নড়াইল প্রতিনিধি:
নড়াইল জেলার অন্যতম ঐতিহাসিক ও দৃষ্টিনন্দন পর্যটনকেন্দ্র ‘বাঁধাঘাট’-এর মূল অংশের জমি দখল করে একটি বিশাল শিবলিঙ্গ স্থাপন করার অভিযোগ উঠেছে। চিত্রা নদীর কূলঘেঁষে অবস্থিত জমিদারি আমলের এই ঐতিহাসিক নিদর্শনটিতে প্রতিদিন অসংখ্য পর্যটক সমবেত হন। তবে সম্প্রতি জনসমাগমস্থলের মূল জায়গায় ধর্মীয় প্রতীক স্থাপনের ফলে সাধারণ দর্শনার্থীদের চলাচলে বিঘ্ন ঘটছে এবং বিষয়টি নিয়ে স্থানীয় মহলে তীব্র ক্ষোভ ও মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, তৎকালীন জমিদারি আমলের প্রাচীন স্থাপত্যশৈলীর অন্যতম নিদর্শন এই বাঁধাঘাট নড়াইল জেলার ইতিহাস ও ঐতিহ্যের সাথে গভীরভাবে মিশে আছে। প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও নদীর নির্মল বাতাস উপভোগ করতে নড়াইলসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে প্রতিদিন শত শত দর্শনার্থী এখানে আসেন। পর্যটন সম্ভাবনাকে কেন্দ্র করে স্থানটি সবসময় মুখরিত থাকে।
অনুসন্ধানে প্রকাশ, কয়েক বছর আগে এই বাঁধাঘাট সংলগ্ন একটি খালি জায়গায় স্থানীয় হিন্দু সম্প্রদায়ের ব্যক্তিবর্গ একটি মন্দির নির্মাণ করেন। সে সময় সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির অনন্য নজির হিসেবে স্থানীয় মুসলিম বা অন্যান্য সম্প্রদায়ের মানুষের পক্ষ থেকে কোনো ধরনের আপত্তি বা বাধা দেওয়া হয়নি। তবে বিপত্তির সূত্রপাত ঘটে সাম্প্রতিক সময়ে, যখন মন্দিরের পরিধি ছাড়িয়ে পর্যটনকেন্দ্রের মূল চত্বরের এবং ঘাটের সিঁড়ির একেবারে কাছাকাছি বিশাল জায়গা জুড়ে একটি শিবলিঙ্গ স্থাপন করা হয়।
এর ফলে ঘুরতে আসা সাধারণ দর্শনার্থীদের বাধ্য হয়ে একেবারে ধর্মীয় প্রতীকের পাশ ঘেঁষেই যাতায়াত করতে হচ্ছে এবং বাঁধাঘাটের সিঁড়িতে বসতে হচ্ছে। এতে যেমন পর্যটকদের ব্যক্তিগত স্বাচ্ছন্দ্য নষ্ট হচ্ছে এবং তারা বিব্রত হচ্ছেন, তেমনি ধর্মীয় পবিত্রতা ক্ষুণ্ন হওয়ার আশঙ্কাও তৈরি হয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের যুক্তি, সনাতন ধর্মীয় রীতি অনুযায়ী সব জায়গাতেই শিবলিঙ্গ সাধারণত মন্দিরের মূল অভ্যন্তরে বা গর্ভগৃহে স্থাপন করা হয়ে থাকে। কিন্তু এখানে একটি উন্মুক্ত ও সাধারণ মানুষের সমাগমস্থলে কেন এটি স্থাপন করা হলো—তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন অনেকে।
এই উদ্ভূত সমস্যা নিরসনে এবং ঐতিহাসিক ঐতিহ্যটি সুরক্ষার্থে স্থানীয় সাধারণ জনগণ ইতিমধ্যেই জেলা প্রশাসনের দ্বারস্থ হয়েছেন। তারা সরকারি আমিন বা জরিপকারী দলের মাধ্যমে জমি মেপে মন্দিরের প্রকৃত সীমানা নির্ধারণ এবং পর্যটনকেন্দ্রের সাধারণ চত্বর ও বাঁধাঘাটকে সংরক্ষণের দাবি জানিয়েছেন। তবে স্থানীয়দের অভিযোগ, জেলা প্রশাসনকে এই বিষয়ে একাধিকবার জানানো সত্ত্বেও এখন পর্যন্ত কার্যকর কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়নি।
সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বজায় রাখার আহ্বান: নড়াইলের দীর্ঘদিনের ঐতিহ্যবাহী সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি অক্ষুণ্ন রাখতে জেলা প্রশাসন ও হিন্দু সম্প্রদায়ের দায়িত্বশীল নেতৃবৃন্দের প্রতি বিশেষ আহ্বান জানানো হয়েছে। অনতিবিলম্বে উন্মুক্ত স্থানে স্থাপিত শিবলিঙ্গটি সুনির্দিষ্ট ধর্মীয় নিয়ম মেনে মন্দিরের অভ্যন্তরে পুনঃস্থাপন করাই হবে এই সমস্যার যৌক্তিক সমাধান। একই সাথে এই সংবেদনশীল বিষয়টিকে কেন্দ্র করে যাতে কোনো ধরনের সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা, উসকানি বা পারস্পরিক মনোমালিন্য সৃষ্টি না হয়, সে লক্ষ্যে সর্বস্তরের জনগণকে সজাগ ও সহনশীল থাকার জন্য বিশেষভাবে অনুরোধ করা হচ্ছে।