বিনোদন ডেস্ক| জনতার দেশঃ
ব্যস্ত নাগরিক জীবনের যান্ত্রিক কোলাহল যখন ক্লান্তি ধরিয়ে দেয়, তখন মন চায় এমন কোথাও হারিয়ে যেতে যেখানে সময় থমকে দাঁড়িয়ে আছে শত বছর ধরে। ইট-কংক্রিটের জঙ্গল থেকে মাত্র কয়েক ঘণ্টার দূরত্বে যদি মেলে এক টুকরো ইতিহাস আর চোখ জুড়ানো সবুজের মেলবন্ধন, তবে মন্দ হয় না।
ঢাকার একদম কাছেই নরসিংদী জেলার পলাশ উপজেলার ঘোড়াশালে লুকিয়ে আছে ঠিক তেমনই এক জাদুকরী দুয়ার। স্থানীয় মানুষের কাছে এটি মনু মিয়া জমিদার বাড়ি নামে পরিচিত হলেও এর পরতে পরতে জড়িয়ে আছে প্রায় আড়াইশ বছরের পুরনো আভিজাত্য, ক্ষমতা আর এক গৌরবোজ্জ্বল অতীতের গল্প। শীতলক্ষ্যা নদীর কোল ঘেঁষে গড়ে ওঠা এই ঐতিহ্যবাহী স্থাপনাটি যে কোনো ভ্রমণপিয়াসী মানুষের জন্য হতে পারে এক চমৎকার উইকএন্ড ডেস্টিনেশন।
ইতিহাসের পাতা থেকে
কাগজ-কলমে এর আদি নাম ‘ঘোড়াশাল জমিদার বাড়ি’ হলেও লোকমুখে এটি ‘মনু মিয়ার বাড়ি’ নামেই সর্বাধিক পরিচিত। বাংলা ১১৭৬ সনের দিকে জমিদার সাজদা মিয়ার হাত ধরে এই বাড়ির গোড়াপত্তন হয়। পরবর্তীতে এই বংশের অন্যতম নামজাদা পুরুষ এবং সাবেক সাংসদ ও ঐতিহ্যবাহী দৈনিক সংবাদ পত্রিকার সম্পাদক আহমাদুল কবির মনু মিয়ার নামানুসারে পুরো এলাকা ও এই স্থাপনাটি পরিচিতি লাভ করে। প্রায় ১০ একর বিশাল এলাকাজুড়ে বিস্তৃত এই জমিদার বাড়ির ছায়ায় পা রাখতেই এক অদ্ভুত নীরবতা আপনাকে গ্রাস করবে। মনে হবে, আপনি বর্তমান সময় থেকে ছিটকে চলে গেছেন ব্রিটিশ আমলের কোনো এক জাঁকজমকপূর্ণ উপাখ্যানে।
স্থাপত্যশৈলীতে ইউরোপীয় ছোঁয়া
মনু মিয়া জমিদার বাড়ির মূল আকর্ষণ হলো এর অনন্য স্থাপত্যশৈলী। এটি মূলত ক্লাসিক্যাল কলোনিয়াল বা ইউরোপীয় স্থাপত্যের এক অপূর্ব নিদর্শন। বাড়ির সদর দরজার সামনে দাঁড়াতেই চোখ জুড়িয়ে যায় বিশাল ও সুনিপুণ কারুকার্যখচিত কলাম বা স্তম্ভগুলোর দিকে তাকিয়ে। খিলান আকৃতির দরজা, জানালার ওপরের সূক্ষ্ম লতাপাতার নকশা এবং ছাদের কার্নিশে প্রাচীন কারিগরদের হাতের জাদু এখনো স্পষ্ট।
পুরো বাড়িটি তৈরি করা হয়েছে চুন-সুরকি, বিশেষ ইটের মিশ্রণে। মূল প্রাসাদের ভেতরে প্রবেশ করলে এক অদ্ভুত অনুভূতি হয়। বাইরের কড়া রোদ আর গরমের মধ্যেও প্রাসাদের ভেতরের তাপমাত্রা সবসময় বেশ কম আর শীতল থাকে। প্রাচীন স্থপতিদের এই বিজ্ঞানসম্মত নির্মাণশৈলী সত্যিই অবাক করার মতো।
সবুজ আর দিঘির মায়াজাল
জমিদার বাড়িটি শুধু দালানের সৌন্দর্যেই সীমাবদ্ধ নয়। এর চারপাশের প্রাকৃতিক পরিবেশও মন ভরিয়ে দেওয়ার মতো। জমিদার বাড়ির সীমানার ভেতরেই রয়েছে বিশাল মাঠ, দুটি বড় বাঁধানো দিঘি এবং একটি প্রাচীন পারিবারিক মসজিদ। দিঘির ঘাটে বসে যখন মৃদু বাতাস এসে গায়ে লাগবে, তখন মনে হবে নদীর পারের কোনো শান্ত গ্রামে বসে আছেন।
বাড়ির চারপাশ জুড়ে রয়েছে হরেক রকমের গাছগাছালি। যার মধ্যে কিছু বিরল প্রজাতির ফলের গাছও রয়েছে। শোনা যায়, একসময় এখানে দূর-দূরান্ত থেকে আনা সুগন্ধি ফুলের বাগান ছিল। যার সুবাস ছড়িয়ে পড়ত পুরো ঘোড়াশাল জুড়ে। আজ হয়তো সেই সুবাস নেই, কিন্তু শতবর্ষী গাছগুলোর পাতার মর্মর ধ্বনিতে এখনো কান পাতলে অতীতের সেই জৌলুসের শব্দ শোনা যায়।
কেন যাবেন এই জমিদার বাড়িতে?
