শিরোনাম :
আহমদ ছফার বিয়ে ও শামীম শিকদার প্রসঙ্গ। যত চাপই আসুক ব্রিটেন কে ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে টেনে নেয়া যাবেনা —- ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী। একটি শিক্ষনীয় গল্প এবং আমাদের মানবিক চরিত্র। ৯ম পদাতিক ডিভিশনের নিষ্ক্রিয়তা: ৪ আগস্টের রহস্য ঘিরে নতুন প্রশ্ন। আধুনিক বিকৃত ইসলাম এবং মদিনা বিশ্ব বিদ্যালয়ের শিক্ষা কারিকুলাম। জন দুর্ভোগের সূতিকাগার নরসিংদী পৌরসভা হরমুজ প্রণালী কে ইস্যু করে তেহরানের নতুন পরিকল্পনা ৩ শ্রেণীতে বিভক্ত দেশ। কূয়াকাটায় ছাত্র হিযবুল্লাহর উদ্যোগে দাখিল পরীক্ষার্থীদের মাঝে শিক্ষা উপকরণ বিতরণ। শান্তি চুক্তি ভেস্তে যাওয়ায় মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে সংঘাত তৈরির আশঙ্কা, নিজ নিজ শর্তে ই*রান- আ*ম্রিকা দু’পক্ষই ছাড় দিতে নারাজ, সমঝোতায় পৌঁছাতে পারেনি কোন পক্ষ। কুরআনের অপব্যাখ্যার অজুহাতে কুষ্টিয়ায় কথিত পীর শামীম রেজা ওরফে জাহাঙ্গীর কে পিটিয়ে হত্যার নেপথ্য কাহিনি।
বৃহস্পতিবার, ১৬ এপ্রিল ২০২৬, ০৬:১৬ অপরাহ্ন

সেনাবাহিনীর একটি অভিশপ্ত নাম জেনারেল মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী।

Reporter Name / ৫৫ Time View
Update : বুধবার, ২৫ মার্চ, ২০২৬

মো: তারেক সরকার:

২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি। ওয়ান ইলেভেনের কালো অধ্যায়ের সূচনা লগ্ন। দেশে তখন এক অদ্ভুত আঁধার। রাজপথে সংঘাত, অনিশ্চয়তা। ঠিক সেই মুহূর্তে পর্দার আড়াল থেকে বেরিয়ে আসে সেনাসমর্থিত এক ছায়া সরকার। সেনাপ্রধান হিসেবে মইন ইউ আহমেদ সামনে থাকলেও, মূল অপারেশনাল কমান্ড এবং গোয়েন্দা জাল বিছিয়েছিলেন এই মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী।

তৎকালীন ৯ পদাতিক ডিভিশনের জিওসি হিসেবে তিনি ছিলেন ঢাকার ‘ডিফ্যাক্টো’ সুলতান। বঙ্গভবনে গিয়ে রাষ্ট্রপতি ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদকে জিম্মি করার সেই দৃশ্য আজও বাংলাদেশের মানুষের স্মৃতিতে অম্লান।

অভিযোগ আছে, জেনারেল মাসুদ সেদিন রাষ্ট্রপতির ওপর যে মানসিক এবং পেশিশক্তির চাপ সৃষ্টি করেছিলেন, তা ছিল সরাসরি সংবিধান লঙ্ঘন। এক-এগারোর সেই রক্তপাতহীন অভ্যুত্থান আসলে ছিল জনগণের ভোটাধিকার হরণ এবং বিরাজনীতিকীকরণের এক সুগভীর ব্লু-প্রিন্ট।

জাতীয় সমন্বয় কমিটি: নির্যাতনের এক টর্চার সেল
জেনারেল মাসুদের ক্যারিয়ারের সবচেয়ে অন্ধকার দিক ছিল ‘গুরুতর অপরাধ দমন সংক্রান্ত জাতীয় সমন্বয় কমিটি’র প্রধান হিসেবে তার ভূমিকা। দুর্নীতির বিরুদ্ধে যুদ্ধের তকমা লাগিয়ে তিনি মূলত রাজনৈতিক দলগুলোকে ভেঙে চুরমার করার মিশনে নেমেছিলেন। তৎকালীন প্রভাবশালী রাজনীতিবিদ এবং ব্যবসায়ীদের আটক করে সাভারে বা অজ্ঞাত স্থানে নিয়ে যে অমানুষিক নির্যাতন চালানো হয়েছিল, তার প্রতিটি ধূলিকণা মাসুদের পাপের সাক্ষী।

তৎকালীন প্রধান দুই দলের শীর্ষ নেতাদের ‘মাইনাস টু ফর্মুলা’র মাধ্যমে রাজনীতি থেকে বিদায় করার ষড়যন্ত্রের মাস্টারমাইন্ড ছিলেন তিনি। খালেদা জিয়া এবং শেখ হাসিনাকে কারাগারে পাঠিয়ে তিনি ভেবেছিলেন বাংলাদেশ চিরতরে তার নিয়ন্ত্রণে চলে এসেছে। কিন্তু আল্লাহর ফায়সালা বড় অদ্ভুত। সেই সময়ের নির্যাতিত তারেক রহমান আজ দেশের ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে (প্রধানমন্ত্রী), আর দাপুটে জেনারেল আজ শ্রীঘরে।

