বগুড়া জেলা প্রতিনিধি|জনতার দেশঃ
বগুড়া জেলা পুলিশের বিভিন্ন বিল ভাউচারে জালিয়াতির নতুন তথ্য সামনে এসেছে। এই জালিয়াতি ঘটনায় গঠন করা তদন্ত কমিটির সূত্রে জানা গেছে, ভুয়া টিএ বিল তৈরি করে সরকারি অর্থ আত্মসাথের পরিমাণ ইতোমধ্যে ৩ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। এ ঘটনায় বগুড়া জেলা পুলিশে বর্তমান কর্মরত প্রায় ৩০ সদস্যের নাম তদন্তে ওঠে এসেছে। এদের মধ্যে অলরেডি ২০ জনকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়ে গেছে।
সরকারি দায়িত্ব পালন করেও ভ্রমণভাতা, টিএ পাচ্ছিলেন না বগুড়া পুলিশের অনেক সদস্য। অথচ এ খাতে বরাদ্দ আসছিল নিয়মিত। দ্রুতই শেষ হয়ে যাচ্ছিল সেই অর্থ। এ নিয়ে অসন্তোষ ও সন্দেহ বাড়তেই থাকে। শেষ পর্যন্ত পুলিশ সুপারের কম্পিউটার আইডি ব্যবহার করার ঘটনা ধরা পড়ার পর অনুসন্ধানে বেরিয়ে আসে টিএ বিল জালিয়াতির তথ্য।
*যে ভাবে ধরা পড়ে জালিয়াতি*
বগুড়ার পুলিশ সুপার মির্জা সায়েম মাহমুদের ভাষ্য, গত ১৯ আগস্ট সকালে তিনি দাপ্তরিক কাজ করার সময় ত দেখতে পান তার কম্পিউটার আইডিতে অস্বাভাবিকতা রয়েছে। ধারণা করা হয় অন্য কেউ তার আইডি ব্যবহার করেছে। বিষয়টি তিনি তাৎক্ষণিকভাবে জেলা হিসাব রক্ষন কর্মকর্তাকে জানান।
পুলিশ সূত্রে জানা যায়, ঐদিন বিকেলে আইডির নিয়ন্ত্রণ ফিরে পাওয়ার পর শুরু হয় অনুসন্ধান। তখন দেখা যায় আইডি ব্যবহার করে বিভিন্ন পুলিশ সদস্যের নামে টিএ বিল তৈরি করে হিসাব রক্ষণ কর্মকর্তার কার্যালয়ে পাঠানো হয়েছে। প্রাথমিক অনুসন্ধানে তখনই পুলিশ সুপারের কার্যালয়ের অফিস সহকারি রাজিবুল ইসলাম ও হিসাব রক্ষণ কার্যালয় এর অডিটর ফিরোজ আলমের নাম সামনে আসে।
পরে জেলা পুলিশের বিভিন্ন ইউনিটে কর্মরত আরও ৬ সদস্যের ব্যাংক হিসাব যাচাই করে অস্বাভাবিক লেনদেনের তথ্য পাওয়া যায়। এরপরই তদন্তের পরিধি বাড়তে থাকে।
*২০ জন কে জিজ্ঞাসাবাদ*
এই ঘটনার পর গত ২৬ আগস্ট অতিরিক্ত পুলিশ সুপার প্রশাসন ও অর্থ আসাদুজ্জামানকে প্রধান করে ৪ সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে জেলা পুলিশ।
কমিটিকে দশ কার্য দিবসের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়। তদন্ত কমিটির একজন সদস্য বলেন, ১ সেপ্টেম্বর কাজ শুরু করার পর একের পর এক পুলিশ সদস্যের নাম আসতে থাকে। তাদের কেউ বগুড়ায় কর্মরত আবার কেউ বর্তমানে অন্য জেলার দায়িত্ব পালন করছেন। এরপর ১৩ সেপ্টেম্বর ২০ জনকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। জিজ্ঞাসাবাদে কয়েকজন পুলিশ সদস্য দাবি করেন, তাদের ব্যাংক হিসেবে টাকা জমা হলেও পরে সেই অর্থ তুলে পুলিশ সুপারের কার্যালয়ের অফিস সহকারী রাজিবুল ইসলাম ও হিসাবরক্ষণ কার্যালয়ের অডিটর ফিরোজ আলমের হাতে দেয়া হয়েছে।
