♦বিশেষ প্রতিবেদক|জনতারদেশ :
রক্ষী বাহিনীর কারাবন্দী জেনারেল
মাসুদ চৌধুরীর ফোন কল ফরেনসিক টেস্ট করে মরহুম প্রেসিডেন্ট জিয়া হত্যার সবচেয়ে বেশী ভয়ংকর ভূমিকা পালনকারী এই পলাতক মেজরকে গ্রেফতার করা হয়।
ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা RAW এর দেয়া ভারতীয় পাসপোর্টে তাদের দেয়া ডলার নিয়ে সারা পৃথিবী ভ্রমণ করে এবং বাংলাদেশে অবস্থান করে। তার কাজ ছিলো ঢাকার RAW এর VIP এজেন্টদের সাথে যোগাযোগ এবং দেশপ্রেমিক শক্তির বিরূদ্ধে ষড়যন্ত্র করা।
দীর্ঘ ৪৫ বছর পর শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান হত্যা মামলার অন্যতম আসামি মেজর মোজাফফর হোসেন গ্রেপ্তার হয়েছেন। বর্তমানে তিনি চট্টগ্রাম সেনানিবাসে ক্লোজ অ্যারেস্টে রয়েছেন। জানা গেছে, তার বিরুদ্ধে সামরিক আদালতে মামলা দায়ের করে বিচার কার্যক্রম পরিচালনা করা হবে।
এ বিষয়ে অভিজ্ঞ কয়েকজন বিশ্লেষকের মতে, শুধু বিচারিক প্রক্রিয়াই নয়, বরং একটি জাতীয় তদন্ত কমিশন গঠন করে এই হত্যাকাণ্ডের পূর্ণাঙ্গ পটভূমি, পরিকল্পনা, সহযোগী ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা, দেশীয় ও আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপট এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনা প্রতিরোধে করণীয় সম্পর্কে একটি প্রামাণ্য প্রতিবেদন প্রকাশ করা সময়ের দাবি।
পূর্ববর্তী তদন্ত ও অভিযোগপত্র অনুযায়ী, মেজর মোজাফফর হোসেন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান হত্যা মামলার অন্যতম প্রধান পরিকল্পনাকারী ও বাস্তবায়নকারীদের একজন। ১৯৮১ সালের ৩০ মে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে তিনিই প্রথম রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানকে শনাক্ত করেন এবং গুলি করে হত্যা নিশ্চিত করেন। হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হওয়ার পর তিনি তৎকালীন চট্টগ্রাম ডিভিশনের জিওসি মেজর জেনারেল আবুল মঞ্জুরকে টেলিফোনে জানান—“The President has been killed.”
ঘটনার পর সেনা অভিযান শুরু হলে তিনি সীমান্ত পেরিয়ে ভারতে পালিয়ে যান এবং দীর্ঘদিন ছদ্মপরিচয়ে আত্মগোপনে ছিলেন। জী না! তিনি নিজে নিজে সীমান্ত পাড়ি দিয়ে ভারতে আত্মগোপন করেন নি।
প্রাথমিকভাবে আসামীর জবানবন্দি ও নথি অনুযায়ী ভারতের গোয়েন্দা সংস্থা “র” এবং “আইবি” এর তত্ত্বাবধানে তিনি কলকাতায় স্হায়ী ভাবে বসবাস করতেন। হত্যাকাণ্ডের পর তিনি প্রথমবার বাংলাদেশে এসেছিলেন ১৯৯৬ সালে শেখ হাসিনা তাঁকে অভয় দেবার পর। শেষ বার তিনি বাংলাদেশে প্রবেশ করেছিলেন ২০২০ সালে।
শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের জাতীয়তাবাদী আদর্শ, স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি এবং বাংলাদেশের স্বার্থ রক্ষায় আপসহীন অবস্থানের কারণে এই হত্যাকাণ্ডে বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থার (র) সম্পৃক্ততা ইতোমধ্যেই নিশ্চিত হয়েছে। তবে এই হত্যাকাণ্ডের সাথে ভারতের সংশ্লিষ্টতার প্রমাণ অতীতে অসংখ্য বার পাওয়ার পরও এবার প্রথম প্রধান খুনি ধরা পড়েছে।
মেজর মোজাফফরের গ্রেপ্তার বাংলাদেশের ইতিহাসের অন্যতম আলোচিত রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ডের বিচার প্রক্রিয়ায় একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি। এখন প্রত্যাশা—এই মামলার মাধ্যমে কেবল ব্যক্তিগত দায় নয়, বরং ঘটনার সম্পূর্ণ নেপথ্য পরিকল্পনা, সহযোগী নেটওয়ার্ক এবং সম্ভাব্য দেশি-বিদেশি সংশ্লিষ্টতা, যদি থেকে থাকে, সেগুলোরও নিরপেক্ষ তদন্ত ও বিচার নিশ্চিত করা হবে।
সরকারের প্রতি আবেদন: রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব, জাতীয় নিরাপত্তা ও সংবিধানের প্রতি আনুগত্য ভঙ্গ করে যে সব সামরিক, বেসামরিক, রাজনৈতিক বা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য বিদেশি স্বার্থে কাজ করে থাকেন, তবে প্রমাণের ভিত্তিতে তাদের প্রত্যেকের বিরুদ্ধে আইনের সর্বোচ্চ প্রয়োগ নিশ্চিত করা হোক। একই সঙ্গে একটি স্বাধীন ও নিরপেক্ষ জাতীয় কমিশনের মাধ্যমে পুরো ঘটনার সত্য উদ্ঘাটন করে জাতির সামনে একটি পূর্ণাঙ্গ শ্বেতপত্র প্রকাশ করা হোক।
আপডেটঃ কিছু অতি উৎসাহী সেনা আইন বিশেষজ্ঞের প্রশ্নের আলোকে নতুন সংযোজন-
“সশস্ত্র বাহিনীর আইনে পলাতক আসামির বিচার ও Court of Inquiry-এর আইনগত অবস্থান
বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনীর বিচারব্যবস্থা একটি বিশেষায়িত আইনগত কাঠামোর অধীনে পরিচালিত হয়। সেনাবাহিনীর ক্ষেত্রে Army Act, 1952 এবং Army Rules অনুযায়ী কোর্ট-মার্শাল পরিচালিত হয়। এই আইনি কাঠামোর মৌলিক নীতি হলো—কোনো সদস্যকে দণ্ডিত করার পূর্বে তাকে অভিযোগ সম্পর্কে অবহিত করা, আত্মপক্ষ সমর্থনের পূর্ণ সুযোগ প্রদান এবং আইনানুগ বিচার নিশ্চিত করা।
এই কারণে অভিযুক্ত ব্যক্তির অনুপস্থিতিতে (trial in absentia) কোর্ট-মার্শাল পরিচালনার কোনো বিধান Army Act বা Army Rules-এ নেই। অভিযুক্তের উপস্থিতি ব্যতীত বিচার শুরু করা বা বিচার সম্পন্ন করে দণ্ড প্রদান করার সুযোগ আইন স্বীকৃতি দেয় না। কারণ কোর্ট-মার্শাল একটি বিচারিক কার্যক্রম, যেখানে অভিযুক্তের উপস্থিতি, সাক্ষীদের জেরা, প্রমাণ উপস্থাপন এবং আইনগত প্রতিরক্ষার অধিকার ন্যায়বিচারের অপরিহার্য উপাদান।
অন্যদিকে, Court of Inquiry (নৌ ও বিমান বাহিনীতে Board of Inquiry) সম্পূর্ণ ভিন্ন প্রকৃতির একটি অনুসন্ধানমূলক প্রশাসনিক প্রক্রিয়া। “আদালত” শব্দটি ব্যবহৃত হলেও এটি বিচারিক আদালত নয়। এর উদ্দেশ্য হলো কোনো ঘটনা, দুর্ঘটনা, অনিয়ম বা অভিযোগের বিষয়ে তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ, সাক্ষ্য গ্রহণ এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে সুপারিশ প্রদান। তাই Court of Inquiry-এর সিদ্ধান্ত কোনো ব্যক্তিকে দোষী সাব্যস্ত করে না এবং এর মাধ্যমে কারাদণ্ড বা অন্য কোনো বিচারিক শাস্তি প্রদান করা যায় না।