আজকের দিনে আমরা যখন ভ্রমণের কথা ভাবি, তখন বিনোদন পার্ক বা যান্ত্রিক কোনো রিসোর্টের ছবিই ভেসে ওঠে। কিন্তু মনু মিয়া জমিদার বাড়ি আপনাকে দেবে এক আত্মিক প্রশান্তি। এখানে কোনো কৃত্রিমতা নেই। চুন-সুরকি খসে পড়া দেয়ালগুলো যেন এক একটি জীবন্ত ইতিহাস। যারা ছবি তুলতে ভালোবাসেন, তাদের জন্য এই স্থানটি এক স্বর্গরাজ্য। সাদা রঙের এই রাজকীয় ভবনের থামের পাশে দাঁড়িয়ে কিংবা দিঘির বাঁধানো ঘাটে বসে তোলা একেকটি ছবি আপনার সোশ্যাল মিডিয়া প্রোফাইলকে করে তুলবে অনন্য। ঢাকা থেকে এত কাছে ডে-ট্যুর বা একদিনের ভ্রমণের জন্য এর চেয়ে শান্ত ও তথ্যবহুল জায়গা খুব কমই আছে।
ভ্রমণকারীদের জন্য কিছু জরুরি তথ্য
যেহেতু এটি একটি ব্যক্তিমালিকানাধীন এবং এখনো তাদের বংশধরদের তত্ত্বাবধানে থাকা সম্পত্তি। তাই এখানে ঘুরতে যাওয়ার ক্ষেত্রে কিছু নিয়ম মেনে চলা আবশ্যক। বাড়ির মূল আঙিনায় প্রবেশ করতে বা ভেতরে ছবি তুলতে হলে দায়িত্বরত কেয়ারটেকার বা কর্তৃপক্ষের অনুমতি নিতে হয়। ভেতরে কোনো ধরনের হইচই করা বা পরিবেশ নোংরা করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। ইতিহাসকে সম্মান জানিয়ে শান্তভাবে ঘুরে দেখাই এখানকার মূল সৌন্দর্য।
জেনে নিন প্রয়োজনীয় খুঁটিনাটি
কীভাবে যাবেন?
ঢাকা থেকে নরসিংদীর এই জমিদার বাড়িতে যাওয়া অত্যন্ত সহজ। আপনি চাইলে সড়কপথ বা রেলপথ—উভয় মাধ্যমই বেছে নিতে পারেন।
ট্রেন
ঢাকার কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশন থেকে চিলমারী বা কর্ণফুলী এক্সপ্রেসের মতো লোকাল বা মেইল ট্রেনে উঠে সরাসরি নেমে যেতে পারেন ঘোড়াশাল ফ্ল্যাগ স্টেশন বা ঘোড়াশাল স্টেশনে। ভাড়া পড়বে মাত্র ২৫ থেকে ৩০ টাকা। স্টেশন থেকে মাত্র ১০-১৫ টাকা অটো ভাড়ায় পৌঁছে যাবেন মিয়া পাড়া রোডের এই জমিদার বাড়িতে।
বাস
ঢাকার মহাখালী বাস টার্মিনাল থেকে পিপিএল, চলনবিল বা বাদশা পরিবহনের বাসে উঠে সরাসরি ঘোড়াশাল বাস স্ট্যান্ডে নামা যায়। ভাড়া পড়বে ৭০-৮০ টাকা। বাস স্ট্যান্ড থেকে রিকশা বা ইজিবাইক নিয়ে সহজেই চলে যেতে পারবেন জমিদার বাড়িতে।
খাওয়া-দাওয়া ও রাত্রিযাপন
একদিনের ট্যুর হওয়ায় সাধারণত এখানে থাকার প্রয়োজন পড়ে না। ঘোড়াশাল বাজার বা নরসিংদী জেলা সদরে দুপুরের খাবারের জন্য বেশ কিছু ভালো মানের স্থানীয় হোটেল ও রেস্তোরাঁ পেয়ে যাবেন। নরসিংদীর বিখ্যাত ঐতিহ্যবাহী মিষ্টি ও লটকন (মৌসুম অনুযায়ী) চেখে দেখতে ভুলবেন না কিন্তু! যদি রাত্রিকালীন অবস্থানের ইচ্ছে থাকে, তবে নরসিংদী শহরে বিভিন্ন মানের বেশ কিছু আধুনিক আবাসিক হোটেল ও গেস্ট হাউস রয়েছে।
ইতিহাসের ধুলোবালি মাখা এই রাজকীয় প্রাসাদের বারান্দায় দাঁড়িয়ে একটা বিকেল কাটিয়ে দিন। গোধূলির আলো যখন সাদা কলামগুলোর ওপর এসে পড়ে, তখন চোখের সামনে ভেসে উঠবে পালকি করে জমিদারদের আসা-যাওয়া কিংবা কাচারি ঘরের সেই ব্যস্ততা। ব্যস্ত জীবন থেকে একটা দিন ছুটি নিয়ে ঘুরে আসুন ঘোড়াশালের এই লুকানো রত্নটি থেকে। গ্যারান্টি দিয়ে বলা যায়—স্মৃতির পাতায় এই ভ্রমণ জমা থাকবে অনেক দিন।
তথ্য ঋণঃ
Jago News 24
ছবিঃ
# সংগৃহিত।