ক্রাইম ডেস্ক|জনতার দেশঃ
আজ এমন এক মহিলা গ্যাংষ্টারের কথা কথা বলবো যাকে হাজী মাস্তান বরদারাজন করিমলালার মত প্রবাদপ্রতিম এবং দাউদ ইব্রাহিমের মত তৎকালীন উঠতি গ্যাংষ্টাররা চোখ বুজে ভরসা করতো।শুধু ভরসা নয় প্রয়োজন পড়লে তারা তার থেকে পরামর্শ পর্যন্ত নিতেন।মুম্বাই অন্ধকার জগতের অত্যন্ত বুদ্ধিমান ও কৌশলী এক নারী হিসাবেই তিনি আজও পরিচিত।
জেন্নাবাঈ দারুওয়ালী হিসাবে তার পরিচিতি থাকলেও তার আসল নাম ছিল জেন্নাব খাঁ।তিনি ১৯৬০ থেকে ১৯৮০-র দশকে মুম্বাই (তৎকালীন বোম্বে) আন্ডারওয়ার্ল্ডের অন্যতম প্রভাবশালি ও রহস্যময়ী নারী চরিত্র ছিলেন। ‘দারুওয়ালী”‘ উপাধিটি তিনি পেয়েছিলেন মূলত বেআইনি দেশি মদের কারবারের সাথে যুক্ত থাকার কারণে।
জেন্নাবাঈ জন্মগ্রহণ করেছিলেন বোম্বাইয়ের দক্ষিণ অংশ দোংরির এক কট্টর মুসলিম পরিবারে।খুব কম বয়সেই হ্যালিম খাঁ নামের এক ব্যক্তির সাথে তাঁর বিয়ে হয়। তবে ভারত ভাগের সময় তাঁর স্বামী তাঁকে ও সন্তানদের ফেলে পাকিস্তানে চলে যান। স্বামী ছেড়ে যাওয়ার পর পাঁচ সন্তানকে লালন-পালন করার জন্য চরম আর্থিক অনটনের মুখে পড়েন জেন্নাবাঈ। সন্তানদের বাঁচিয়ে রাখতেই প্রথমে তিনি বেআইনি কারবারে পা বাড়ান।
১৯৬০-এর দশকে মহারাষ্ট্রে মদ নিষিদ্ধ ছিল। পরিবার চালাতে জেন্নাবাঈ চালের ছাঁট ও গুড় দিয়ে দোংরি ও আশপাশের বস্তি এলাকায় লুকিয়ে ‘দেশি দারু’ বা বেআইনি মদ তৈরি ও বিক্রি করা শুরু করেন।পুলিশের সাথে সমঝোতা করে তিনি দ্রুতই দক্ষিণ বোম্বাইয়ের পুরো মদ সাপ্লাই নেটওয়ার্ক নিজের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নেন। এই ব্যবসা থেকেই তাঁর নামের সাথে যুক্ত হয় ‘দারুওয়ালী” উপাধি। মদের ব্যবসার পাশাপাশি তিনি চাল, চিনি এবং অন্যান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের কালোবাজারিও শুরু করেন।
ক্রমশ যখন তাঁর প্রভাব বাড়েতে শুরু করে, তখন আন্ডারওয়ার্ল্ডের ছোট-বড় গ্যাংস্টাররা তাঁদের নিরাপদ আস্তানা ও পুলিশি ঝামেলা এড়াতে জেন্নাবাঈয়ের সাহায্য নিতে শুরু করে। তার তীক্ষ্ণ বুদ্ধি আর পুলিশের সঙ্গে সেটিং তার একটা বড় কারণ।দোংরি ও ভিন্ডি বাজারের মতো অপরাধপ্রবণ এলাকায় তাঁর অবস্থান ছিল অত্যন্ত শক্ত।
