বিশেষ প্রতিনিধি ( দৈনিক জনতার দেশ)
নরসিংদীর শিবপুর উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান হারুনুর রশীদ খান হত্যা মামলায় সংঘটিত হয় ৪ কোটি টাকার বিনিময়ে। হ*ত্যার আগে প্রধান ঘাতকের হাতে যায় প্রায় ৮৭ লাখ টাকা। তারপর দফায় দফায় আরো ২৫ লাখ টাকা যায় ঘাতকদের হাতে। বাকী টাকা আর পৌঁছেনি ঘাতকদের হাতে। বাকী টাকা না পেয়ে হত্যার প্রধান পরিকল্পনাকারী বিপদে পড়ে যায়। হত্যার মিশনে যারা অংশগ্রহণ করেছিল তাদের অনেকেই কোন টাকা পায়নি। এমনকি যিনি প্রথম গু*লি করেছেন তিনিও কোন টাকা পয়সা পাননি। তাকে অবশ্য মামলায় আসামি করা হয়নি।
পরে পুলিশ তাকে গ্রেফতার করে। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে বেডে শুয়ে তার ছবি দেখে তাকে শনাক্ত করেন নিহত চেয়ারম্যান হারুনুর রশীদ খান । ওই ঘাতকের নাম মোবারক হোসেন। ০৫ আগস্টের পর সে পুলিশের হাতে ধরা পড়ে। ধরা পড়ার পর পুলিশের কাছে চাঞ্চল্যকর তথ্য দেয়। অকপটে তা স্বীকার করে। তবে এনসিপির এক নেতার কারণে তাকে আদালতে তুলে ও ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি করানো যায়নি। এরপর সে দ্রুত কারাগার থেকে জামিনে বের হয়ে যায়।
এদিকে সম্প্রতি ইন্টারপোলের মাধ্যমে এ মামলার অন্যতম প্রধান আসামি মহসিন মিয়াকে গ্রে*ফতার এরপর মহসিনও স্বীকার করে সুট্যার মোবারক-ই চেয়ারম্যানকে গু*লি করে। এখন আবার পুলিশ হন্য হয়ে খুঁজছে তাকে ধরার জন্য।
এদিকে মহসিনকে দেশে আনার পর এ হ*ত্যা*কাণ্ড সম্পর্কে চাঞ্চল্যকর তথ্য পাওয়া গেছে বলে জানিয়েছে পুলিশ। এ মামলায় সাবেক এক শিল্পপতি ও সংসদ সদস্য এবং আরেক সাবেক সংসদ সদস্যের ভাই এ মামলায় ফেঁসে যেতে পারেন। শিল্পপতি রাজনীতিক ঝামেলা মুক্ত থাকার জন্যই ৪ কোটি টাকায় খুনিদের ভাড়া করেন। কিন্তু চুক্তির পুরো টাকা যায়নি খুনিদের হাতে। চুক্তির টাকা না পাওয়ায় ক্ষুব্ধ খুনিরা। চেয়ারম্যানকে হ*ত্যার প্রধান সমন্বয়ক আরিফুল ইসলাম সরকারের সাথে টাকা লেনদেন হয় শিল্পপতির। তবে গু*লি করার পর সাথে সাথে মরে না যাওয়ায় আরিফ খুনি*দের সাথে প্রচণ্ড দুর্ব্যবহার করে। কন্টাক্ট কিলাররা টাকা না পেয়ে দেশে বিদেশে কেউ কেউ মানবেতর জীবন যাপন করেছেন। এর মধ্যে গ্রেফতার হওয়া মহসিনও দুবাইয়ে অনেক কষ্ট করেছে। তিন বেলার মধ্যে এক বেলাও ভালো করে খেতে পারেনি বলে জানা গেছে। সে নবায়ন করতে পারেনি তার পাসপোর্ট।
তবে পুলিশ স্পষ্ট করে সব কিছু না বললেও ধারণা করা হচ্ছে এ মামলার পুরো ঘটনাই এখন পুলিশের হাতে। পুলিশ এখন বড় ধরনের অপারেশনে নামতে পারে। তবে খু*নিদের সাথে সরাসরি যিনি লেনদেন করেছেন এদের একজন জেলে অপর আরেকজন দেশের বাইরে রয়েছেন। এছাড়া যার সাথে টাকা লেনদেন হয় সেই আরিফ সরকারও দেশের বাইরে। সুতরাং এদিক দিয়ে পুলিশ একটু বেকায়দায় পড়ে আছে।
পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন-পিবিআই নরসিংদীর এক কর্মকর্তা নাম না প্রকাশের শর্তে জানান, আমরা এখন আসল খেলোয়াড়দের ধরার প্রচেষ্টায় আছি। কেন এবং কীভাবে এ হত্যাকাণ্ড ঘটেছে ইতোমধ্যে আমরা সবই জানতে পেরেছে।
২০২৩ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি নরসিংদীর শিবপুরে উপজেলা চেয়ারম্যান হারুনুর রশিদ খানকে নিজ বাসায় ঢুকে গু*লি করে পালিয়ে যায় হামলাকারীরা। গুরুতর আহত অবস্থায় হারুনুর রশিদ খানকে রাজধানীর একটি হাসপাতালে ভর্তি করা হয় । ৯৪ দিন মৃ*ত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়ে ৩১ মে মারা যান বর্ষিয়ান রাজনীতিবিদ হারুনুর রশিদ খান। মৃ*ত্যুর আগেই পরিবারের পক্ষ থেকে মামলা করা হয়।
