• বৃহস্পতিবার, ০১ অক্টোবর ২০২৬, ০৪:৩৩ পূর্বাহ্ন
Headline
বিএনপিকে হেয় করতেই সারের কৃত্রিম সংকট তৈরি করেছে জামায়াতঃ প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম! মাদক, ছিনতাই ও কিশোর গ্যাংয়ের অভিযোগ ফরহাদের বিরুদ্ধে; রাজনৈতিক পরিচয় যাচাইসহ তদন্তের দাবি! টেকনাফে গুজব প্রতিরোধে তরুণদের সচেতনতামূলক কর্মসূচি! দুই মামলায় ফুডপান্ডা বাংলাদেশ লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) সৈয়দা আমবারীন রেজাসহ ৫ জনের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি! কক্সবাজারে ৬৭ পিস ইয়াবাসহ এক নারী গ্রেপ্তার! আগামী পাঁচ বছরের মধ্যেই শতভাগ যুবকদেরকে কর্মসংস্থান নিশ্চিত করে স্বাবলম্বী হিসেবে গড়তে চাইঃ-  যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী মোঃ আমিনুল হক! ভারতের সহকর্মীর গুলিতে আধা সামরিক বাহিনীর ৪ সদস্য নিহত! নিউ ইয়র্ক টাইমসের নির্বাহীকে গুলি করে হত্যার দায়ে শ্বশুর-শাশুড়ি কে গ্রেফতার! ২ শীর্ষ পুলিশ কর্মকর্তাকে স্হায়ী ভাবে চাকরি থেকে বরখাস্ত! বাংলাদেশ বিমান এয়ার লাইন্সের বহরে যুক্ত হতে যাচ্ছে নতুন ১০ টি এয়ারবাস (উড়োজাহাজ)!

পশ্চিম পাকিস্তানের জাতীয় সম্পদ… বনাম বাংলাদেশের লোকসানের বোঝা।

Reporter Name
Update : বুধবার, ২৯ জুলাই, ২০২৬

খান শোয়েব আমান উল্লাহ:

 

ইস্ট ইন্ডিয়া ১৭৬৫ সালে তারা শুধু বাংলা, বিহার ও ওড়িশার ‘দেওয়ানি’ (ট্যাক্স ও রাজস্ব আদায়ের অধিকার) হাসিল করেছিল। বাণিজ্যের ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নিয়ে পরবর্তীতে পুরো উপমহাদেশকে বানিয়েছিল নিজেদের উপনিবেশ।

অর্থনৈতিক ভূ-রাজনীতিতে (Economic Geopolitics) এটাকে বলা হয় “Economic Imperialism” বা “Neo-Colonialism” (নব্য-উপনিবেশবাদ)!

আজ কি আমরা নিঃশব্দে সেই একই ফাঁদে পা দিতে যাচ্ছি? 💣

🏛️ ৪৪টি কারখানা: দেশ গড়ার স্বপ্ন নাকি বিক্রির মহোৎসব? অতি সম্প্রতি সরকার দেশের ৪৪টি রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানকে বেসরকারি খাতের কাছে তুলে দেওয়ার ঐতিহাসিক উদ্যোগ নিয়েছে।

যদি আপনি বাংলাদেশের ম্যাপের দিকে তাকান, তবে দেখবেন এগুলো শুধু ইট-পাথরের দালান নয়। এগুলো হলো গ্রাম বাংলায় মানুষের ‘গ্রামে ফিরে চল’ নীতির প্রাণকেন্দ্র!