বোম্বাইয়ের বিখ্যাত এবং প্রবাদপ্রতিম চোরাচালানকারী হাজী মাস্তান এবং তামিল গ্যাংস্টার বরদারাজন মুদালিয়ারের সাথে জেন্নাবাঈয়ের সুসম্পর্ক তৈরি হয়। তাঁরা জেন্নাবাঈকে বিশেষ শ্রদ্ধা করতেন।
দাউদ ইব্রাহিম ও তাঁর দাদা সাব্বির ইব্রাহিমের মা জেন্নাবাঈয়ের বিশেষ পরিচিত ছিলেন। দাউদ ও তার ভাইয়েরা জেনাবাঈকে নিজের মাসি হিসাবেই দেখতো।পরবর্তীতে দাউদ এবং দাদা সাব্বির অপরাধ জগতে পা রাখলে জেন্নাবাঈ তাঁদের অভিভাবকের মতো আশ্রয় ও পরামর্শ দেন।জেনাবাঈকে দাউদ ইব্রাহিমের প্রথম মেন্টর বললে খুব একটা ভুল হবে না।সেই থেকেই পুরো আন্ডারওয়ার্ল্ডে তিনি শ্রদ্ধার সাথে ‘ফাতিমা আপা’ বা ‘মাসি’ নামে পরিচিত হন। কোনো গ্যাংস্টারের মধ্যে বিবাদ হলে মিটমাট করার প্রধান কেন্দ্র ছিলেন তিনি।
মুম্বাই আন্ডারওয়ার্ল্ডের ‘শান্তিদূত’ হিসাবে তার একটা প্রভাব তৈরী হয়।
১৯৭০ ও ১৯৮০-র দশকে বোম্বাই আন্ডারওয়ার্ল্ড দুটি বড়ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়ে — একপক্ষে পঠান গ্যাং (করিম লালা, সামাদ খাঁ) এবং অন্যপক্ষে দাউদ ইব্রাহিম ও সাব্বির ইব্রাহিম। দুই গ্রুপের মধ্যে রক্তক্ষয়ী গ্যাংওয়ার শুরু হয় আন্ডারওয়ার্ল্ডের মধ্যে যখনই রক্তপাত চরম আকার ধারণ করত, জেন্নাবাঈ দুটি দলের মাফিয়া ডনদের এক টেবিলে বসিয়ে শান্তি চুক্তি করাতেন। বলা হয়, করিম লালার পঠান গ্যাং এবং দাউদ ইব্রাহিমের গ্যাংয়ের মধ্যে যুদ্ধ থামাতে হাজী মাস্তান ও জেন্নাবাঈ দোংরিতে এক ঐতিহাসিক বৈঠকের আয়োজন করেছিলেন। জেন্নাবাঈয়ের কথা করিম লালা এবং দাউদ ইব্রাহিম উভয়েই অমান্য করতে পারতেন না।
১৯৮০-র দশকের শেষের দিকে যখন দাউদ ইব্রাহিম ডি-কোম্পানি গঠন করে পুরো মুম্বাইয়ের দখল নেয় এবং আন্ডারওয়ার্ল্ডে ডি-কোম্পানির সঙ্গে গ্যাংওয়ারে পাঠান গ্যাং প্রায় শেষ হয়ে যায় তখন জেন্নাবাঈ ধীরে ধীরে নিজেকে আন্ডারওয়ার্ল্ডের কার্যকলাপ থেকে গুটিয়ে নেন।জীবনের শেষ দিনগুলোতে তিনি সাধারণ জীবনযাপন করতেন এবং বার্ধক্যজনিত কারণে বোম্বাইয়েই মারা যান।
একদম সম্বলহীন এক মহিলার উত্থান এবং মুম্বাই অন্ধকার জগতের লাগাম নিজের হাতে নেওয়া এ বড় কম কথা নয়। যে জগতে ধোঁকা আর খুন খুব স্বাভাবিক ব্যাপার সেখানে সেখানে এই আধিপত্য চিরকাল বজায় রেখেছিলেন জেনাবাঈ – দারুওয়ালী।
ছবিঃ
সংগৃহিত।
তথ্যসূত্রঃ
# দেশি বিদেশি বিভিন্ন পত্র পত্রিকা ও জার্ণাল।