স্টাফ রিপোর্টারঃ
পার্বত্য অঞ্চলের অন্যতম পর্যটনকেন্দ্র সাজেক। ধারণা করা হচ্ছে, সেখানে অস্থিরতা দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে। পাহাড়ের আন্দোলনকারী, ব্যবসায়ী, জনপ্রতিনিধি এবং নেতাদের সঙ্গে কথা বলে এমন ধারণা পাওয়া যায়। পার্বত্য এলাকার আঞ্চলিক সংগঠনগুলোর তৎপরতা, নিরাপত্তা বাহিনী ও প্রশাসনের অবস্থান পর্যালোচনা করেও সাজেকে দীর্ঘমেয়াদি অস্থিরতার ইঙ্গিত পাওয়া যায়। কেননা পাহাড়ি দুটি সংগঠনের ডাকে টানা অবরোধে সাজেকে চরম অচলাবস্থা সৃষ্টি হয়েছে।
ব্যবসায়ীরা বলছেন, স্থানীয় পর্যটন অর্থনীতি ও জীবন-জীবিকায় এ পরিস্থিতি গভীর সংকট তৈরি করেছে। তবে অবরোধ কর্মসূচি প্রত্যাহার করা হলেও পর্যটন পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে সময় লেগে যাবে বলে আশঙ্কা করছেন স্থানীয় পর্যটনখাতের ব্যবসায়ীরা। অবরোধকারী বা আন্দোলনকারীদের সঙ্গে সরকারের উচ্চ পর্যায়ের প্রতিনিধিদলের আলোচনার পরও তাৎক্ষণিক সমাধান না হওয়ায় পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে।
আলোচনায় অংশ নেওয়া খাগড়াছড়ির সংসদ সদস্য ওয়াদুদ ভুইয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, সরকার কৌশলে এই সমস্যার সমাধান করতে চাইছে। তার কথায় আন্দোলনকারীদের দাবি মেনে একটি অস্ত্রধারী গ্রুপকে সরিয়ে আরেকটি গ্রুপের জন্য জায়গা করে দেওয়া রাষ্ট্রীয় বাহিনী বা সরকারের পক্ষে সম্ভব নয়। সরকার সব অবৈধ অস্ত্রধারীকে সাজেক এলাকা থেকে বিতাড়িত করে শান্তি প্রতিষ্ঠা করতে চায়।
পাহাড়িদের সংগঠন সাজেক কারবারি অ্যাসোসিয়েশন এবং সাজেক গণঅধিকার রক্ষা কমিটি অবরোধের প্রধান কারণ হিসেবে সামনে এনেছে ‘অস্ত্রধারী জেএসএস সন্তু গ্রুপের’ উপস্থিতি। সংগঠনের আহ্বায়ক বাবুধন চাকমা অভিযোগ করেন, ৩১ অগাস্ট থেকে সাজেকের মাচালং এলাকায় অস্ত্রধারী গ্রুপ অবস্থান নিয়েছে। ওই গ্রুপের উপস্থিতি পাহাড়ে স্বাভাবিক জীবনযাত্রা, চাষাবাদ ব্যাহত করছে।
আন্দোলনকারীদের ভাষায়, অস্ত্রধারী সন্তু গ্রুপকে সাজেক এলাকা থেকে সরিয়ে দেওয়ার বিষয়ে আশ্বস্ত না হওয়া পর্যন্ত তাদের অবরোধ চলবে। তাদের ওই এলাকা থেকে সরিয়ে এলাকার শান্তিপূর্ণ পরিবেশ সৃষ্টি করা আন্দোলনকারীদের প্রধান লক্ষ্য। অবরোধকারীরা প্রায় দুই মাস যাবৎ সেখানে অবস্থান করছেন। প্রত্যেকটি পাড়ার মুরব্বিদের মারধর এবং হুমকি, মোবাইল ছিনতাই করে নেওয়া এবং অতিরিক্ত চাঁদা আদায়ের কাজ করছে সন্ত্রাসী গ্রুপটি। সেখানে কয়েকশ পরিবার ঘরছাড়া হয়ে দিনযাপন করছে।
পাহাড়ি কয়েকটি সংগঠনের ডাকে অক্টোবর মাসে সাজেকে তৃতীয় দফায় অবরোধ শুরু হলে পর্যটনখাত মারাত্মক সংকটে পড়ে। তৃতীয় দফা অবরোধ শুরুর দিন ২২ অক্টোবর পর্যটকদের সাজেক থেকে ফিরিয়ে আনার সময় নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে গোলাগুলির ঘটনা ঘটে। আন্দোলনে যুক্ত দুই সংগঠনের একটি সাজেক গণঅধিকার রক্ষা কমিটির আহ্বায়ক বাবুধন চাকমা বলেন, উজোবাজারের ঘটনায় সেনাবাহিনীর দেওয়া বক্তব্যের সঙ্গেও তারা একমত নন।
