♦জুলকারনাইন সায়ের :
জুলাই ২০২৪ এর গণঅভ্যুত্থানের ঘটনাপ্রবাহ নিয়ে ইতোমধ্যেই নানা জনের আত্মজৈবনিক বীরত্বগাথা, ‘কে কখন কী ঘোষণা দিয়েছিলেন’–জাতীয় পিণ্ডি চটকানি লক্ষ্য করছি। খুব কম প্রজন্মই নিজের জীবদ্দশায় চোখের সামনে ইতিহাস এত দ্রুত বিকৃত হতে দেখে; দুর্ভাগ্যজনক হলেও, এই অভিজ্ঞতা আমাদের হচ্ছে। তবুও সেই বিকৃতির আড়ালে থেকে যাওয়া কিছু মানুষ ও তাদের নীরব সাহসিকতার কাহিনি যেভাবে চাপা পড়ে যাচ্ছে তা দেখে বেশ লজ্জিত হচ্ছি — সব জেনেশুনেও যদি তাঁদের নাম ও ভূমিকা প্রকাশ না করি, তবে তাঁদের প্রতি তা ঘোরতর অন্যায় হবে।
জুলাই অভ্যুত্থানের সাফল্যের নেপথ্যে সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল ওয়াকার–উজ–জামান ছাড়াও আরও বেশ কয়েকজন উচ্চপদস্থ সামরিক কর্মকর্তার সরাসরি সমর্থন ও সময়োচিত সিদ্ধান্ত ছাত্র–জনতার প্রাণ বাঁচিয়েছে এবং স্বৈরশাসনের পতন ত্বরান্বিত করেছে।
ইতিহাস বলে ১৯৬৯ এর গণঅভ্যুত্থান, ১৯৯০ এর স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের মতো ২০২৪ এর জুলাই সাধারণ মানুষের আত্মত্যাগ আর রাষ্ট্রের কিছু সৎ ও আদর্শবাদী শক্তির মিলিত ফসল। কিন্তু সেই শক্তিগুলোর ভেতর কয়েকজন নির্দিষ্ট ব্যক্তির কথা খুব কমই উচ্চারিত হয়েছে।
আন্দোলন যখন তীব্র, তখন স্বৈরাচার সরকার প্রধান শেখ হাসিনা ছাত্র–জনতার ওপর হামলার জন্য বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর এমআই–১৭ হেলিকপ্টার গানশিপ ব্যবহারের চেষ্টা করেন। বিষয়টি তার কুখ্যাত নিরাপত্তা উপদেষ্টা তারিক আহমেদ সিদ্দিকীর মাধ্যমে বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়। এয়ার চিফ মার্শাল হাসান মাহমুদ খান (বর্তমান বিমান বাহিনী প্রধান) আন্দোলনের শুরুতে যুক্তরাজ্যে অবস্থানকালেও দূর থেকে কয়েক দফা হেলিকপ্টার আর্ম করার উদ্যোগ বাতিল করান। ২১ জুলাই দেশে ফেরার পর তারিক সিদ্দিকী সরাসরি তাঁকে গানশিপ প্রস্তুতের নির্দেশ দিলে তিনি তা অকুণ্ঠচিত্তে নাকচ করেন এবং স্পষ্ট জানিয়ে দেন— “দেশের নাগরিকদের বিরুদ্ধে বিমান বাহিনীর এয়ার পাওয়ার ব্যবহারের কোনো যৌক্তিকতা নেই; এটি রুলস অব এনগেজমেন্টের নীতিবিরোধী।” আগুন নেভাতে হেলিকপ্টার ব্যবহারের অনুমতি দিলেও, তাঁর কঠোর নির্দেশনায় কোনো আকাশযান থেকে একটি গুলিও ছোড়া হয়নি।
বাংলাদেশের ইতিহাসে চট্টগ্রাম বরাবরই বিদ্রোহ আর প্রতিরোধের ঘাঁটি। ২০২৪ এর জুলাইয়েও চট্টগ্রাম হয়ে ওঠে ছাত্র–জনতার আন্দোলনের এক শক্তিশালী কেন্দ্র। ৩ আগস্ট নিউ মার্কেট এলাকার ছাত্র-জনতার সভার পর, ২৪ পদাতিক ডিভিশনের তৎকালীন জিওসি মেজর জেনারেল (বর্তমানে লেফটেন্যান্ট জেনারেল) মো. মাইনুর রহমান আন্দোলনের সঙ্গে কার্যত একাত্মতা ঘোষণা করেন। ৪ আগস্ট পতিত সরকারের মদদপুষ্ট সশস্ত্র সন্ত্রাসীরা স্থানীয় সহযোগীদের নিয়ে আন্দোলনকারীদের ওপর চড়াও হওয়ার চেষ্টা করলে, এরিয়া কমান্ডার হিসেবে তাঁর দৃঢ় পদক্ষেপে সেনাবাহিনী পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে এবং হামলাকারীরা পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়। তখনো হাসিনা সরকারের পতন হবে কি না, তা একেবারেই নিশ্চিত নয়; সেই অনিশ্চয়তার মধ্যেও জনাব মাইনুর রহমান যে বীরোচিত অবস্থান নিয়েছিলেন, তা নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়।
৫ আগস্ট ২০২৪, হাসিনা দেশ ছেড়ে পালানোর পরই সেনাবাহিনীর ‘ব্ল্যাকশিপ’ খ্যাত দুই কর্মকর্তা— লেফটেন্যান্ট জেনারেল (পলাতক) মুজিবুর রহমান এবং মেজর জেনারেল (বরখাস্ত) জিয়াউল আহসান, সেনাসদরে অভ্যুত্থানের চেষ্টা চালান। তাঁদের লক্ষ্য ছিল সেনাপ্রধানকে ধরাশায়ী করে সেনাবাহিনীর কমান্ড হস্তগত করা। ঠিক সেই মুহূর্তে সেনাসদরে এমএস (মিলিটারি সেক্রেটারি) হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন মেজর জেনারেল (বর্তমানে লেফটেন্যান্ট জেনারেল) মীর মুশফিকুর রহমান। তাঁর তীক্ষ্ণ উপস্থিত বুদ্ধি, ঠান্ডা মাথার নেতৃত্ব এবং কয়েকজন ব্রিগেডিয়ার জেনারেলের নিঃস্বার্থ সহায়তায় ওই সামরিক অভ্যুত্থান ব্যর্থ হয়। সেনাবাহিনী রক্ষা পায় এক ভয়াবহ বিপর্যয়ের হাত থেকে, আর গণঅভ্যুত্থানের সদ্য–অর্জিত বিজয় সমুন্নত থাকে।
এই কয়েকজন কর্মকর্তা ছাড়াও এমন আরো বেশ কিছু কর্মকর্তা আছেন— যারা তাঁদের নিজে ক্যারিয়ার, এমনকি জীবনের ঝুঁকি নিয়েও রাষ্ট্রের বিবেক আর পেশাদারিত্বের চূড়ান্ত নজির স্থাপন করেছেন; তাঁদের প্রতি জানাই গভীর কৃতজ্ঞতা। ইতিহাসের দায়িত্ব এটাই যে, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের বহুমাত্রিক বাস্তবতা সংরক্ষণে তাঁদের ভূমিকা যেন কোনো বিকৃতির শিকার না হয়।
যথাযথ কর্তৃপক্ষের কাছে অনুরোধ, এই বীর সেনানীদের নাম ও অবদান রাষ্ট্রীয় দলিলে যেন যথাযথভাবে স্থান পায়, যাতে আগামী প্রজন্ম জানতে পারে গণতন্ত্রের জন্য লড়াই কেবল রাজপথেই সীমাবদ্ধ ছিল না; কিছু নীরব সৈনিক ইতিহাসের গতিপথ ঠিক করে দিয়েছিলেন নিজেদের নৈতিক সাহস দিয়ে।
তথ্যসূত্র:
# এটি আল-জাজিরার সাংবাদিক
জুলকারনাইন এর পোস্ট থেকে সংগৃহিত।