মাহবুবুর রহমান খান:
বিনা অনুমতিতে দীর্ঘকাল কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকা,পলায়ন ও অসদাচরণের দায়ে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ ডিএমপির বিপ্লব কুমার সরকার সহ পুলিশের ৬ জন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করেছে সরকার। গত ১২ আগস্ট ২০২৬ তারিখে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রনালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগ থেকে প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে এই বরখাস্তে আদেশ জারি করা হয়।
*বরখাস্ত হওয়া পুলিশ কর্মকর্তাদের পরিচয়*
১.বিপ্লব কুমার সরকার :ডিএমপির সাবেক যুগ্ম কমিশনার এই কর্মকর্তা বরখাস্তের পূর্বে বরিশাল রেঞ্জ ডিআইজি কার্যালয় সংযুক্ত ছিলেন।
২.সুদীপ কুমার চক্রবর্তী :সাবেক যুগ্ম কমিশনার বরখাস্তের পূর্বে তিনি বরিশাল রেঞ্জ ডিআইডি কার্যালয় সংযুক্ত ছিলেন।
৩.মোহাম্মদ ইকবাল হোসাইন:পুলিশ সুপার বরখাস্তের পূর্বে তিনি খুলনার রেঞ্জ ডিআইডি কার্যালয় সংযুক্ত ছিলেন।তার ভাইরাল উক্তি,”স্যার, গুলি করি একটা মরেও একটা।
৪.কাজী আশরাফুল আজিম :উপ -পুলিশ কমিশনার বরখাস্তের পূর্বে তিনি চট্টগ্রাম রেঞ্জ ডিআইজি কার্যালয় সংযুক্ত ছিলেন।
৫.রাজন কুমার দাস :অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (কক্সবাজার ৮ এপিবিএন এ কর্মরত ছিলেন এবং পলাতক)।
৬.মোহাম্মদ গোলাম রুহানি :ডিএমপির সহকারী পুলিশ কমিশনার (সাময়িক বরখাস্ত ও পলাতক)।
বরখাস্তের কারণ ও পটভূমিঃ
*অনুমতিহীন অনুপস্থিতি :সরকারের প্রজ্ঞাপনে জানানো হয় যে, এই কর্মকর্তারা কোন ছুটি বা পূর্বানুমতি ছাড়াই দীর্ঘ সময় ধরে নিজ নিজ কর্মস্তলে অনুপস্থিত ছিলেন।
*যোগাযোগে ব্যর্থতা :তাদের বর্তমান ও স্থায়ী ঠিকানা এবং ইমেইলের মাধ্যমে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তারা কোন জবাব দেননি।
*আইনগত ব্যবস্থা :সরকারি চাকরি আইন ২০১৮ এবং সরকারি কর্মচারী ও আপিল বিধিমালা ২০১৮ এর সংশ্লিষ্ট ধারা অনুযায়ী বিভাগীয় কার্যধারা শেষে তাদের চাকরি থেকে সরাসরি বরখাস্ত করা হয়।
রাষ্ট্রপতির অনুমোদনের পর গত বুধবার, ১২ আগস্ট এ বিষয়ে পৃথক প্রজ্ঞাপন জারি করেছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে অননুমোদিত অনুপস্থিতি ও পলায়নের অভিযোগে ছয় কর্মকর্তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা করা হয়। তদন্ত শেষে অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় তাঁদের চাকরি থেকে বরখাস্তের গুরুদণ্ড দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু করা হয়।
প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, ছয় কর্মকর্তা কর্মস্থলে অননুমোদিতভাবে অনুপস্থিত থেকে নির্ধারিত সময়ে কাজে যোগ দেননি। তাঁদের নোটিশ পাঠানো হলেও তাঁরা দায়িত্বে যোগদান করেননি এবং নিজেদের অবস্থান সম্পর্কেও কর্তৃপক্ষকে অবহিত করেননি।
অনুমোদন ছাড়া কর্মস্থলে অনুপস্থিতির মেয়াদ ৬০ দিনের বেশি হওয়ায় সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা, ২০১৮ অনুযায়ী তাঁদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়। বিভাগীয় মামলায় বিধিমালার ৩(খ) ও ৩(গ) অনুযায়ী তাঁদের বিরুদ্ধে ‘অসদাচরণ’ ও ‘পলায়ন’-এর অভিযোগ আনা হয়।
অভিযোগের বিষয়ে তাঁদের কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হলেও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা কোনো জবাব দেননি। পরে অভিযোগ তদন্তের জন্য তদন্ত কর্মকর্তা নিয়োগ করা হয়। তদন্ত শেষে প্রতিবেদনে তাঁদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে বলে মতামত দেওয়া হয়।
তদন্ত প্রতিবেদন পাওয়ার পর ছয় কর্মকর্তাকে চাকরি থেকে বরখাস্তের গুরুদণ্ড দেওয়ার প্রাথমিক সিদ্ধান্ত নেয় কর্তৃপক্ষ। এ বিষয়ে তাঁদের দ্বিতীয় দফায় কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হলেও এবারও কোনো জবাব পাওয়া যায়নি।