তদন্ত সংশ্লিষ্টরা জানান পুলিশ সদস্যের এসব বক্তব্য যাচাই করতে ব্যাংক লেনদেন টিএ বিলরেজিস্টার ও হিসাব রক্ষণ কার্যালয়ের নথি মিলিয়ে দেখা হচ্ছে। তবে এখন পর্যন্ত ফিরোজ আলম ও রাজীবুল ইসলাম এর ব্যাংক হিসেবে এসব টাকা জমা হওয়ার তথ্য পাওয়া যায়নি।
এ ঘটনার পর ফিরুজ আলমকে রাজশাহী বিভাগীয় কার্যালয়ে সংযুক্ত করা হয়েছে। তবে অভিযোগের বিষয়ে তাদের বক্তব্য জানতে একাধিকবার ফোন করেও কোন সাড়া পাওয়া যায়নি।
আমি টাকা তুলে ফিরুজ কে দিয়েছি—
জিজ্ঞাসা বাদ করা এক পুলিশ সদস্য নাম প্রকাশ না করা শর্তে বলেন, অডিটর ফিরুজ আলমের সঙ্গে তার আগে থেকেই পরিচয় ছিল। এক পর্যায়ে ফিরোজ তাকে জানান, তার শশুর জমি বিক্রি করে মেয়েকে বাড়ি করার জন্য কিছু টাকা পাঠাবেন। কিন্তু স্ত্রীর ব্যাংক হিসাবে জটিলতা থাকায় টাকা পাঠানো যাচ্ছে না। ওই পুলিশ সদস্যের দাবি তার ব্যাংক হিসেবে টাকা এলে তিনি তা তুলে ফিরোজ আলমকে দিয়েছেন বিনিময়ে ফিরোজ তাকে সামান্য কিছু টাকা দেন যা দিয়ে তিনি বাসার জন্য ফলমূল কিনেছেন।
তদন্ত সংশ্লিষ্টরা বলেছেন, কার হিসেবে কত জমা হয়েছে কার মাধ্যমে সেই অর্থ উত্তোলন করা হয়েছে এবং শেষ পর্যন্ত অর্থ কোথায় গেছে সব বিষয়ে এখন যাচাই করা হচ্ছে।
*২ হাজারের বেশি বিল যাচাই*
জালিয়াতির পরিধি জানতে বগুড়া জেলা পুলিশের দুই হাজারের বেশি সদস্যের টিএ বিলরেজিস্টার যাচাই করা হচ্ছে। পুরোনো বিল বরাদ্দ হিসাব রক্ষণ কার্যালয়ে পাঠানো কাগজপত্র এবং সংশ্লিষ্ট ব্যাংক লেনদেন মিলিয়ে দেখা হচ্ছে।
এ ব্যাপারে পুলিশ সুপার মির্জা সায়েম মাহমুদ বলেন, জেলা পুলিশের তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন পাওয়ার পর পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। বগুড়ার ঘটনাটি পুলিশ সদর দপ্তরে জানানোর পর অন্যান্য জেলায় এ ধরনের জালিয়াতি হয়েছে কিনা তা যাচাই করা হচ্ছে।
বগুড়া জেলা হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা আসাদুজ্জামান সরকার বলেন, জালিয়াতির ঘটনা প্রকাশ পাওয়ার পর প্রধান কার্যালয় থেকে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।
চিফ অ্যাকাউন্টস এন্ড ফিনান্স অফিসার মামুনুল মান্নানের নেতৃত্বে ওই কমিটি বগুড়ায় এসে তদন্ত করে গেছে।তবে তাদের তদন্ত প্রতিবেদন সম্পর্কে এখনো কিছু জানা যায়নি। বিষয়টি হেডকোয়ার্টার সহ সারাদেশে পুলিশ মহলে আতংক উৎকন্ঠা শুরু হয়ে গিয়েছে।