লিয়াকত হোসেন খোকন:
পূর্ব বাংলার সেই মেয়েটি
জন্ম – ২১ ফেব্রুয়ারি ১৯৩৭
তিনি ছিলেন ঢাকার নারীশিক্ষা মন্দিরের ছাত্রী ।
তিনি হলেন সাবিত্রী চট্টোপাধ্যায়। দেশভাগের পরে তিনি পূর্ববাংলা ছেড়ে কলকাতায় চলে গেলেন । নাটক করলেন, সিনেমার নায়িকা হলেন – পরবর্তীতে
কলকাতায় সাম্রাজ্য গড়লেন ।
‘পাশের বাড়ি’ করার পরে বিখ্যাত নায়িকা হলেন পূর্ববঙ্গের সেই মেয়েটি।
এরপরের কাহিনী তো সবারই জানা ।
পূর্ববাংলায় যখন ছিলেন তিনি কেমন ছিলেন তিনি , দিনগুলো কিভাবে কাটিয়ে
গিয়েছিলেন। সে সব কাহিনি আজ ধূসর স্মৃতি!
তাঁর জন্ম তৎকালীন কুমিল্লা জেলার এক মফস্বলে। ঢাকার কমলাপুরে জন্মের কিছুদিন পরে চলে এলেন।
তখন কমলাপুর ছিল গাঁও – গ্রাম এলাকা । তাঁর পিতার নাম শ্রী শশধর চট্টোপাধ্যায় ।
তাঁরা ১০ বোন , তিনিই সর্ব্ব কনিষ্ঠা । তাঁর কোন ভাই ছিল না বলেই তাঁর দুঃখ ছিল শৈশবের দিনগুলিতে । কমলাপুর গ্রামে তাঁর শৈশবের বহু দিন কেটেছে। সেখানেই প্রকৃতির কোলে , ছায়া শীতল গ্রামের প্রাকৃতিক পরিবেশে ধীরে ধীরে বড় হয়েছিলেন । শৈশবে বান্ধবীদের সঙ্গে তিনি এক্কাদোক্কা খেলতেন , ছিবুড়ি খেলাসহ কত কি খেলা দেখতেন । বাবার হাত ধরে সিনেমা হলে গিয়ে কাননবালার ছবি দেখতেন আর মনে মনে ভাবতেন , কলকাতায় যাবো – কাননবালা হবো । ঘর থেকে বের হতেই তিনি দেখতে পেতেন , কত বিচিত্র ধরনের পাখি , অগ্রহায়ণে দু’নয়ন ভরে দেখতেন মাঠ ভরা সোনালী ধান । সেই গ্রাম্য পরিবেশ কলকাতায় গিয়ে আর পেলেন না আমার পূর্ববাংলার সেই মেয়েটি । স্কুলজীবন তাঁর শুরু হয়েছিল ঢাকার নারী শিক্ষা মন্দিরে – এটি ছিল তাদের বাড়ি থেকে দেড় মাইল দূরে । স্কুলে যেতেন তিনি পায়ে হেঁটে । শৈশব থেকে নাচে ও গানে তাঁর একটু ঝোঁক ছিল । তাই নারী শিক্ষা মন্দিরে কোন অনুষ্ঠান হলে সেখানে তিনি নাচতেন , গান গাইতেন । আর নাটক হলে অভিনয় করে দর্শকদেরকে দিতেন আনন্দ । ঢাকার নারী শিক্ষা মন্দির আজও আছে তবে নাম পরিবর্তন করে ফেলা হয়েছে। নারী শিক্ষা মন্দির নাম পাল্টে শেরেবাংলা বালিকা বিদ্যালয় করা হয়েছে – যা পরবর্তীতে করা হয়েছে মহাবিদ্যালয়। ১৯২৮ সালে নারী শিক্ষা মন্দির প্রতিষ্ঠা করেছিলেন ব্রিটিশ-ভারতের প্রখ্যাত নারীনেত্রী লীলা নাগ। এর প্রতিষ্ঠাকালীন নাম ছিল ‘নারী শিক্ষা মন্দির’।
নারী শিক্ষা মন্দিরে সেই মেয়েটি পড়াশোনা করেছিলেন ১৯৪৫ থেকে ১৯৪৭ সাল পর্যন্ত। স্কুল জীবনে তিনি ‘মা’ নামে একখানা নাটকের বই লিখলেন । স্কুলের বান্ধবীদেরকে নিয়ে ‘মা’ নাম দিয়ে নাটক করে শিক্ষিকাদের কাছে প্রশংসাও পেয়েছিলেন। দেশভাগের কারণেই ঢাকা ছেড়ে কলকাতায় চলে গেল তাঁদের পুরো পরিবার । অবশ্য এরআগে বাবার সঙ্গে কয়েকবার কলকাতায় বেড়াতে এসেছিলেন ।
কলকাতায় স্থায়ীভাবে বসবাসের পরে ‘নতুন ইহুদি’ নাটকে অভিনয় করার পরে ফিল্মে ডাক এলো তাঁর। চলচ্চিত্রে প্রথম অভিনয় করলেন ‘নতুন ইহুদি’ ছবিতে। তারপর
একে একে অভিনয় করলেন – পাশের বাড়ি , মহিষাসুর বধ , বসু পরিবার , সাবিত্রী সত্যবান , শুভদা , বৌদির বোন , নতুন ইহুদি , কাজরী , কেরাণীর জীবন , অন্ধদেবতা , ময়লা কাগজ আরও কত কি ছবিতে । এভাবেই আমার পূর্ববাংলার সেই মেয়েটি কলকাতার চিত্রজগত বিজয় করল , এ ব্যাপারে তাঁকে
যিনি বিশেষ সহযোগিতা করেছিলেন তিনি হলেন ভানু বন্দ্যোপাধ্যায় । আর এই ভানু বন্দ্যোপাধ্যায়ও হলেন পূর্ববাংলার বিক্রমপুরের সন্তান।
উত্তম কুমারের সঙ্গে তাঁর স্মরণীয় ছবিগুলি হলো – চাঁপা ডাঙার বৌ , লাখ টাকা , কল্যানী , হাত বাড়ালেই বন্ধু , রাত ভোর , তাসের ঘর , অভয়ের বিয়ে , ডাক্তার বাবু , দুই ভাই , নবজন্ম , গলি থেকে রাজপথ , রাজা সাজা , মোমের আলো, সেই চোখ , নিশিপদ্ম ,
ব্রজবুলি ।
বি.দ্র.
প্রতিবেদক,একজন সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব ও বিনোদন সাংবাদিক।