২০২৩ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি সকালে গু*লিবিদ্ধ চেয়ারম্যানের ছেলে আমিনুর রশিদ খাঁন তাপস বাদী হয়ে শিবপুর মডেল থানায় মামলা দায়ের করেন।
মামলার আসামিরা হলেন: উপজেলার পুটিয়া কামারগাঁও গ্রামের আরিফ সরকার (৪০), পূর্ব সৈয়দপুর গ্রামের মহসিন মিয়া (৪২), পুটিয়া কামারগাঁও গ্রামের ইরান মোল্লা (৩০), মুনসেফেরচর গ্রামের শাকিল (৩৫), কামারগাঁও গ্রামের হুমায়ূন (৩২) ও ও নরসিংদী সদর উপজেলার ভেলানগরের ড্রাইভার নূর মোহাম্মদ (৪৮)।
মামলায় বলা হয়, আসামিরা ২০২৩ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি সকালে উপজেলা চেয়ারম্যান হারুনুর রশিদ খাঁনকে দরজা খুলতে বলেন। পরে তারা চেয়ারম্যানের বাসায় ঢোকেন। এ সময় চেয়ারম্যান তাদের বসতে বলে আপ্যায়নের জন্য বাসার ফ্রিজের দিকে ঘুরলে পেছন থেকে ১ নম্বর আসামি আরিফের নির্দেশে ২ নম্বর আসামি মহসিন মিয়া তার পিঠে প্রথম গু*লি করেন। এরপর ৩ নম্বর আসামি ইরান একটি ও ৪ নম্বর আসামি শাকিল আরও একটি গু*লি করেন। বাদীর তথ্য মতে, এখানে তিনটি অ*স্ত্র ব্যবহার করা হয়েছে। হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, হারুনুর রশীদের শরীর থেকে দুটি বুলেট বের করা হয়েছিল।
সম্প্রতি এ মামলার অন্যতম আসামি মহসিন মিয়াকে দেশে নিয়ে আসা হয়। ২১ জুলাই নরসিংদীর আদালতে তিনি ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন। এ নিয়ে আলোচিত উপজেলা চেয়ারম্যান হত্যা মামলায় ১৭ আসামিকে গ্রেফতার করা হয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
নিহতের ভাতিজা ফজলে রাব্বি খান বলেন, আমার বাবা শিবপুরের সাবেক সংসদ সদস্য রবিউল আউয়াল খানকেও দুর্বৃ*ত্তরা ১৯৮৬ সালের ২৮ এপ্রিল দলীয় সমাবেশ করে ফেরার পথে গু*লি করে হত্যা করে।’ হারুনুর রশিদ খানকে হ*ত্যার উদ্দেশ্যে যাঁরা গু*লি করেছেন এর মধ্যে শিবপুরের কামারগাঁও এলাকার আরিফ সরকারের নির্দেশে, আসামিরা হারুনুর রশিদ খানের মুঠোফোনে কল করে মসজিদের জন্য অনুদান দিতে বাসায় আসেন। মহসিন মিয়া, ইরান মোল্লা ও শাকিল নামের তিনজন ঘটনার দিন সকাল সোয়া ছয়টার দিকে পাঁচতলা বাড়িটির তৃতীয় তলায় গিয়ে কল বেল চাপলে হারুনুর রশিদ খান নিজেই দরজা খুলে দেন। তাঁদের বসতে বলে আপ্যায়নের জন্য পেয়ারা নিয়ে আসেন তিনি। ঠিক তখনই ওই পিস্তল বের করে দুটি গুলি করেন। এতে পিঠে গু*লিবি*দ্ধ হয়ে হারুনুর রশিদ মেঝেতে লুটিয়ে পড়েন। এরপর তাঁরা সিঁড়ি বেয়ে নেমে মোটরসাইকেলে করে থানা-সংলগ্ন সড়ক ধরে পালিয়ে যান।
তিনি আরও বলেন, হ*ত্যাকা*ণ্ডটি ছিল অত্যন্ত পরিকল্পনা মাফিক। হ*ত্যার আগে তারা কয়েকবার রেকি করেছেন। ঢাকায় বসে একাধিক সভা করেছেন। ৪ কোটি টাকার মৌখিত চুক্তি করেছেন। যারা নির্দোষ ছিল সেই অর্থ যোগানদাতা শিবপুরের সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান আরিফুল ইসলাম মৃধা ও নরসিংদী সদর উপজেলার সাবেক চেয়ারম্যান ও জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মনজুর এলাহীকে মামলায় আসামি করার জন্য বার বার আমাদের চাপ দিয়েছেন। কিন্তু আমরা তাঁর কথা শু*নিনি। তখন ভাবতেও পারিনি তিনি আমার চাচাকে হ*ত্যা করার জন্য অর্থ খরচ করেছেন। তবে এখন সব কিছু দিনের আলোর মত পরিষ্কার। আমরা চাই যারা এই হ*ত্যাকা*ণ্ডের সাথে বিভিন্নভাবে জড়িত তাদের যেন কঠিন বিচার হয়।
তথ্য সূত্র:দৈনিক নিখাঁদ খবর।
ছবি: দৈনিক জনতার দেশ আর্কাইভ।