আলী খামেনির এই বাহ্যিক শক্তির বিপরীতে রয়েছে এক তীব্র অভ্যন্তরীণ অসন্তোষ ও আন্তর্জাতিক নিন্দার ইতিহাস। সমালোচক এবং মানবাধিকার সংস্থাগুলোর মতে, খামেনির শাসনকাল ইরানের রাজনৈতিক স্বাধীনতা এবং নাগরিক অধিকারের ক্ষেত্রে একটি অন্ধকার অধ্যায়।
ভিন্নমত দমন: রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ ও ভিন্নমতাবলম্বীদের ওপর কঠোর নিয়ন্ত্রণ খামেনি প্রশাসনের অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য। সংবাদমাধ্যমের ওপর কঠোর বিধিনিষেধ এবং ইন্টারনেট সেন্সরশিপের কারণে ইরান বিশ্বমঞ্চে বারবার সমালোচিত হয়েছে।
বিক্ষোভের মুখে প্রশাসন: বিভিন্ন সময়ে (বিশেষ করে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে) অর্থনৈতিক সংকট এবং সামাজিক স্বাধীনতার দাবিতে গড়ে ওঠা জনবিক্ষোভগুলো যেভাবে বলপ্রয়োগের মাধ্যমে দমন করা হয়েছে, তা আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে ব্যাপক ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে।
৫. প্রজন্মের ব্যবধান ও ভবিষ্যৎ চ্যালেঞ্জ
খামেনির বর্তমান ইরানের সবচেয়ে বড় মনস্তাত্ত্বিক সংকট হলো এর জনসংখ্যাতাত্ত্বিক পরিবর্তন বা প্রজন্মের ব্যবধান (Generation Gap)। বর্তমান ইরানের একটি বিশাল অংশ তরুণ, যারা ১৯৭৯ সালের ইসলামী বিপ্লবের পরবর্তী সময়ে জন্ম নিয়েছে। বিশ্বায়নের এই যুগে খামেনির রক্ষণশীল ‘আদর্শিক আধিপত্য’ (Ideological Hegemony) এবং তরুণদের ‘আধুনিক ও ধর্মনিরপেক্ষ’ জীবনযাত্রার আকাঙ্ক্ষার মধ্যে একটি তীব্র সংঘাত তৈরি হয়েছে।
এক জটিল উত্তরাধিকারের মূল্যায়ন
আলী খামেনির চার দশকের নেতৃত্বকে কোনো একক সমীকরণে পরিমাপ করা অসম্ভব। তার সমর্থকরা তাকে দেখেন একজন দূরদর্শী রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে, যিনি বিদেশি শক্তির রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে ইরানকে একটি আঞ্চলিক পরাশক্তিতে রূপান্তর করেছেন। অন্যদিকে, তার সমালোচকদের চোখে তিনি এমন এক ব্যবস্থার প্রতীক, যেখানে স্বনির্ভরতার মূল্য শোধ করতে হয়েছে নাগরিক স্বাধীনতা এবং মানবাধিকারের চরম বিসর্জনের মাধ্যমে।
ইতিহাসের পাতায় আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির নাম একদিকে যেমন আধুনিক ইরানের সামরিক ও প্রযুক্তিগত রূপান্তরের কারিগর হিসেবে থাকবে, তেমনি রাজনৈতিক স্বাধীনতা হরণের এক জটিল উত্তরাধিকার হিসেবেও এটি মূল্যায়িত হবে।