মাহবুবুর রহমান খান :
পদায়ণ, বদলি, পদোন্নতি ও অভ্যন্তরীণ গ্রুপিং এর মত নানা দলাদলি বা তদবিরকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশ পুলিশ প্রশাসনে বর্তমানে অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা ও সংকট ক্রমশ: বেড়েই চলছে। পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে কুৎসা ও অপপ্রচারের মাধ্যমে বাহিনীর মনোবল ক্ষতিগ্রস্ত করার অপচেষ্টা চালানো হচ্ছে বলে পুলিশ সদর দপ্তর থেকে পুলিশ সার্ভিস এসোসিয়েশন জানিয়েছে।
*অস্থিরতার প্রধান কারণসমূহ*
বদলি ও পদয়ন নিয়ে গ্রুপিং :
গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোতে নিজেদের লোক বসানো এবং পছন্দমত জায়গায়্ব দলি হওয়ার জন্য অভ্যন্তরীণ তদবির ও টানাপড়েন।
প্রশাসনিক পদক্ষেপ ও ক্ষোভ:
বিগত সরকারের সময় বিতর্কিত বা অনিয়মের সাথে জড়িত কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া এবং অনেককে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানোর প্রক্রিয়া।
সামাজিক মাধ্যমে অপপ্রচার :
নিষিদ্ধ রাজনৈতিক গুষ্টি বা স্বার্থান্বেষী মহলের পক্ষ থেকে কর্মকর্তাদের টার্গেট করে মিথ্যা ও উস্কানি মূলক তথ্য ছড়ানো।
বর্তমান পরিস্থিতি ও পুলিশের পদক্ষেপ :
পুলিশ সদর দপ্তর থেকে গুজবে কান না দিতে এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বিভ্রান্তিকর তথ্য শেয়ার করা থেকে সাধারণ জনগণের প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছে।
অপপ্রচারকারী ও শৃঙ্খলা বঙ্গ কারীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়ারও ঘোষণা দেওয়া হয়েছে।
মাঠ পর্যায়ে পুলিশ সদস্যদের সর্বোচ্চ সর্তকতা ও পেশাদারিত্ব বজায় রেখে দায়িত্ব পালনে নির্দেশ।
*পটভূমি*
বাংলাদেশ পুলিশের ভেতরে নিরব অস্থিরতা ক্রমেই প্রকাশ্যে আসছে। একদিকে আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে নানা অনিয়মে জড়িত থাকার অভিযোগে কর্মকর্তাদের বাধ্যতামূলক অবসর ও প্রশাসনিক পদক্ষেপের আশঙ্কা, অন্যদিকে পদোন্নতি, গুরুত্বপূর্ণ পদে পদায়ন ও প্রভাব বিস্তারকে কেন্দ্র করে তীব্র গ্রুপিং। প্রজাতন্ত্রের সবচেয়ে বড় আইন-শৃংখলার রক্ষাকারী বাহিনী এখন বড় ধরনের অভ্যন্তরীণ টানাপড়েনের সম্মুখীন। একে অপরের বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ ছড়ানোর প্রবণতা সবমিলিয়ে পুলিশ সদস্যদের মধ্যে অস্বস্তি ও অনিশ্চয়তা বাড়ছে। এর প্রভাব পড়ছে অনুসন্ধানী
গোয়েন্দা তৎপরতা এবং আইন-শৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণের মতো বাহিনীর স্বাভাবিক কর্মকান্ডে।
পুলিশ সদর দপ্তর, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং পুলিশের বিভিন্ন ইউনিটের একাধিক কর্মকর্তা বলছেন, বাহিনীর ভেতরে বিভক্তি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, অনেক কর্মকতা নিজের দায়িত্ব পালনের চেয়ে ব্যক্তিগত অবস্থান সুরক্ষা প্রশাসনিক প্রতিযোগিতা, বদলি ঠেকানো কিংবা নিজেদের পদায়ন নিশ্চিত করতেই বেশি ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন। এর পাশাপাশি প্রতিদ্বন্দ্বী কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ সংগ্রহ, বিভিন্ন মহলে তথ্য সরবরাহ, এমনকি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বাহিনী প্রধান (আইজিপি) থেকে শুরু করে পুলিশের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে নেতিবাচক প্রচারণার ঘটনা ও বাড়ছে। ফলে ভেতরে পারস্পরিক আস্হার সংকট দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে।
