♦অরুনাভ সেন (কোলকাতা):
ক্ষুদিরাম বসুর ফাঁসির দিন জেলে উপস্থিত থাকার অনুমতি পেয়েছিলেন আইনজীবী উপেন্দ্রনাথ সেন এবং ক্ষেত্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়। মজ:ফরপুর থেকে প্রকাশিত বেঙ্গলী পত্রিকার সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন উপেন্দ্রনাথ সেন।তিনি লিখেছেন — “ বাঙালী হইয়া এই প্রথম দেখিলাম বাঙালী বীরের প্রকৃত মূর্তি৷ প্রফুল্ল চলিয়া গেল এখন ক্ষুদিরামের বিচার হবে..”
দায়রা আদালতে আইনজীবী উপেন্দ্রনাথ সেন
সদ্য শহীদ প্রফুল্ল চাকীর পুলিশের তোলা চিত্র দেখেছেন,কপালের ঊর্ধ্বদিকে একটি ও বাঁ দিকের বুকের ওপর দিকে একটি গুলি প্রবেশের চিহ্ন পরিষ্কার দেখা যাচ্ছিল। তিনি লিখেছেন -এখনও বুঝিয়া উঠিতে পারি নাই যে, কি অমিত বীর্য আর মনের বল থাকিলে মানুষ নিজের শরীরে দুইবার গুলি লাগাইতে পারে৷ কি প্রশস্ত নিটোল ললাট ছিল প্রফুল্লর৷ আর বক্ষদেশ কি উন্নত ও বিস্তৃত৷ বাঙালী হইয়া এই প্রথম দেখিলাম বাঙালী বীরের প্রকৃত মূর্তি৷ প্রফুল্ল চলিয়া গেল এখন ক্ষুদিরামের বিচার হবে,তাহার আয়োজন হইতে লাগিল,আমরাও তাহার পক্ষ সমর্থনের জন্য প্রস্তুত হইতে লাগিলাম৷ এই কার্যে উৎসাহ ও সাহস লইয়া আসিলেন কালিদাস বসু উকিল মহাশয়৷
নিজের বর্ণনায় শহীদ ক্ষুদিরাম বসু যার নাম বলেছিলেন দীনেশ আসলে তিনি প্রফুল্ল চাকী। পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগের সাব ইন্সপেক্টর নন্দলাল ব্যানার্জী ছুটিতে থাকা সত্বেও মোকামাঘাটে তাঁকে গ্রেফতার করার সময়ে তিনি আত্মহত্যা করে শহীদ হয়েছিলেন এটা প্রচলিত মত, অথবা ব্রিটিশ পুলিশের তত্ত্ব এটি। রোমহর্ষক সেই বীরগাথা শহীদ ক্ষুদিরাম বসুর আইনজীবী উপেন্দ্রনাথ সেন ‘ক্ষুদিরামের ফাঁসি: এক প্রত্যক্ষদর্শীর বিবরণ’ শীর্ষক নিবন্ধে লিপিবদ্ধ করেছিলেন সম্ভবত ১৯৪৭সালে। তাঁর বিবরণ অনুয়ায়ী সমস্তিপুর মজঃফরপুর থেকে বত্রিশ মাইল দূরে অবস্থিত। একটি রেলের কর্মচারীর বাড়ী ছিল শহরের পশ্চিমপ্রান্তের মাঠের দিকে। ক্ষুদিরাম আইনজীবীদের বলেছিলেন তারা বোমা নিক্ষেপ করে রেলের রাস্তা ধরে চলতে থাকেন সমস্তিপুরের দিকে। সকালবেলা পুশা স্টেশনের কাছে নির্জন আমবাগানে লুকিয়ে থাকলেন। এদিকে রাত্রিতে পুলিশের লোক সব স্টেশনে পৌঁছে গিয়েছিল,এবং তারা সাধারণ পোশাকে ছিল। ক্ষুধায় কাতর প্রফুল্ল ক্ষুদিরাম কে পাঠিয়েছিলেন স্টেশন সংলগ্ন একটা দোকান থেকে কিছু মুড়ি কিনে আনার জন্য। ক্ষুদিরাম বসু হিন্দি জানতেন না,মুদির দোকানে গিয়ে বললেন মুড়ি দেন।গোয়েন্দা পুলিশ বুঝতে পেরেছিল এবং তাকে গ্রেফতার করে। পুলিশের হাতে ধরা পড়ে গিয়েছেন বুঝে সে চিৎকার করে উঠেছিল।
ওদিকে প্রফুল্ল সমস্তিপুরের দিকে হাঁটছেন,দুপুর বেলা। এক বাঙালি কর্মচারী দেখলেন মাঠের মধ্য দিয়ে একটি ছেলে আসছে মাথার চুল উস্কোখুস্ক। বাঙালি বাবুটি বুঝলেন ছাত্রটি নিশ্চিত পলাতক বিপ্লবী,তিনি যত্ন করে গোপনে প্রফুল্লকে নিজের বাড়িতে আনলেন,তাঁর স্নান ও আহারের ব্যবস্থা করলেন। বাজার থেকে নতুন ধুতি,জুতো কিনে দিলেন,এরপর রাত্রের ট্রেনে কলকাতার টিকিট কিনে নিজে গিয়ে ইন্টারক্লাসে তুলে দিয়ে এলেন। রেলের ওই কামরায় ছিল দারোগা নন্দনাল আর মজঃফরপুরের দুই বাঙালি যুবক। অল্প সময় পরে প্রফুল্ল আর বিশ্বাসঘাতক নন্দলালে বেশ ভাব জমে উঠেছিল।