মোটা দাগে এই ৪৪টি প্রতিষ্ঠানকে ১১টি খাতে ভাগ করা যায়:

🍬 ১২টি চিনিকল (BSFIC)

🧵 ১২টি টেক্সটাইল মিল (BTMC)

🧪 ৪টি কেমিক্যাল ও সার কারখানা (BCIC)

☀️ ৪টি গ্লাস ও সোলার কোম্পানি (BCIC)

⚡ ৪টি ইলেকট্রিক্যাল ও ইঞ্জিনিয়ারিং কারখানা (BCIC & BSEC)

📄 ২টি কাগজ ও পাল্প মিল (KPM সহ)

🌾 ২টি জুট মিল (BJMC)

☕ ১টি সিরামিক ও স্যানিটারি

👞 ১টি চামড়া শিল্প

🏗️ ১টি স্টিল মিল

🏙️ ৩টি অ-শিল্প সম্পদ

১৯৫০ থেকে ১৯৭০—পাকিস্তান আমল ও স্বাধীনতার পরপরই দেশের পুনর্গঠন, লাখ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান এবং আমদানিনির্ভরতা কমাতে কর্ণফুলী পেপার মিলস (KPM), কুষ্টিয়া বা সেতাবগঞ্জ চিনিকল, লতিফ বাওয়ানী জুট মিলস গড়ে তোলা হয়েছিল। জেনারেল জিয়ার আমলে গার্মেন্টস বিকাশের সময় ২৩৮ একর জায়গাজুড়ে টেক্সটাইল নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছিল BTMC।

আজ সেই স্বপ্নের কারখানাগুলোর স্টিল করপোরেশনের ৪টিসহ হাতে গোনা ২-৩টি আংশিক সচল। বাকি সব মৃতপ্রায়, আর সেগুলোর খরচ চলছে আপনার-আমার ট্যাক্সের টাকায়!

💸 উৎপাদন বন্ধ, কিন্তু বছর বছর হাজার কোটি টাকা গায়েব কীভাবে, কারখানাগুলোতে ধোঁয়া ওঠে না, অথচ জনগণের পকেট কাটা থামে না! বছরে নিদেনপক্ষে ২০ থেকে ২৫ হাজার কোটি টাকার বেশি লোকসানের ক্ষত তৈরি করেছে এগুলো।

বছরে সরকারের কত টাকা গলে যাচ্ছে?
🔥 চিনিকল (BSFIC): বছরে ৫০০ থেকে ১,০০০ কোটি টাকা নিট লোকসান! সাথে ঘাড়ে চেপে আছে ব্যাংকের ৮,০০০+ কোটি টাকার অনাদায়ী ঋণ ও চক্রবৃদ্ধি সুদ!
🔥 সার ও কেমিক্যাল (BCIC): আশুগঞ্জ ও শাহজালাল সার কারখানার মতো পুরনো প্ল্যান্টের পেছনে বছরে ৫০০ থেকে ১,০০০ কোটি টাকার ক্ষতি।
🔥 পাট ও টেক্সটাইল: বছরে আরও ৫০০ থেকে ৮০০ কোটি টাকার ঘাটতি।

উৎপাদন শূন্য, অথচ ৪টি খাতে নিয়মিত ‘অপারেশন কস্ট’ গুনে যাচ্ছে সরকার:
১. অবসরে যাওয়া ও স্থায়ী আমলা-স্টাফদের কোটি কোটি টাকার বেতন, পেনশন ও গ্র্যাচুইটি।
২. অলস পড়ে থাকা বয়লার ও জং ধরা কোটি টাকার মেশিনের রক্ষণাবেক্ষণ খরচ (Idle Capacity Cost)।
৩. গ্যাস-বিদ্যুতের ব্যবহার না করেও প্রতি মাসে কোটি টাকার ‘ডিমান্ড বা মিনিমাম চার্জ’।
৪. ব্যাংক ঋণের চড়া চক্রবৃদ্ধি সুদ!

যার মোট যোগফল: বিদ্যুৎ বা জ্বালানি খাত বাদে কেবল এই অলাভজনক কারখানাগুলো টিকিয়ে রাখতে সরকারকে বছরে ২,০০০ থেকে ৩,০০০+ কোটি টাকার ভর্তুকি দিতে হচ্ছে!

🧨 আসল বিপদ যেখানে: আন্তর্জাতিক ও জাতীয় নিরাপত্তার ঝুঁকি!
অলাভজনক প্রতিষ্ঠান বিরাষ্ট্রীয়করণ (Privatization) বিশ্বব্যাপী স্বাভাবিক। কিন্তু চুক্তিটা যদি কোনো দুর্বল SAP (Structural Adjustment Program) স্ট্রাকচারে হয় এবং কোনো একচেটিয়া কর্পোরেট বা বিদেশি শক্তির কব্জায় চলে যায়, তবে পরিণাম কী হবে?