তারেক রহমানের মেরুদণ্ড ভাঙার নেপথ্য নায়ক
জেনারেল মাসুদের নিষ্ঠুরতার সবচেয়ে বড় উদাহরণ বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ওপর শারীরিক নির্যাতন। রিমান্ডের নামে তাকে ছাদ থেকে ঝুলিয়ে পেটানো হয়েছিল। সেই অমানবিক নির্যাতনে তারেক রহমানের মেরুদণ্ড ভেঙে যায়, যার ক্ষত তিনি আজও বয়ে বেড়াচ্ছেন। লন্ডনে দীর্ঘ নির্বাসিত জীবন কাটাতে হয়েছিল কেবল সেই পঙ্গুত্ব থেকে মুক্তির আশায়।

শুধু তারেক রহমান নন, তার ছোট ভাই আরাফাত রহমান কোকোর ওপরও চালানো হয়েছিল বর্বর নির্যাতন। ক্ষমতার মদমত্ততায় জেনারেল মাসুদ ভুলে গিয়েছিলেন যে, মানুষের হাহাকার আর অভিশাপ কখনো বৃথা যায় না। আজ যখন সেই একই পুলিশ বাহিনী তাকে গ্রেপ্তার করে নিয়ে যাচ্ছে, তখন কি তিনি সেই হাড়ভাঙা যন্ত্রণার কথা অনুভব করতে পারছেন?

সুবিধাবাদী রাজনীতির খোলস
জেনারেল মাসুদের চরিত্র বিশ্লেষণে একটি বিষয় পরিষ্কার—তিনি কেবল নিষ্ঠুরই নন, বরং চরম সুবিধাবাদী।

ওয়ান-ইলেভেন সরকার বিদায় নেওয়ার আগে তিনি নিজের পিঠ বাঁচাতে আওয়ামী লীগের সাথে গোপন আঁতাত করেছিলেন বলে জনশ্রুতি আছে। পুরস্কার হিসেবে তিনি পেয়েছিলেন অস্ট্রেলিয়ার হাইকমিশনারের পদ। ১৫ বছরের ফ্যাসিবাদী শাসনামলে তিনি ছিলেন ‘আদুরে জেনারেল’।
আওয়ামী লীগের গৃহপালিত বিরোধী দল জাতীয় পার্টির ব্যানারে ফেনী-৩ আসন থেকে দুবার এমপি হয়েছেন।

রাজনৈতিক ময়দানে তার কোনো জনভিত্তি ছিল না। কথিত আছে, ব্যালট বাক্স আগেই তার পক্ষে ভরাট করা থাকতো। তিনি ছিলেন প্রশাসনের বিশেষ অনুগ্রহভাজন। কিন্তু গত ১৫ বছরের লুটপাট আর ক্ষমতার মধু খেয়ে তিনি ভেবেছিলেন তার বিচার কোনোদিন হবে না। তিনি ভুলে গিয়েছিলেন, জুলুমের আয়ু খুব সংক্ষিপ্ত হয়।

শিক্ষা: কোনো আসনই চিরস্থায়ী নয়
মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীর গ্রেপ্তার বাংলাদেশের বর্তমান এবং ভবিষ্যতের সকল ক্ষমতাধরদের জন্য এক সতর্কবার্তা।

১. জুলুম করে টেকা যায় না: আপনি রাষ্ট্রের যত বড় পদেই থাকুন না কেন, জনগণের ওপর অন্যায় করলে তার মাশুল দিতেই হবে।
২. সেনাবাহিনীকে রাজনীতিকরণ: মাসুদরা যখন নিজের উচ্চাভিলাষ চরিতার্থ করার জন্য বাহিনীকে ব্যক্তিগত ঢাল হিসেবে ব্যবহার করেন, তখন তার পরিণতি হয় অসম্মানজনক।
৩. বিচারের বাণী নিরভৃতে কাঁদে না: ১৫ বছর সময় লাগলেও আজ ন্যায়বিচার শুরু হয়েছে। যারা ভেবেছিলেন তারেক রহমানকে পঙ্গু করে দিয়ে তারা আজীবন রাজত্ব করবেন, তাদের রাজপ্রাসাদ আজ তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ছে।

আগামীর বাংলাদেশ ও ন্যায়বিচার
ডিআইজি শফিকুল ইসলামের বক্তব্য অনুযায়ী, মাসুদের বিরুদ্ধে পাঁচটি মামলা রয়েছে। এর মধ্যে হত্যা, নির্যাতন এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের মতো গুরুতর অভিযোগ রয়েছে। জনগণ আশা করে, এই বিচার যেন কেবল একটি গ্রেপ্তার নাটকে সীমাবদ্ধ না থাকে। ওয়ান-ইলেভেনের কুশীলব মইন ইউ আহমেদ থেকে শুরু করে যারা সেদিন গণতন্ত্রের গলা টিপে ধরেছিল, তাদের প্রত্যেককে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল বা বিশেষ আদালতে বিচারের মুখোমুখি করতে হবে।

বাংলাদেশের মানুষ আজ আর কোনো ‘মাইনাস ফর্মুলা’ দেখতে চায় না। তারা দেখতে চায় আইনের শাসন। মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীর এই দৃশ্যমান পতন আমাদের শিখিয়ে দিয়ে গেল—অহংকার কেবল পতনই ডেকে আনে না, বরং ইতিহাসের আস্তাকুঁড়ে নিক্ষিপ্ত হওয়ার এক করুণ দলিল তৈরি করে।

আজ যারা প্রশাসনের উঁচু পদে আসীন, তাদেরও মনে রাখা উচিত—মাসুদরা একসময় নিজেদের অপরাজিত ভাবতেন। কিন্তু সময় যখন ঘনিয়ে আসে, তখন বারিধারার কড়া নিরাপত্তাও হাতকড়া আটকাতে পারে না। জুলুমবাজদের শেষ ঠিকানা সবসময় একই হয়—অন্ধকার কারাগার এবং ইতিহাসের ঘৃণা।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category