এমন প্রেক্ষাপটে গত শুক্রবার পুলিশ সদর দপ্তর গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিবৃতিতে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে পুলিশ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে চালানো অপপ্রচারের তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছেন। পাশাপাশি অপপ্রচারকারীদের বিরুদ্ধে প্রচলিত আইনে কঠোর আইনানক ব্যবস্থা গ্রহণ করার হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ডক্টর তৌহিদুল হক গণমাধ্যম আমাদের সময়কে বলেন, পুলিশের বর্তমান সংকট শুধু প্রশাসনিক নয়, এটি নেতৃত্ব আস্তা এবং পেশাদার সংস্কৃতিরও সংকট। পুলিশ যদি নিজেদের অভ্যন্তরীণ বিভক্তি কাটিয়ে উঠতে না পারে তাহলে শুধু বাহিনীর মনোবল নয়, দেশের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতিও দীর্ঘ মেয়াদে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। পুলিশের ভাব মূর্তি পুনর্গঠনের এই সময়ে বাহিনীর অভ্যন্তরীণ ঐক্য পেশাদারীত্ব সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর স্বার্থের চেয়ে প্রতিষ্ঠানকে অগ্রাধিকার না দিলে পুলিশের প্রতি জনআস্হা পুনরুদ্ধারের প্রচেষ্টা কঠিন হয়ে পড়তে পারে।
এ ব্যাপারে সাবেক আইজিপি মোঃ আশরাফুল হুদা গণমাধ্যম আমাদের সময় কে বলেন, পুলিশ একটি চেইন অফ কমান্ড ভিত্তিক বাহিনী। সেখানে ব্যক্তিগত গ্রুপিং বা বিভক্তি দীর্ঘস্থায়ী হলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে পেশাদারিত্ব। বাহিনীর ভেতরে প্রতিযোগিতা থাকতেই পারে কিন্তু সেই প্রতিযোগিতা যদি একে অপরকে হেয় করা,অপপ্রচার কিংবা প্রশাসনিক অস্থিরতায় রূপ নেয় তাহলে সেটি পুরো প্রতিষ্ঠানের জন্য ক্ষতিকর। অপপ্রচার যারা করছে তাদের উদ্দেশ্য বাহিনীর মনোবল দুর্বল করার অপচেষ্টা কিনা তা খুঁজে বের করতে হবে। আইনের ভেতরে বা বাইরে যেখানেই হোক সঙ্গে সঙ্গে যারা জড়িত তদন্তপূর্বক তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে।
সাম্প্রতিক সময়ে প্রায় প্রতিদিনই পুলিশের বিভিন্ন স্তরের কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে দুর্নীতি, অনিয়ম, ক্ষমতার অপব্যবহার কিংবা অতীত কর্মকান্ড নিয়ে ধারাবাহিকভাবে বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রতিবেদন প্রকাশিত হচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও এসব বিষয় নিয়ে নানা তথ্য ছড়ানো হচ্ছে। এ ব্যাপারে পুলিশের কয়েকজন কর্মকর্তা বলছেন সব অভিযোগ যে ভিত্তিহীন তা নয় আবার সব অভিযোগ যে সত্য তাও নয়।কিন্তু যাচাই-বাছাই এর আগেই সামাজিক মাধ্যমে কোন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে প্রচারণা এমনকি যাদের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ নেই তারাও নানা ধরনের অপপ্রচারের শিকার হচ্ছেন।
এ ব্যাপারে একজন অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক (এডিশনাল আইজিপি) পদমর্যাদার কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করা শর্তে গণমাধ্যমকে জানান, বাহিনীর ভেতরের বিভক্তি এখন এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, একজন কর্মকর্তা অন্যজনকে দুর্বল করতে বিভিন্ন উপায়ে তথ্য ছড়ানোর চেষ্টা করছেন এতে ব্যক্তিগত ক্ষতির পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানের ভাবমূর্তি ও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
পুলিশ সদর দপ্তরের একাধিক সূত্র গণমাধ্যমকে জানায়, ২০২৪ সালে ছাত্রজনতার অভ্যুত্থানে সরকারের পতনের পর সবচেয়ে বেশি বিপর্যয়ের মুখে পড়ে পুলিশ। সরকার পতনের পর পুলিশকে কাজে ফেরানো সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়। শুরু হয় পুলিশে বড় ধরনের প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাস। একদিকে সরকারের সময়ে গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকা কর্মকর্তাদের সরানো হয় অন্যদিকে নতুন করে পদায়ন ও পদোন্নতি দিয়ে ঢেলে সাজানো হয় এই বাহিনীকে যা এখনো চলমান রয়েছে। এই প্রক্রিয়াকে কেন্দ্র করে পুলিশের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তাদের মধ্যে প্রতিযোগিতা বেড়েছে। বিশেষ করে পুলিশের গোয়েন্দা ইউনিট, শিল্পাঞ্চল পুলিশ, হাইওয়ে পুলিশ, বিভিন্ন রেঞ্জ এবং জেলা পুলিশের গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পেতে নানা তৎপরতা চলছে বলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানিয়েছেন।
