মো: মাহবুবুর রহমান খান:
আজ ১১ এপ্রিল ২০২৬ এ পাকিস্তানের ইসলামাবাদে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে উচ্চ পর্যায়ের শান্তি আলোচনা শুরু হয়েছে। পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় দুই সপ্তাহের যুদ্ধ বিরতির পর এই বৈঠকটি আঞ্চলিক উত্তেজনা হ্রাস এবং মধ্যপ্রাচ্যে স্হিতিশীলতা ফেরাতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স এবং ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ বিরোধী দলের নেতৃত্ব দিচ্ছেন।
ইসলামাবাদ শান্তি আলোচনার মূল বিষয়বস্তু:
*মধ্যস্থতাকারী:পাকিস্তান, বিশেষ করে প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরীফ এবং সামরিক নেতৃত্ব (আসিম মুনির)এই আলোচনার আয়োজন ও মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করছেন।
*আলোচনার বিষয় :লেবাননে যুদ্ধবিরতি,হরমুজ প্রণালী খুলে দেওয়া, পারমাণবিক কর্মসূচি সীমিতকরণ এবং আঞ্চলিক প্রক্সি গোষ্ঠীর কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ আলোচনার মূল বিষয়।
* প্রস্তাবনা:যুক্তরাষ্ট্র ইরানের কাছ থেকে একটি ১০ দফা প্রস্তাব পেয়েছে,যা আলোচনা ভিত্তি হিসেবে কাজ করছে। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচিও একটি ১৫দফা প্রস্তাবের কথা উল্লেখ করেছেন।
*নিরাপত্তা ব্যবস্থা :বৈঠক চলাকালীন ইসলামাবাদের রেড জোন সিল করে দেওয়া হয়েছে এবং বিশেষ নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে।
*গুরুত্ব :এই আলোচনা ব্যর্থ হলে মধ্যপ্রাচ্যে সংঘর্ষ আরও তীব্র হওয়ার এবং বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে বড় ধরনের অস্থিরতার ঝুঁকি রয়েছে।
এই আলোচনাকে ‘Make or Break’বা সফল -ব্যর্থতার মুহূর্ত হিসেবে বর্ণনা করেছেন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী।
দীর্ঘ ছয় সপ্তাহের যুদ্ধ অবসানের লক্ষ্যে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের উচ্চ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের মধ্যে নির্ধারিত বৈঠকের আগে আজ শনিবার পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদে এক নজিরবিহীন চিত্র দেখা গেছে। সংঘাত নিরসনে দুই দেশের প্রতিনিধিদের এই গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার আগে পুরো শহরকে নিরাপত্তার চাদরে ঢেকে দিয়েছে পাকিস্তানের নিরাপত্তা বাহিনী।
মার্কিন সংবাদ মাধ্যম এপি এ খবর নিশ্চিত করেছে।
শান্তি আলোচনাকে কেন্দ্র করে ইসলামাবাদের প্রধান সড়কগুলো বন্ধ করে দেওয়ায় চিরচেনা ব্যস্ত রাজধানী এখন জনশূন্য। পাকিস্তান কর্তৃপক্ষ নিজ বাসিন্দাদের বাড়ির ভেতরে থাকার আহ্বান জানানোর পর পুরো শহর প্রায় কারফিউর মত রূপ নিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধি দলের প্রধান ভাইস- প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স এবং অন্যদিকে ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফের নেতৃতে ইরানি আলোচক দলটি শুক্রবার গভীর রাতেই ইসলামাবাদে এসে পৌঁছেছেন। এদিকে এই শান্তি প্রক্রিয়া নিয়ে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরীফ বলেছেন, চলমান সংঘাত এখন একটি কঠিন পর্যায়ে প্রবেশ করছে।সাময়িক যুদ্ধ
বিরতি থেকে একটি স্থায়ী চুক্তির দিকে যাওয়ার এই চেষ্টাকে তিনি ‘মেক ওর ব্রেক’ বা চূড়ান্ত সন্ধিক্ষণ হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
ইসলামাবাদ বৈঠকে দু’পক্ষে থাকছেন যারা :
পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদে আজ অনুষ্ঠিত বৈঠকে মার্কিন প্রতিনিধি দলে থাকবেন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স,ট্রাম্পের উপদেষ্টা স্টিভ উইট কফ,এবং তার জামাতা জ্যারেড কুশনার।এছাড়া অন্য গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ও সামরিক ব্যক্তিরা উপস্থিত থাকবেন। অন্যদিকে ইরানের প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দেবেন দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি।ইরানি প্রতিনিধি দলের আরেক প্রভাবশালী মুখ পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ। এদিকে বৈঠক ঘিরে ইসলামাবাদে দু’দিনের সাধারণ ছুটি ঘোষণা করেছে পাকিস্তান সরকার। মূলত: নিরাপত্তা বিবেচনায় এ সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে।বৈঠকে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরীফ, সেনা প্রধান জেনারেল আসিম মুনির,উপ- প্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাকদার এবং ন্যাশনাল সিকিউরিটি অ্যাডভাইজার অসিম মালিক উপস্থিত থাকবেন। আলোচনা কয়েকদিন ধরে চলবে বলে জানা গেছে।