এরপর তদন্ত প্রতিবেদন, অভিযোগের ধরন ও গুরুত্বসহ সংশ্লিষ্ট বিষয় পর্যালোচনা করে কর্তৃপক্ষ অভিযোগগুলো প্রমাণিত হয়েছে বলে সিদ্ধান্তে পৌঁছায় এবং চাকরি থেকে বরখাস্তের প্রক্রিয়া এগিয়ে নেয়।
সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা, ২০১৮ এবং বাংলাদেশ সরকারি কর্ম কমিশন (পরামর্শকরণ) রেগুলেশনস, ১৯৭৯ অনুযায়ী গুরুদণ্ড হিসেবে চাকরি থেকে বরখাস্তের বিষয়ে সরকারি কর্ম কমিশনের (পিএসসি) পরামর্শ চাওয়া হয়। পরে পিএসসি সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের চাকরি থেকে বরখাস্ত করা যেতে পারে বলে পরামর্শ দেয়।
এরপর সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা, ২০১৮-এর ৪(৬) বিধি অনুযায়ী নিয়োগকারী কর্তৃপক্ষ হিসেবে রাষ্ট্রপতির অনুমোদনের জন্য বিষয়টি উপস্থাপন করা হয়। রাষ্ট্রপতির অনুমোদনের পর বুধবার ছয় কর্মকর্তাকে চাকরি থেকে বরখাস্তের প্রজ্ঞাপন জারি করে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হওয়া ‘গুলি করি, মরে একটা, আহত হয় একটা। একটাই যায় স্যার, বাকিডি যায় না’ বক্তব্যের কারণে আলোচনায় আসা পুলিশ কর্মকর্তা মো. ইকবাল হোসাইনকে চাকরি থেকে সাময়িক বরখাস্ত করেছে সরকার।
ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) ওয়ারী বিভাগের সাবেক উপ-কমিশনার ইকবাল হোসাইনকে কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়া দীর্ঘদিন কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকার অভিযোগে এ শাস্তি দেওয়া হয়। এ সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগ থেকে জারি করা হয়েছে।
বর্তমানে খুলনা রেঞ্জ ডিআইজি কার্যালয়ে সংযুক্ত ইকবাল হোসাইন কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়া ২০২৪ সালের ২৮ আগস্ট থেকে কর্মস্থলে অনুপস্থিত রয়েছেন। এ ঘটনায় তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা করা হয়। তদন্ত শেষে তার বিরুদ্ধে ‘অসদাচরণ’ ও ‘পলায়ন’-এর অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে বলে মতামত দেওয়া হয়।
গণমাধ্যমের হাতে আসা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট নথি অনুযায়ী, অভিযোগের বিষয়ে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হলেও ইকবাল হোসাইন কোনো জবাব দেননি। পরে তদন্তকারী কর্মকর্তা নিয়োগ করে অভিযোগ তদন্ত করা হয়। তদন্ত প্রতিবেদনে অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ার পর চাকরি থেকে বরখাস্ত করার গুরুদণ্ড আরোপের প্রাথমিক সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
এ সিদ্ধান্তের বিষয়ে তাকে দ্বিতীয় দফায় কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হলেও তিনি জবাব দেননি। পরে তদন্ত প্রতিবেদন, অভিযোগের গুরুত্বসহ সংশ্লিষ্ট বিষয় পর্যালোচনা করে চাকরি থেকে বরখাস্ত করার সিদ্ধান্ত বহাল রাখা হয়।
গুরুদণ্ড আরোপের বিষয়ে সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা, ২০১৮ এবং বাংলাদেশ সরকারি কর্ম কমিশন (পরামর্শকরণ) রেগুলেশনস, ১৯৭৯ অনুযায়ী বাংলাদেশ সরকারি কর্ম কমিশনের পরামর্শ চাওয়া হয়। কমিশন ইকবাল হোসাইনকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করা যেতে পারে বলে পরামর্শ দেয়। এরপর বিধিমালা অনুযায়ী নিয়োগকারী কর্তৃপক্ষ হিসেবে রাষ্ট্রপতির অনুমোদনের জন্য বিষয়টি উপস্থাপন করা হয়েছে।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট নথিতে ইকবাল হোসাইনসহ পাঁচ পুলিশ কর্মকর্তার চাকরি থেকে বরখাস্ত করার গুরুদণ্ড অনুমোদনের প্রক্রিয়ার উল্লেখ রয়েছে। রাষ্ট্রপতির অনুমোদন পাওয়ার পর এ-সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন জারি করা হবে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
তথ্য সূত্র:
*স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগ।
* বিভিন্ন প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিকস মিডিয়ায় প্রকাশিত সংবাদ।
* পুলিশ হেড কোয়ার্টার্স।
* প্রতিনিধিদের সংগৃহিত তথ্য।
ছবি:
সংগৃহিত।
নোটঃ
প্রতিবেদক-
সম্পাদক-প্রকাশক
দৈনিক জনতার দেশ।