কিছু কর্মকর্তা নিজেদের অবস্থান শক্ত করতে প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তিদের দ্বারস্থ হচ্ছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। আবার প্রতিদ্বন্দ্বী কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে পুরনো অভিযোগ সামনে আনার প্রবণতাও যেমন দেখা যাচ্ছে আবার স্বাভাবিক পদোন্নতি থেকে কাউকে কাউকে বঞ্চিত করার অভিযোগ ও সামনে আসছে।
অন্যদিকে পুলিশে গত দুই বছরে একের পর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়েছে।অতীতের বিতর্কিত নির্বাচন, রাজনৈতিক দমন পীড়ন কিংবা আলোচিত কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ততার অভিযোগে অনেক কর্মকর্তার বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। যার কারণে বাহিনীর একটি অংশের মধ্যে চাকরি হারানোর শংকা তৈরি হয়েছে। যাদের চাকরির মেয়াদকাল ২৫ বছর পূর্ণ হয়েছে তাদের অনেকেই এখন অনিশ্চয়তায় রয়েছেন।২৫ বছর পূর্ণ হওয়া গত দুই বছরে অন্তত ১৪২ জন পুলিশ কর্মকর্তাকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়েছে আরো অন্তত ৩০ জনকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানোর কথা শোনা যাচ্ছে। ইতোমধ্যে ৫৭ জন কর্মকর্তাকে পুলিশের বিভিন্ন ইউনিটে সংযুক্ত করা হয়েছে।
একজন ডিআইজি পদমর্যাদার কর্মকর্তা বলেন, কে কখন অবসরে যাবেন বা কার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে এই অ নিশ্চয়তা অনেক কর্মকর্তাকে মানসিক ভাবে চাপে রাখছে ফলে স্বাভাবিকভাবে কাজের পরিবেশ ও বিঘ্নিত
হচ্ছে। পুলিশের একাধিক কর্মকর্তা বলছেন, পুলিশ কর্মকর্তা ও সদস্যদের বিরুদ্ধে আগে অভ্যন্তরীণ অভিযোগ নির্দিষ্ট প্রশাসনিক চ্যানেলে সীমাবদ্ধ থাকতো এখন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম, গণমাধ্যম একটি বড় মাধ্যম হয়ে উঠেছে। এ কারণে যে কোন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে পুরনো ছবি, ভিডিও কিংবা বিভিন্ন তথ্য মুহূর্তে ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে ভুয়া কিংবা বিভ্রান্তিকর তথ্য প্রচার করা হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এতে শুধু কর্মকর্তাই নন পুরো পুলিশ বাহিনীর ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। সাধারণ মানুষের মধ্যে পুলিশের প্রতি নেতিবাচক ধারণা তৈরি হচ্ছে। গত কয়েকদিন ধরে পুলিশ প্রধান আলি হোসেন ফকির সহ পুলিশের অন্তত দুই ডজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ফেসবুকে নানা অনিয়ম দুর্নীতির তথ্য এসেছে এর সঙ্গে পুলিশেরই কোন কোন কর্মকর্তা জড়িত বলে তথ্য পাওয়া যাচ্ছে।
পুলিশ কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বাহিনীর অভ্যন্তরীণ এই অস্থিরতার কারণে অনেক ক্ষেত্রে সিদ্ধান্ত গ্রহণে ধীরগতি পরিলক্ষিত হচ্ছে। গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিতে তারা বিরত থাকছেন। কারণ পরে সেটি নিয়ে অভিযোগ উঠতে পারে বা সামাজিক মাধ্যমে পড়তে পারে এমন আশঙ্কা কাজ করছে। ফলে অপরাধ দমন, গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ, মাদকবিরোধী অভিযান কিংবা সন্ত্রাস দমনের মত নিয়মিত কার্যক্রমেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
ঢাকা মহানগর পুলিশের এক কর্মকর্তা গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, যখন কর্মকর্তারা নিজের অবস্থান নিয়েই বেশি চিন্তিত থাকেন তখন স্বাভাবিকভাবে শতভাগ মনোযোগ সহকারে দায়িত্ব পালন কঠিন হয়ে পড়ে।
উদ্বেগের বিষয় হলো,যাদের বিরুদ্ধে কোন গুরুতর অভিযোগ নেই তারাও সামাজিক মাধ্যমে বিভিন্ন অপপ্রচারের শিকার হচ্ছেন। কখনো পুরনো ছবি কখনো আংশিক তথ্য আবার কখনো বেনামি পোস্টের মাধ্যমে একজন কর্মকর্তার ভাবমূর্তি ক্ষুন্ন করার অপচেষ্টা চলছে। এতে ভালো কর্মকর্তারাও হতাশ হয়ে পড়ছেন। অনেকেই গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিতে অনাগ্রহী হয়ে পড়েছেন এতে পুলিশী সেবা প্রত্যাশীদের বিচার প্রাপ্তি অনেক ক্ষেত্রেই বিলম্বিত হচ্ছে।
তথ্যসূত্র:
#দৈনিক আমাদের সময়।
# ডেইলি স্টার।
# দৈনিক আমার দেশ।
#bd news24.com.
# দৈনিক যুগান্তর।
#ডেইলি অবজারভার।
# দৈনিক সময়ের আলো।
#দৈনিক ইত্তেফাক।
# jamuna tv.
# Bangla vision.
বি: দ্র :
প্রতিবেদক,সম্পাদক -প্রকাশক
দৈনিক জনতার দেশ (অনলাইন পোর্টাল).