⚠️ ১. একচেটিয়া বাজার নিয়ন্ত্রণ (Monopoly Risk): চিনি, সার, কাগজ বা কাপড়ের মতো মৌলিক পণ্যগুলোর দাম অল্প কয়েকটি কর্পোরেট হাউজ তাদের ইচ্ছা অনুযায়ী নির্ধারণ করবে।
⚠️ ২. পানির দরে হাজার একর জমি হাতছাড়া: সবচেয়ে বড় সম্পদ হলো হাজার হাজার একর অত্যন্ত মূল্যবান শিল্পভূমি। তারা কি ভেতরে উৎপাদন করবে, নাকি পানি-গ্যাস তুলে দেশ খালি করবে—সেই নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে যাবে!
⚠️ ৩. ডলার পাচার (Dollar Outflow): বিদেশি বিনিয়োগকারীরা লভ্যাংশ ডলারের রূপান্তর করে নিজ দেশে নিয়ে যাবে, যা আমাদের রির্জাভকে এক ধাক্কায় ধসিয়ে দিতে পারে।
⚠️ ৪. পলিসি ক্যাপচার (Policy Capture): অলিগার্কি (ধনকুবেরদের শাসন) তৈরি হবে। এই বড় বড় কর্পোরেটরা সরকারকে তাদের মনমতো ট্যাক্স মওকুফ ও শুল্ক নীতি বানাতে বাধ্য করবে।
⚠️ ৫. খাদ্য ও জাতীয় নিরাপত্তা ঝুঁকি: TSP বা AFCCL-এর মতো সার কারখানাগুলো প্রাইভেট হলে দেশের কৃষি ও জাতীয় খাদ্য নিরাপত্তা জিম্মি হয়ে পড়বে!

🛡️ জাতীয় নিরাপত্তা অনুযায়ী কারখানাগুলোর শ্রেণিবিভাগ (Tiering):
যেকোনো দামে লিজ বা বিক্রি নয়! জাতীয় গুরুত্ব অনুযায়ী ৪৪টি প্রতিষ্ঠানকে ৫টি স্তরে ভাগ করে সিদ্ধান্ত নেওয়া জরুরি:

📍 Tier–1 (জাতীয় নিরাপত্তা ও কৌশলগত শিল্প – রাষ্ট্রের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ রাখা বাধ্য): GEMCO, TSP Fertilizer, KPM, Green Steel, Solar Glass, Solar Panel, BISFL, প্রগতি ইন্ডিাস্ট্রিজ।
📍 Tier–2 (Joint Venture বা যৌথ উদ্যোগ): Atlas, Renwick, কুষ্টিয়া সুগার, টাঙ্গাইল কটন, বেঙ্গল টেক্সটাইল, লেদার কোম্পানি।
📍 Tier–3 (Public-Private Partnership – PPP): সেতাবগঞ্জ, ঠাকুরগাঁও, পঞ্চগড়, জয়পুরহাট, ফরিদপুর, মুবারকগঞ্জ, পাবনা ও কুড়িগ্রাম টেক্সটাইল।
📍 Tier–4 (দীর্ঘমেয়াদী Lease): নাটোর, শ্যামপুর, আমিন টেক্সটাইল, কোকিল টেক্সটাইল, চিত্তরঞ্জন কটন, করিম জুট।
📍 Tier–5 (Industrial Redevelopment – নতুন করে শিল্পায়ন):
খুলনা নিউজপ্রিন্ট, সিসিসি, বন্ধ টেক্সটাইল ল্যান্ড ও ওল্ড জোন অফিস।

