হাবিব রহমানঃ
হাজার কোটির প্রাসাদ, ঝলমলে আলো, বিদেশের ব্যাংকে ছড়িয়ে থাকা অগণিত অঙ্ক—সবকিছুই শেষ পর্যন্ত এসে থামে এক নির্লিপ্ত সত্যের সামনে। সেই সত্যের নাম মৃত্যু। সেখানে না আছে ক্ষমতার দম্ভ, না আছে টাকার গর্ব, না আছে প্রভাবের ছায়া। থাকে শুধু একটি সাদা কাফন, আর নীরব এক হিসাব।
শিকদার গ্রুপের মালিক রন হক সিকদার সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাই’তে একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ৪ মে সোমবার মারা গেছেন। তিনি লিভার জটিলতায় ভুগছিলেন। ন্যাশনাল ব্যাংক লিমিটেডের সাবেক এই পরিচালক ও তার ভাই রিক হক সিকদারের বিরুদ্ধে দুর্নীতি প্রতিরোধ আইন ও মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইনে বেশ কয়েকটি মামলা চলমান রয়েছে। গ্রেফতার এড়াতে তিনি থাইল্যান্ড ও সংযুক্ত আরব আমিরাতে দীর্ঘদিন ধরে বসবাস করছিলেন।
৬৮১ কোটির ব্যক্তিগত ঋণ, একটি পয়সাও ব্যাংকে ফেরেনি। সিকদার গ্রুপেরই মোট খেলাপি ৬ হাজার ৩৮০ কোটি। ন্যাশনাল ব্যাংক আগেই তছনছ। এই ছিল রেখে যাওয়া উত্তরাধিকার।
সিঙ্গাপুর, সুইজারল্যান্ড, লন্ডন, আমেরিকায় ছড়িয়ে থাকা হাজার কোটির ব্যালেন্স কোনো কাজে আসছে না। আজ তিনি মাটির নিচে যাচ্ছেন শুধু হাজার টাকার কাফন পরে।
যে ব্যাংকগুলোকে এক সময় নিজের ব্যক্তিগত সিন্দুক মনে করা হয়েছিল, সেই সিন্দুক আজ পূর্ণ থাকলেও মালিক কিন্তু আজ রিক্ত। ৬ হাজার ৩৮০ কোটি টাকার দায় মাথায় নিয়ে যখন কেউ মাটির নিচে যায়, তখন সেই টাকার স্তূপ কবরের অন্ধকারকে আলেকিত করতে পারেনা।
একটা জীবন, যা কোটি কোটি টাকার মালিক ছিল—শেষে গিয়ে দাঁড়াল একটি কাফনের দামে। যে অর্থের ওপর দাঁড়িয়ে তৈরি হয়েছিল প্রভাবের দুর্গ, তা এক মুহূর্তের জন্যও মৃত্যুকে বিলম্বিত করতে পারল না। যে সম্পদের পাহাড় গড়ে উঠেছিল, তা একফোঁটা প্রশান্তি কিনে দিতে পারল না শেষ যাত্রার আগে।
এটাই কি সবচেয়ে বড় শিক্ষা নয়?
আমাদের মনে আছে ২০২০ সালে করোনাকালের পলায়নের সেই রাতের কথা।চারদিকে অক্সিজেনের জন্য হাহাকার, অথচ রন হকরা দুই ভাই ক্ষমতার জোরে রানওয়ে দিয়ে পাড়ি দিলেন সুদূরে। মানুষ হয়তো সাময়িকভাবে বিচার করতে পারেনি, কিন্তু সময় ঠিকই বিচার তুলে রেখেছে। আজ দুবাইয়ের সেই বিলাসবহুল হাসপাতালের দেয়ালগুলোও হয়তো সাক্ষী দিচ্ছে— জীবনের শেষ নিশ্বাসটি কোনো ব্যাংক ব্যালেন্স দিয়ে কেনা যায় না।
রন হক ভেবেছিলেন তিনি পালিয়ে গেছেন। গেছেনও তো — পুলিশের হাত থেকে, আদালতের হাত থেকে, সাংবাদিকের প্রশ্নের হাত থেকে। কিন্তু একটি হাত থেকে পালানো গেল না।
সময়ের হাত।
মৃত্যু কোনো দার্শনিক তত্ত্ব না। এটা হিসাবের টেবিল।
সেই টেবিলে সিঙ্গাপুরের ব্যাংক স্টেটমেন্ট জমা দেওয়া যায় না। লন্ডনের ফ্ল্যাটের দলিল কোনো কাজে আসে না। ক্ষমতাবান মানুষের ফোন নম্বর সেখানে অচল।
রন হক সিকদারের গল্প তাই শুধু একজন মানুষের পতনের গল্প না।এটা আমাদের সকলের জন্য একটা আয়না।সেই আয়নায় নিজেকে দেখতে সাহস লাগে।
মানুষকে মনে রাখা হয় তার ব্যাংক ব্যালেন্স দিয়ে নয়—তার কাজ দিয়ে, তার সততা দিয়ে, তার মানবিকতা দিয়ে।
হাজার কোটি টাকার মালিক হওয়া সহজ হতে পারে, কিন্তু একজন সৎ মানুষ হয়ে ওঠা—সেটাই আসল অর্জন।
কারণ, পৃথিবীর সব হিসাব একদিন মিটে যায়। কিন্তু নৈতিকতার হিসাব—সেটা কখনো মুছে যায় না।
মৃত্যু এক পরম সত্য, যা কোনো পাসপোর্ট চেনে না, কোনো ভিআইপি লাউঞ্জ চেনে না।রন হক সিকদারদের মতো মানুষদের জীবনকাহিনী আমাদের বারবার মনে করিয়ে দেয় যে, পৃথিবীর হিসেবে আমরা হয়তো অনেক কিছু ফাঁকি দিতে পারি, কিন্তু প্রকৃতির হিসেবে ফাঁকি দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই।