এইচ,কবির টিটু:
পি. সি. সরকার ১৯১৩ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি তৎকালীন ব্রিটিশ ভারতের তৎকালীন ময়মনসিংহ জেলার টাঙ্গাইল মহকুমার (বর্তমান জেলা)আশিকপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন।
তার পিতা ভগবানচন্দ্র সরকার এবং মাতা কুসুম কামিনী দাস। পরিবারে জাদুশিল্পের একটি ঐতিহ্য ছিল, যা ছোটবেলা থেকেই তাকে এই শিল্পের প্রতি আকৃষ্ট করে তোলে।
তিনি ছিলেন দুই ভাইয়ের মধ্যে জ্যেষ্ঠ; তার ছোট ভাই অতুল চন্দ্র সরকার (এ. সি. সরকার)।
শিক্ষাজীবন শুরু হয় স্থানীয় শিবনাথ হাইস্কুলে। পড়াশোনার পাশাপাশি জাদুবিদ্যার প্রতি গভীর অনুরাগ গড়ে ওঠে।
মাত্র ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়াকালীনই তিনি জাদু প্রদর্শন শুরু করেন।
তবে এই আগ্রহ তার শিক্ষাজীবনে কোনো বাধা সৃষ্টি করেনি।
১৯২৯ সালে প্রবেশিকা (ম্যাট্রিক) পাস
১৯৩৩ সালে গণিতে অনার্সসহ বিএ ডিগ্রি অর্জন
এরপর তিনি জাদুকেই পেশা হিসেবে গ্রহণ করেন।
জাদুশিল্পে উত্থান:
পি. সি. সরকারের জাদুশিল্পের গুরু ছিলেন খ্যাতিমান জাদুকর Ganapati Chakraborty।
গুরুর কাছ থেকে শিক্ষা নিয়ে তিনি দ্রুত নিজস্ব স্টাইল গড়ে তোলেন এবং এক সময় হয়ে ওঠেন বিশ্বখ্যাত জাদুকর।
তার জাদুর বৈশিষ্ট্য ছিল—
নাটকীয়তা
বৈজ্ঞানিক কৌশল
দর্শকদের মনস্তত্ত্বের সূক্ষ্ম ব্যবহার
পি. সি. সরকার শুধু উপমহাদেশেই নয়, সারা বিশ্বে জাদুর মাধ্যমে সাড়া জাগিয়েছিলেন। তিনি প্রায় ৭০টিরও বেশি দেশে জাদু প্রদর্শন করেন।
তার বিখ্যাত জাদুগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য—
মানুষকে দ্বিখণ্ডিত করা (Sawing a Woman in Half)
পানির ওপর হাঁটা
বাতাসে ভেসে থাকা
“Water of India”
“X-Ray Eyes” (Force Writing)
একবার তার দ্বিখণ্ডিত করার খেলা দেখে এত মানুষ বিস্মিত হয় যে, দর্শকদের উদ্বেগে BBC অফিসে বিপুল ফোনকল আসে এবং দীর্ঘ সময় লাইন ব্যস্ত থাকে।
যুক্তরাষ্ট্রের টেলিভিশন নেটওয়ার্কগুলো তাকে বিশেষ আমন্ত্রণে নিয়ে যায়, যেখানে তিনি অভূতপূর্ব জনপ্রিয়তা অর্জন করেন। তার জাদু প্রদর্শিত হয় NBC, CBS এবং অন্যান্য আন্তর্জাতিক মাধ্যমে।
একটি রোমাঞ্চকর প্রদর্শনীতে তিনি দ্রুতগামী ট্রেন আসার মাত্র ৩৮ সেকেন্ড আগে হাতকড়া থেকে নিজেকে মুক্ত করেন—যে হাতকড়া খুলতে সাধারণত ১৭টি চাবি প্রয়োজন হতো।
এই ধরনের দুঃসাহসিক প্রদর্শনী তাকে কিংবদন্তির আসনে পৌঁছে দেয়।
তিনি নিজেকে আখ্যায়িত করেছিলেন—
“World’s Greatest Magician” (বিশ্বের সর্বশ্রেষ্ঠ জাদুকর)
পি. সি. সরকারের অসামান্য অবদানের জন্য তিনি বহু আন্তর্জাতিক সম্মাননা লাভ করেন—
পদ্মশ্রী — ভারত সরকার (১৯৬৪)
“Sphinx” (জাদুর অস্কার) — যুক্তরাষ্ট্র (১৯৪৬ ও ১৯৫৪)
জার্মান ম্যাজিক সার্কেলের রাজকীয় পদক
তার সম্মানে কলকাতায় একটি প্রধান সড়কের নামকরণ করা হয় “পি. সি. সরকার সরণি”।
১৯৭০ সালের ১৩ জানুয়ারি জাপানের জিগেৎসু শহরে জাদু প্রদর্শনের সময় হঠাৎ অসুস্থ হয়ে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। মৃত্যুর মুহূর্তেও তিনি ছিলেন মঞ্চে—একজন প্রকৃত শিল্পীর মতো।
পি. সি. সরকার জাদুশিল্পকে শুধু বিনোদনের পর্যায়ে রাখেননি, বরং এটিকে শিল্প ও বিজ্ঞানের সম্মিলিত রূপে বিশ্বদরবারে প্রতিষ্ঠা করেন।
তিনি বাংলা ও বাঙালির পরিচয়কে বিশ্বমঞ্চে গৌরবের সাথে তুলে ধরেছিলেন।
তার উত্তরসূরিরা—বিশেষ করে তার পুত্র P. C. Sorcar Jr.—এই ঐতিহ্যকে আজও বহন করে চলেছেন।
যাদুসম্রাট পি. সি. সরকার ছিলেন এক অনন্য প্রতিভা, যার হাতের কারসাজিতে বাস্তবতা ও অলৌকিকতার সীমারেখা মুছে যেত।
তার জীবন প্রমাণ করে—প্রতিভা, সাধনা এবং সাহস থাকলে একজন শিল্পী তার দেশকে বিশ্বের দরবারে মর্যাদার আসনে প্রতিষ্ঠিত করতে পারেন।
ছবি ও তথ্য সূত্র:
এইচ কবির টিটু (যিনি দৈনিক জনতার দেশ এর একজন সম্মানিত প্রতিবেদক)।