🔍 ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ভূত তাড়াতে সরকারের যা করা উচিত:
BIDA, NBR, অর্থ, ভূমি, পরিবেশ ও আইন মন্ত্রণালয়, দুদক, বাংলাদেশ ব্যাংক এবং সিএজি (CAG)-সহ ২০টিরও বেশি সরকারি স্টেকহোল্ডারকে এই ৫টি জায়গায় লোহার মতো শক্ত হতে হবে:

১. সম্পদের সঠিক মূল্যায়ন: জমি কোনো অবস্থাতেই বিক্রি নয়! শুধুমাত্র BOT (Build-Operate-Transfer) মডেলে দায়িত্ব দেওয়া।
২. স্ট্রাটেজিক শেয়ার ও ভেটো পাওয়ার: সরকার বা রাষ্ট্রীয় সংস্থাকে কমপক্ষে ৫১% বা অন্তত ২৬% স্ট্রাটেজিক শেয়ার ধরে রাখতে হবে।
৩. মনোপলি বিরোধী আইন (Anti-Trust): এক সিন্ডিকেট বা একক গোষ্ঠী যেন একাধিক কারখানা কিনে বাজারের একচ্ছত্র মালিক না হতে পারে।
৪. স্বচ্ছ দরপত্র: দরপত্রে যোগসাজশ (Bid Rigging) ও ট্রান্সফার প্রাইসিং কঠোরভাবে বন্ধ করা।
৫. সার্বভৌম আইনি সুরক্ষা: কোনো চুক্তি আন্তর্জাতিক আদালতে নয়, দেশীয় আদালত ও আইনের এখতিয়ারে হতে হবে।

📢 জনআস্থা ফেরাতে ৯টি ‘ওপেন ডাটা’ দাবি!
সরকারের কাছে অর্থ, শক্তি ও প্রশাসন আছে। সাধারণ নাগরিক ও দেশের স্বার্থে সরকারের উচিত ৯টি পদক্ষেপ দৃশ্যমান করা:

✅ ১. Data Transparency: প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের আর্থিক অবস্থা ও সম্পদের প্রকৃত মূল্য প্রকাশ করা।

✅ ২. Public Consultation: কোনটা বিক্রি, কোনটা PPP আর কোনটা লিজ—তার স্পষ্ট লিখিত ব্যাখ্যা দেওয়া।

✅ ৩. Right to Information: সব দরপত্র এবং চুক্তি অনলাইনে উন্মুক্ত রাখা।

✅ ৪. Strategic Communication: বিনিয়োগকারীর মানদণ্ড ও প্রযুক্তি স্থানান্তরের শর্তাবলি প্রকাশ করা।

✅ ৫. Online Dashboard: লিজ বা হস্তান্তরিত প্রকল্পের অগ্রগতির জন্য লাইভ অনলাইন ড্যাশবোর্ড চালু করা।

✅ ৬. নিয়মিত প্রেস ব্রিফিং: গোপনীয়তা না রেখে গণমাধ্যমের মুখোমুখি হওয়া।

✅ ৭. স্বাধীন অডিট: নিরপেক্ষ তৃতীয় পক্ষকে দিয়ে অডিট রিপোর্ট প্রকাশ করা।

✅ ৮. Parliamentary Oversight: সংসদীয় স্থায়ী কমিটির কাছে বার্ষিক প্রতিবেদন জমা ও তদারকি নিশ্চিত করা।

✅ ৯. নাগরিক মতামত: বিশেষজ্ঞ ও জনগণের উন্মুক্ত মতামতের সুযোগ রাখা।

রাষ্ট্রের হাজার কোটি টাকা লোকসান ঠেকানো যেমন সময়ের দাবি, তেমনি জাতীয় সম্পদ যেন কোনো ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির নব্য রূপ বা অলিগার্কির পেটে না যায়—তা নিশ্চিত করা প্রতিটি নাগরিকের দায়িত্ব!

আপনি কী মনে করেন? এই ৪৪টি প্রতিষ্ঠান কি বেসরকারি হাতে ছেড়ে দেওয়া উচিত নাকি সরকারি তদারকিতেই নতুন মডেলে চালানো উচিৎ?

বি.দ্র. প্রতিবেদক,একজন সাংবাদিক, কলামিস্ট।

 


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category