স্টাফ রিপোর্টারঃ
কক্সবাজারের টেকনাফের লেদা-রঙ্গিখালীর দুর্গম পাহাড়ে মানবপাচারকারী চক্রের বন্দিশালার আশপাশে ৩টি মরদেহ পড়ে থাকার খবরের ভিত্তিতে যৌথ অভিযান চালিয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। শনিবার (৭ নভেম্বর) সকাল থেকে প্রায় ৪ ঘণ্টা ধরে ১০ কিলোমিটার পাহাড়ি পথে তল্লাশি চালিয়ে কোনো মরদেহের সন্ধান পাওয়া যায়নি।
সেনাবাহিনীর ১০ পদাতিক ডিভিশনের নেতৃত্বে শনিবার সকাল সাড়ে ৭টা থেকে শুরু হওয়া এ অভিযানে সেনাবাহিনী, বিজিবি ও পুলিশের দেড় শতাধিক সদস্য অংশ নেন। প্রায় ৪ ঘণ্টার অভিযান শেষে বেলা সাড়ে ১১টার দিকে ফিরে আসেন তারা।
টেকনাফ মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সাইফুল ইসলাম জানান, প্রায় ১০ কিলোমিটার দুর্গম পাহাড়ি পথ পাড়ি দিয়ে বিভিন্ন স্থানে তল্লাশি চালানো হয়েছে। তবে কোনো মরদেহ পাওয়া যায়নি। কেউ মরদেহ সরিয়ে ফেলেছে কি না, সে সম্পর্কেও পুলিশের কাছে নিশ্চিত কোনো তথ্য নেই।
অভিযানে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে থাকা স্থানীয় বাসিন্দা মাঈন উদ্দিন ভুট্টা জানান, পাহাড়ের বিভিন্ন স্থানে খোঁজাখুঁজি করে মরদেহের সন্ধান মেলেনি। সেখানে রান্না করাv দু-একটি পাতিল ও বিছানার মতো কিছু জিনিস পাওয়া গেছে। তার ধারণা, পাহাড়ের অনেক এলাকা অত্যন্ত দুর্গম হওয়ায় তল্লাশিতে সেসব জায়গা বাদ পড়ে থাকতে পারে। আবার অভিযানের আগেই পাচারকারীরা মরদেহ সরিয়ে ফেলেছে কি না, সেই সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
এর আগে গত বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) একই পাহাড়ি এলাকায় মানবপাচারকারী চক্রের গোপন বন্দিশালায় অভিযান চালায় যৌথ বাহিনী। ওই অভিযানে ৫৭ জনকে উদ্ধারের কথা জানানো হয়। পাশাপাশি চক্রের ৬ সদস্যকে আটক করা হয়। অভিযান চলাকালে সশস্ত্র পাচারকারীদের সঙ্গে যৌথ বাহিনীর সদস্যদের গোলাগুলি হয়। এতে সেনাবাহিনীর সৈনিক মোহাম্মদ তিতাস শেখ (২৭) গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হন। শুক্রবার সন্ধ্যায় সেনাবাহিনীর আনুষ্ঠানিকতা শেষে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় ফরিদপুরের নগরকান্দায় নিজ গ্রামে তাকে দাফন করা হয়।
এ ছাড়া শুক্রবার টেকনাফ মডেল থানা প্রাঙ্গণে উদ্ধার হওয়া ব্যক্তিদের পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়। তাদের মধ্যে ৫১ জন বাংলাদেশি ও ৬ জন রোহিঙ্গা ছিলেন।
বৃহস্পতিবারের অভিযানের পর ওই পাহাড়ে ৩টি মরদেহ পড়ে থাকার খবর বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়। উদ্ধার হওয়া ব্যক্তি শহিদুল ইসলাম সাংবাদিকদের জানান, বন্দিশালার আশপাশে তিনি ৩টি মরদেহ পড়ে থাকতে দেখেছেন। দুই পক্ষের মধ্যে গোলাগুলির ঘটনায় কয়েকজন নিহত হয়েছেন বলেও শুনেছেন। তবে মরদেহগুলো মানবপাচারকারী চক্রের সদস্যদের, নাকি বন্দিদশা থেকে পালিয়ে যাওয়া ব্যক্তিদের, তা নিশ্চিত করতে পারেননি তিনি।
মরদেহের সন্ধান না পাওয়ায় স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যেও নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। লেদার বাসিন্দা মো. আব্দুল হামিদ বলেন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী পৌঁছানোর আগেই মরদেহ সরিয়ে ফেলা হয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। স্থানীয়দের পাশাপাশি উদ্ধার হওয়া ব্যক্তিরাও মরদেহ পড়ে থাকার কথা জানিয়েছেন। সেগুলো কোথায় গেল, তা তদন্তের দাবি জানান তিনি।
চাকরির প্রলোভনে পাহাড়ে বন্দিদশা
উদ্ধার হওয়া ব্যক্তিদের বক্তব্যে মানবপাচারকারী চক্রের প্রতারণা, নির্যাতন ও বন্দিদশার চিত্র উঠে এসেছে। ভুক্তভোগী আসাদুজ্জামান জানান, চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে তাকে কক্সবাজারে ডেকে নেওয়া হয়। পরে পাহাড়ের একটি গোপন আস্তানায় আটকে রাখা হয়। সেখানে ৮ দিন বন্দি ছিলেন তিনি। ২ বার পালানোর চেষ্টা করেও সফল হননি।
আসাদুজ্জামান বলেন, বন্দিশালায় ৫০ জনের বেশি মানুষ ছিলেন। তাদের সাগরপথে পাচারের প্রস্তুতি চলছিল। পাহাড়ে সশস্ত্র লোকজন আস্তানাটি পাহারা দিতেন। বন্দিদের মোবাইল ফোন ও ব্যক্তিগত জিনিসপত্র কেড়ে নেওয়া হয়েছিল।
কক্সবাজারের পুলিশ সুপার এ এন এম সাজেদুর রহমান জানান, মানবপাচারকারী চক্রের তৎপরতা নির্মূল না করা পর্যন্ত যৌথ অভিযান অব্যাহত থাকবে।
তথ্য: Dhaka Post
ছবিঃ
সংগৃহিত।