নন্দলাল প্রফুল্ল চাকীর সরলতার সুযোগ নিয়ে অনেক কথাই বার করে নিয়েছিলেন কিন্তু প্রফুল্ল চাকী নিজের আসল নামটা না বলে দীনেশ রায় নামে নিজের পরিচয় দিয়েছিলেন |
সকালবেলা জাহাজে গঙ্গা পার হতে হবে,অত সকালে কুলি পাওয়া যায় না,উদ্বিগ্ন নন্দলাল কে সান্ত্বনা দিয়ে প্রফুল্ল নিজেই তাঁর বাক্স বিছানা বয়ে আনলেন। নদীর অন্য পারে এসে তারা কলকাতাগামী ট্রেনের জন্য অপেক্ষা করছিল,হঠাৎ কিছুক্ষনের জন্য নন্দলাল হাওয়া হয়ে যায়,তারপর কিছু সময় পরে পাঁচ কনস্টেবল কে সঙ্গে নিয়ে প্রফুল্ল কে বললেন ‘আমি তোমাকে গ্রেফতার করিতেছি’৷
ক্রুদ্ধ সিংহের মত গর্জন করে প্রফুল্ল চাকী বললেন-‘তুমি বাঙালি হয়ে গ্রেফতার করতে চাও আমাকে? আচ্ছা তবে এই নাও দণ্ড। বলেই প্রফুল্ল চাকীর পিস্তল গর্জে উঠল। নন্দর অবশ্য আরও কয়েক মাস আয়ু ছিল,মাথা নীচু করে সেই যাত্রায় রক্ষা পায়। তখন পুলিশ তাকে ঘিরে ফেলেছে,প্রফুল্ল বুঝলেন পুলিশের হাতে ধরা দেওয়ার থেকে শহীদের মত আত্মবলিদান অনেক সম্মানের। নিজের কপাল ও বুকে গুলি চালিয়ে প্ল্যাটফর্মে পড়ে গেলেন। বাংলার এই বীর পুণ্যতোয়া গঙ্গার তীরে দেশের জন্য নিজের জীবন উৎসর্গ করলেন।
সত্যি কী প্রফুল্ল চাকী আত্মহত্যা করেছিলেন? নাকি তাকে খুন করেছিল ব্রিটিশের পুলিশ?
ব্রিটিশ পুলিশের বয়ানে লেখা হয়েছে, প্রফুল্ল নিজের দিকে বন্দুক তাক করে আত্মহত্যা করেছিলেন। কিন্তু পুলিশ রেকর্ডে রাখা তাঁর মৃতদেহের ছবি অন্য কথা বলে। অনেক গবেষক কিন্তু বলছেন সন্দেহ আছে, তিনি আত্মহত্যা করেছিলেন নাকি তাকে পুলিশ খুন করেছে? কোন বিষয়টি সঠিক, প্রফুল্ল চাকীর আত্মহত্যার তত্ত্বে অনেক অসঙ্গতি আছে, প্রচলিত এই ‘অতিসরল’ ভাবে আত্মহত্যার তথ্য মেনে নিতে প্রবল আপত্তি রয়েছে গবেষক,লেখক,ও ফরেনসিক বিশেষজ্ঞদের,বরং প্রফুল্ল চাকীকে পুলিশ দ্বারা হত্যার লক্ষণগুলি অনেক বেশি প্রকট। ক্ষুদিরামের ধরা পড়া থেকে প্রফুল্লর শহীদ হওয়া,বিভিন্ন লেখক ও সমসাময়িক পত্রিকার প্রতিবেদনে আছে বিস্তর অসঙ্গতি, বিস্ময়কর ভাবে নিজের তথ্যকে নির্ভরযোগ্য বলে দাবি করতে কেউ কুণ্ঠাবোধ করেন নি৷
আর হ্যাঁ বিশ্বাসঘাতকতার শাস্তি দারোগা নন্দলাল ব্যানার্জী পেয়েছিলেন ১৯০৮ সালের ৯ নভেম্বর। তাকে গুলি করে হত্যা করে প্রতিশোধ নিয়েছিলেন বিপ্লবীরা।
উপেন্দ্রনাথ সেন লিখেছেন — “ তখনও জানিতাম না যে দেশে স্বাধীনতা এত শীঘ্র আসবে আর নির্ভয়ে কাহিনি বলতে পারব। যদি জানতাম তাহা হইলে এই লেখাটি পূর্বেই লিখিয়া কালিদাসবাবুকে দেখাইয়া আরও প্রয়োজনীয় তথ্যসহ বাহির করিতে পারিতাম।
আজ শহীদ প্রফুল্ল চাকীর আরও একটি আত্মবলিদান দিবসে তাঁকে জানাই আমাদের বিনম্র শ্রদ্ধাঞ্জলি…🌷
কলমে – ✒️ অরুণাভ সেন
তথ্যসূত্রঃ অগ্নিযুগের বিপ্লবীদের সাংকেতিক ভাষা ও আইনজীবীরা (তুহিন শুভ্র ভট্টাচার্য)
ছবি: ইন্টারনেট থেকে।
বামে ক্ষুদিরাম বসু ডানে প্রফুল্ল চাকী।