ট্যুরিজম ডেস্কঃ
বাঙালি জাতির ইতিহাসের শিকড় কতটা গভীরে পোঁতা, তা জানতে হলে আমাদের ফিরে যেতে হবে আজ থেকে প্রায় আড়াই হাজার বছর আগে। আর সেই প্রাচীন অতীতের জীবন্ত দলিল হয়ে দাঁড়িয়ে আছে নরসিংদীর বেলাব ও শিবপুর উপজেলায় অবস্থিত উয়ারী-বটেশ্বর। এটি কেবল বাংলাদেশের অন্যতম প্রাচীন নগর সভ্যতা নয়, বরং ভারতীয় উপমহাদেশের ‘দ্বিতীয় নগরায়ণ’-এর এক অনন্য নিদর্শন।
ইট-পাথরের যান্ত্রিক শহর থেকে দূরে, সবুজে ঘেরা এই শান্ত জনপদে লুকিয়ে আছে আমাদের গৌরবময় গঙ্গাঋদ্ধি সভ্যতার ইতিহাস। যে কোনো ছুটির দিনে এক দিনের ট্যুরের জন্য এটি হতে পারে একটি চমৎকার ও শিক্ষণীয় গন্তব্য।
উয়ারী-বটেশ্বরের ইতিহাস ও আবিষ্কারের গল্প
উয়ারী-বটেশ্বর কোনো সাধারণ প্রত্নতাত্ত্বিক স্থান নয়। ১৯৩০-এর দশকে স্থানীয় স্কুলশিক্ষক মোহাম্মদ হানিফ পাঠান প্রথম এই অঞ্চলের প্রাচীনত্বের বিষয়টি অনুধাবন করেন। পরবর্তীতে তার ছেলে হাবিবুল্লা পাঠান এই সংগ্রহের কাজ চালু রাখেন। ২০০০ সালের পর থেকে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক ড. সূফি মোস্তাফিজুর রহমানের নেতৃত্বে এখানে নিয়মিত খননকার্য শুরু হয়।
খননকার্যের ফলে এখানে আবিষ্কৃত হয়েছে ৬০০ মিটার × ৬০০ মিটার আয়তনের একটি দুর্গ-নগর, চারপাশের পরিখা এবং প্রায় আড়াই হাজার বছর প্রাচীন পাকা রাস্তা। ইতিহাসবিদ ও গ্রিক ভূগোলবিদ টলেমির বিবরণী অনুযায়ী, অনেকেই ধারণা করেন এটিই ছিল প্রাচীন আন্তর্জাতিক বাণিজ্য কেন্দ্র ‘সোনাগড়া’। এখান থেকে রোমান সাম্রাজ্য ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সাথে নৌপথে ব্যবসা-বাণিজ্য চলত।
উয়ারী-বটেশ্বরে যা যা দেখবেন
উয়ারী-বটেশ্বরে প্রত্নতাত্ত্বিক খননস্থলগুলো সাধারণত মৌসুম শেষে সুরক্ষার জন্য মাটি দিয়ে ঢেকে দেওয়া হলেও দর্শনার্থীদের জন্য দেখার মতো দারুণ কিছু জায়গা রয়েছে।
উন্মুক্ত প্রত্নতাত্ত্বিক জাদুঘরঃ
প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘ঐতিহ্য অন্বেষণ’-এর উদ্যোগে এখানে একটি চমৎকার উন্মুক্ত জাদুঘর তৈরি করা হয়েছে। এখানে প্রাচীন মানুষের ভূগর্ভস্থ ঘর বা ‘পিট-ডুয়েলিং’-এর রেপ্লিকা, প্রাচীন সভ্যতার আলোকচিত্র, মডেল এবং খননকার্যের বিভিন্ন বিবরণী দেখতে পাবেন।
গঙ্গা ঋদ্ধি জাদুঘর
এই অঞ্চলের প্রাচীন নিদর্শনগুলোকে স্থায়ীভাবে সংরক্ষণ ও প্রদর্শনের জন্য নরসিংদী জেলা পরিষদের অর্থায়নে ৩ তলা বিশিষ্ট একটি আধুনিক জাদুঘর ভবন নির্মাণের কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে রয়েছে। এটি চালু হলে দর্শনার্থীরা মূল প্রত্নতাত্ত্বিক সামগ্রীগুলো একনজরে দেখার সুযোগ পাবেন।
অসম রাজার গড়ঃ
দুর্গের প্রতিরক্ষা প্রাচীর হিসেবে ব্যবহৃত মাটির তৈরি এই দীর্ঘ প্রাচীরটি স্থানীয়ভাবে ‘অসম রাজার গড়’ নামে পরিচিত। ইতিহাসের বিশালতা অনুভব করতে এখানে কিছুক্ষণ হেঁটে বেড়াতে পারেন।
পদ্মপুকুর ও বৌদ্ধ পদ্মমন্দিরঃ
খননকাজের সময় আবিষ্কৃত প্রাচীন বৌদ্ধ মঠ এবং অনন্য স্থাপত্যশৈলীর বৌদ্ধ কুণ্ড বা পদ্মপুকুরের ধ্বংসাবশেষ এই অঞ্চলের ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক সমৃদ্ধির পরিচয় বহন করে।
উয়ারী-বটেশ্বরে যাবেন যেভাবেঃ
ঢাকার মহাখালী, সায়েদাবাদ বা গুলিস্তান থেকে সিলেট বা ভৈরবগামী যে কোনো ভালো বাসে (যেমন- এনা, রয়েল, ঢাকা ট্রেইস) উঠে পড়ুন। বাস চালক বা হেলপারকে বলবেন আপনাকে নরসিংদীর মরজাল বাস স্ট্যান্ডে নামিয়ে দিতে। ঢাকা থেকে মরজাল যেতে সময় লাগবে ২ থেকে আড়াই ঘণ্টা। ভাড়া পড়বে ১৫০ থেকে ২৫০ টাকার মধ্যে।
মরজাল বাস স্ট্যান্ডে নেমে সেখান থেকে বেলাবগামী সিএনজি বা ইজিবাইক (টমটম) পেয়ে যাবেন। সিএনজি রিজার্ভ করে সরাসরি উয়ারী-বটেশ্বর গ্রামে চলে যেতে পারেন। ভাড়া পড়বে ১৫০-২০০ টাকা। আর শেয়ারে গেলে জনপ্রতি ৩০-৪০ টাকা।