যদি Court of Inquiry-এর প্রতিবেদনে শাস্তিযোগ্য অপরাধের প্রাথমিক ভিত্তি পাওয়া যায়, তবে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে Army Act ও Army Rules অনুযায়ী কোর্ট-মার্শাল বা অন্য প্রযোজ্য বিচারিক প্রক্রিয়া শুরু করতে হয়। আবার কোনো ক্ষেত্রে বিষয়টি যদি প্রশাসনিকভাবে নিষ্পত্তিযোগ্য বলে বিবেচিত হয়, তাহলে কর্তৃপক্ষ প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারেন। এ ধরনের ব্যবস্থার মধ্যে সতর্কীকরণ, তিরস্কার, চাকরি থেকে অপসারণ বা বরখাস্ত অন্তর্ভুক্ত হতে পারে। তবে প্রশাসনিক আদেশের মাধ্যমে কারাদণ্ড প্রদান আইনগতভাবে সম্ভব নয়; কারাদণ্ড কেবল বৈধ কোর্ট-মার্শালের মাধ্যমেই প্রদান করা যায়।
কোনো সেনা সদস্য অভিযোগের মুখে বিচার শুরু হওয়ার আগেই আত্মগোপন করলে বা ইউনিট ত্যাগ করলে তাকে সেনা আইনের অধীনে পলাতক (Deserter) হিসেবে গণ্য করা হয়। পলাতক হওয়ার অর্থ এই নয় যে তিনি স্বয়ংক্রিয়ভাবে চাকরি থেকে বরখাস্ত বা অবসরপ্রাপ্ত হয়ে গেছেন। তিনি আইনগতভাবে সেনাবাহিনীর সদস্য হিসেবেই গণ্য থাকেন এবং তার বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা বহাল থাকে।
এ ধরনের ক্ষেত্রে সেনা কর্তৃপক্ষ তার বিরুদ্ধে Apprehension Roll (গ্রেফতারি পরোয়ানা) জারি করেন, যা সংশ্লিষ্ট আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থার নিকট প্রেরণ করা হয়। পলাতক ব্যক্তি গ্রেফতার বা আত্মসমর্পণ না করা পর্যন্ত এই পরোয়ানা কার্যকর থাকে। প্রশাসনিকভাবে তাকে সাধারণত Supernumerary List-এ অন্তর্ভুক্ত রাখা হয়। পরবর্তীকালে তিনি গ্রেফতার বা আত্মসমর্পণ করলে তাকে পুনরায় সামরিক কর্তৃপক্ষের নিয়ন্ত্রণে এনে অভিযোগ অনুযায়ী তদন্ত, চার্জ প্রণয়ন এবং আইনানুগ কোর্ট-মার্শালসহ অন্যান্য বিচারিক কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়।
অতএব, Army Act, 1952-এর কাঠামো অনুযায়ী Court of Inquiry বিচার নয়, বরং একটি অনুসন্ধানমূলক প্রক্রিয়া; আর কোর্ট-মার্শাল অভিযুক্তের উপস্থিতি ও আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ নিশ্চিত না করে পরিচালনা করা যায় না। তাই পলাতক অবস্থায় কোনো ব্যক্তিকে কোর্ট-মার্শালের মাধ্যমে দণ্ডিত করার পরিবর্তে প্রথমে তাকে আইনের আওতায় এনে বিচারিক প্রক্রিয়ায় অন্তর্ভুক্ত করাই সামরিক আইনের মৌলিক নীতি এবং ন্যায়বিচারের অপরিহার্য শর্ত।”
তথ্য সূত্র
* বিভিন্ন প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিকস মিডিয়ায় প্রকাশিত সংবাদ।