সেনাবাহিনীর পক্ষে আইএসপিআর একটি বিবৃতিতে জানিয়েছে, তিন হাজার পর্যটককে নিরাপদে সরিয়ে আনার সময় অস্ত্রধারীরা ৩০-৪০ রাউন্ড গুলি ছোড়ে। সেখানে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে সেনাবাহিনী পাল্টা গুলি ছোড়ে। বাবুধন চাকমার ভাষায়, সাজেকের নারী-পুরুষ সবাই এ আন্দোলনে অংশ নেয়, তাদের ওপর লাঠিচার্জ করা হলে অর্ধশতাধিক আহত হয়েছিলেন। তাদের দোকান-পাট তছনছ করা হয়, স্থানীয় দোকানপাট ক্ষয়ক্ষতির শিকার হয়।
এ ছাড়া সাজেক সড়কের উজোবাজারে প্রকাশ্যে অস্ত্র নিয়ে গোলাগুলির পরিবেশ এবং পরিস্থিতি বা সুযোগ সেখানে ছিল না বলেও দাবি করেন বাবুধন চাকমা। সেনাবাহিনীর লাঠিচার্জের পর অবরোধ কর্মসূচি পাঁচ দফা দাবিতে রূপ নেয়। পাহাড়ের পরিস্থিতিটা এমন যে সেখানে একটা ভয়ের পরিবেশ আছে। মুক্ত এবং স্বাধীনভাবে সবাই প্রকাশ্যে কথা বলতেও স্বচ্ছন্দ্য বোধ করেন না। পর্যটন ও পরিবহন ব্যবসার সঙ্গে জড়িত ব্যবসায়ীদের কথায় আঞ্চলিক গোষ্ঠীগুলোর চাঁদার অর্থের নিয়ন্ত্রণ এখানে একটা বড় ইস্যু।
সাজেক ভ্যালি রাঙ্গামাটি জেলার সীমানায়। সেখানে সড়ক পথে যেতে হয় খাগড়াছড়ি দিয়ে। সাজেক পাহাড়ে পর্যটক যাত্রী ও পণ্য পরিবহনে খাগড়াছড়ি থেকে দৈনিক ৫ শতাধিক জিপ চলাচল করে। সাজেকে আছে দেড়শতাধিক হোটেল-রিসোর্ট। সাজেককে কেন্দ্র করে সেই এলাকায় প্রতিদিন অন্তত তিন কোটি টাকার আর্থিক লেনদেন হয়। সাজেকে কৃষি, পর্যটন, পরিবহন, বাণিজ্য মিলিয়ে সেখানে একটি বড় অঙ্কের চাঁদাবাজির ঘটনা ঘটে। পাহাড়ে আঞ্চলিক সংগঠনগুলোর এই চাঁদা তোলার বিষয়টি স্থানীয় ব্যবসায়ী ও প্রশাসন জনপ্রতিনিধিসহ সবার কাছেই ওপেন সিক্রেট।
সাজেক এলাকায় নিয়ন্ত্রণ এবং আধিপত্য ছিল ইউপিডিএফ নামের একটি সংগঠনের হাতে। তাদের হটিয়ে সেখানে জেএসএস এখন অবস্থান নিয়েছে। সেই প্রেক্ষাপটে অস্থিরতা দেখা দিয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে। খাগড়াছড়ির সংসদ সদস্য ওয়াদুদ ভূইয়া সাজেক সংকটের নেপথ্যে আধিপত্য বিস্তারের বিষয়টিকেই সামনে আনেন। তার ভাষায়, এই এলাকায় আধিপত্য ধরে রাখা এবং নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখার প্রশ্নেই মূল সমস্যাটা হয়েছে।
খাগড়াছড়ি সড়ক পরিবহন জিপ মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মো. মীর হোসেন বলেন, ‘ক্ষমতার দ্বন্দ্ব, আধিপত্য টিকিয়ে রাখার জন্য একদল আরেকদলকে দোষারোপ করে। আমরা চাই স্থায়ী সমাধান। আমরা চাই শান্তি। কোনো অস্ত্রধারী যেন না থাকে, আমরা কোনো অস্ত্রধারীর কাছে যেন জিম্মি না থাকি। আমাদের বছরে টোকেন দিতে হয়। যদি আমরা টোকেন না দিই আমাদের ড্রাইভারকে মারধর করে। গাড়ি জ্বালিয়ে দেয়। বছরে আমাদের প্রত্যেক গাড়ির পেছনে দুই-তিন হাজার করে চাঁদা দিতে হয়।’
এখন কথা হচ্ছে, সারাদেশ থেকে হাজার হাজার পর্যটক আসেন। তারা যেন স্বাধীনভাবে নির্ভয়ে চলাচল করতে পারেন পার্বত্য চট্টগ্রামে। এমনকি নির্ভয়ে সাজেকে আসা-যাওয়া করতে পারেন, সেটাই আমাদের প্রত্যাশা।
তথ্য: Jago News 24
ছবিঃ
সংগৃহিত।