যুদ্ধ বিরতি অনিশ্চয়তায় ফেলেছে ইজরাইলি হামলা :
ইজরাইল লেবাননে হামলা অব্যাহত রাখায় যুদ্ধ বিরতি কতক্ষণ কার্যকর থাকবে তা নিয়ে সংশয় দেখা দিয়েছে। যুদ্ধ বিরতি কার্যকর হওয়ার পর থেকে লেবাননে ইজরাইলি হামলায় অন্তত: ৩০০ জন নিহত হয়েছেন। এ সময় আহত হয়েছেন প্রায় দেড় হাজার। সব মিলিয়ে চলমান যুদ্ধে লেবাননের প্রায় দুই হাজার মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন। যুদ্ধ বিরতির মধ্যস্থতা কারী পাকিস্তান ও ইরান শুরু থেকেই বলে আসছে লেবাননেও যুদ্ধ বন্ধ থাকবে। ইসরাইল তা অস্বীকার করে হামলা অব্যাহত রেখেছে, যা যুদ্ধ বিরতি কে হুমকির মুখে ফেলেছে। তবে ইজরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনি আমিন নেতানিয়াহু লেবানন সরকারের সঙ্গে আলোচনার আগ্রহ প্রকাশ করেছেন বলে জানা গেছে।অন্যদিকে ইরান সাফ জানিয়ে দিযেছে শান্তি চুক্তির বৈঠক চলা বস্তায় লেবাননে কোন হামলা বরদাশত করা হবেনা।এই ইস্যুতে ইরান লেবাননের পাশে দাঁড়িয়েছে। ইরানের দাবি যুদ্ধ বিরতির আওতায় অবশ্যই লেবাননকে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। লেবাননের উপর ইসরাইলের বর্বর হামলার নিন্দা জানিয়েছে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ।
হরমুজ প্রণালী নিয়ে মুখোমুখি অবস্থানে দুই পক্ষ :
যুদ্ধ বিরতির জন্য ইরানের ১০ দফা শর্তে বলা হয়েছিল হরমুজ প্রণালী পার হতে প্রত্যেক জাহাজ কে টুল দিতে হবে এবং সে টুল ইরানের নিজস্ব মুদ্রায় পরিশোধ করতে হবে।তেহরান এ ব্যাপারে খুবই শক্ত অবস্থায় নিয়েছে। অন্যদিকে লেবাননে হামলার প্রতিবাদে প্রণালী চালু করছে না ইরান। ফলে যুদ্ধবিরতির তিনদিন পার হলেও কার্যত এখনও বন্ধই রয়েছে হরমুজ প্রণালী। এ দিকে হরমুজ প্রণালী দিয়ে চলাচলকারী জাহাজগুলো থেকে ইরান যেন কোন ধরনের টোল আদা না করে এ ব্যাপারে সতর্ক করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।তিনি নিজের মালিকানাধীন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ট্রুথ সোশালের দেওয়া এক পোস্টে এই সতর্কবার্তা দেন। বিবিসি জানিয়েছে,যুদ্ধ বিরতির পর অন্তত ৯ টি জাহাজ হরমুজ প্রণালীটি অতিক্রম করেছে।
আলোচনার ভিত্তি হবে ইরানের ১০ দফা :
ইরানের ১০ দফা পরিকল্পনাই পাকিস্তানের আসন্ন আলোচনার ভিত্তি হবে বলে জানিয়েছেন ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের উপ-মন্ত্রী মাজীদ তাখত-রাভানচি।তেহরানে অবস্থানরত বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রদূত, কূটনৈতিক মিশনের প্রধান, ও আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রতিনিধিদের উপস্থিতিতে তাখত রাভানচি বলেছেন,ইরান সব সময় কূটনৈতিক ও সংলাপকে স্বাগত জানায়। তবে তা এমন কোন সংলাপ নয় যা ভুয়া তথ্যের উপর ভিত্তি করে প্রতারণার উদ্দেশ্য হবে এবং ইরানের বিরুদ্ধে পুনরায় সামরিক আগ্রাসনের পথ তৈরি করবে। তিনি আরো বলেন, আমরা এমন কোন যুদ্ধ বিরতি চাই না, যা আগ্রাসী পক্ষকে শক্তি সঞ্চয় করে আবার হামলা চালানোর সুযোগ করে দেবে।
যুক্তরাষ্ট্রকে ‘যুদ্ধ বা যুদ্ধ বিরতি’তার যে কোন একটি পথ বেছে নিতে হবে :
ইরানের উপ-পর রাষ্ট্রমন্ত্রী সাঈদ খাতিবজাদেহ বলেছেন,লেবাননের উপর চলমান ইসরাইলি হামলা ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধবিরতি শর্তের গুরুতর লঙ্ঘন। তিনি বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রকে ‘যুদ্ধ অথবা যুদ্ধ বিরতি’ তার যেকোনো একটি পথ বেছে নিতে হবে।গত বৃহস্পতিবার বিবিসির সঙ্গে আলাপকালে তিনি এ কথা বলেন।
বি.দ্র.
প্রতিবেদক,সম্পাদক-প্রকাশক,দৈনিক জনতার দেশ।
ছবি:ইন্টারনেট।
তথ্যসূত্র:
# বিবিসি ( বাংলা)
# Tribune Bangla
# BD.net
# দৈনিক ইনকিলাব
# দৈনিক আমার দেশ
#Eastern news agency
# বিডি নিউজ টুয়েন্টি ফোর.কম
# দৈনিক প্রথম আলো