ব্রাহ্মণবাড়িয়া প্রতিনিধিঃ
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আরেকজন বিখ্যাত গুণী মানুষ, মুক্তিযুদ্ধের বীর যোদ্ধা, বীর বিক্রম খেতাবপ্রাপ্ত এবং বাংলাদেশের সাবেক সেনাপ্রধান লেফটেন্যান্ট জেনারেল আবু সালেহ মোহাম্মদ নাসিম। তাঁর নামের সঙ্গে জড়িয়ে আছে একদিকে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের বীরত্বগাথা, অন্যদিকে স্বাধীন বাংলাদেশের সেনাবাহিনীর শীর্ষ নেতৃত্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার চাঁদপুর গ্রামের সঙ্গে তাঁর পারিবারিক পরিচয় রয়েছে এবং মুক্তিযুদ্ধের সময় এই অঞ্চলের বিভিন্ন যুদ্ধেও তিনি অংশ নিয়েছিলেন। ১৯৭১ সালে তিনি পাকিস্তান সেনাবাহিনীর দ্বিতীয় ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টে ক্যাপ্টেন হিসেবে কর্মরত ছিলেন। মুক্তিযুদ্ধ শুরু হওয়ার পর তিনি আর পাকিস্তানি বাহিনীর সঙ্গে থাকেননি, বরং বাঙালির স্বাধীনতার সংগ্রামে যোগ দিয়ে প্রতিরোধযুদ্ধে অংশ নেন। এপ্রিল মাসে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আশুগঞ্জে তিনি সহযোদ্ধাদের নিয়ে প্রতিরক্ষা অবস্থানে ছিলেন। ১৪ এপ্রিল পাকিস্তানি বাহিনী স্থল, নৌ ও আকাশপথে আশুগঞ্জে আক্রমণ চালালে তাঁর দলের ওপরও প্রচণ্ড আক্রমণ হয়। একপর্যায়ে তাঁর দল প্রায় ঘেরাও হয়ে যায়, তাঁর অনেক সহযোদ্ধা আহত ও শহীদ হন এবং নাসিম নিজেও আহত হন। কিন্তু এখানেই তাঁর যুদ্ধ শেষ হয়নি। প্রতিরোধযুদ্ধের পর ভারতে পুনর্গঠিত মুক্তিবাহিনীতে তিনি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পান। প্রথমে তিনি ৩ নম্বর সেক্টরের পঞ্চবটী উপ-অঞ্চলের অধিনায়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। পরে নিয়মিত মুক্তিবাহিনীর এস ফোর্সের অধীনে ১১ ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের অধিনায়ক হন। আশুগঞ্জ, মনতলা, মাধবপুর, শাহবাজপুর ও চান্দুরাসহ বিভিন্ন যুদ্ধে তাঁর নেতৃত্ব ও অংশগ্রহণ ছিল। মুক্তিযুদ্ধের শেষ পর্যায়েও তিনি চান্দুরায় যুদ্ধে আহত হন। স্বাধীনতার পর তাঁর যুদ্ধকালীন সাহসিকতার স্বীকৃতি হিসেবে বাংলাদেশ সরকার তাঁকে ‘বীর বিক্রম’ খেতাবে ভূষিত করে। (চিরন্তন ১৯৭১ | প্রথম আলো) ভাবুন তো, একজন তরুণ সেনা কর্মকর্তা, যিনি নিজের জীবন ও ভবিষ্যতের নিরাপত্তার কথা না ভেবে একটি অনিশ্চিত যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন, সেই মানুষটিই পরবর্তীতে স্বাধীন বাংলাদেশের সেনাবাহিনীর সর্বোচ্চ নেতৃত্বের দায়িত্বে পৌঁছান। মুক্তিযুদ্ধের অভিজ্ঞতা, সামরিক দক্ষতা এবং দীর্ঘ কর্মজীবনের মধ্য দিয়ে তিনি সেনাবাহিনীতে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করতে করতে একসময় লেফটেন্যান্ট জেনারেল পদে উন্নীত হন। ১৯৯৪ সালের ৩১ আগস্ট তিনি বাংলাদেশের সেনাপ্রধানের দায়িত্ব গ্রহণ করেন এবং ১৯৯৬ সালের ১৯ মে পর্যন্ত এই পদে ছিলেন। তিনি ছিলেন বাংলাদেশের সপ্তম সেনাপ্রধান। (bn.chped.com) তাঁর জীবনের গল্পে তাই শুধু যুদ্ধের বীরত্বই নেই, আছে স্বাধীনতার পর একটি নতুন দেশের সেনাবাহিনীতে দীর্ঘ সামরিক ক্যারিয়ারের গল্পও। ভিডিওটি যদি আপনাদের ভালো লাগে, তাহলে লাইক, কমেন্ট ও শেয়ার করে অন্যদেরও জানিয়ে দিন, আর আমাদের পেজটি ফলো করে পাশে থাকবেন। কারণ ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সঙ্গে জড়িয়ে থাকা এমন মানুষের গল্প যত বেশি মানুষের কাছে পৌঁছাবে, আমাদের ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়গুলোও তত বেশি মানুষের জানা হবে। তবে আবু সালেহ মোহাম্মদ নাসিমের জীবনকে শুধু মুক্তিযুদ্ধের বীরত্ব বা সেনাপ্রধানের পদ দিয়ে দেখলে তাঁর পুরো জীবনের চিত্র পাওয়া যাবে না। ১৯৯৬ সালে সেনাপ্রধানের দায়িত্ব পালনকালে তাঁকে ঘিরে দেশের রাজনৈতিক ও সামরিক অঙ্গনে একটি বড় সংকট তৈরি হয়। মে মাসে রাষ্ট্রপতি আবদুর রহমান বিশ্বাস তাঁকে সেনাপ্রধানের পদ থেকে সরিয়ে দেন এবং পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়। সে সময়কার ঘটনাকে রাষ্ট্রপক্ষ বিদ্রোহ বা শৃঙ্খলাভঙ্গের প্রচেষ্টা হিসেবে বর্ণনা করেছিল। (চ্যানেল আই অনলাইন) অর্থাৎ তাঁর জীবনের শেষ দিকের সামরিক অধ্যায় ছিল অত্যন্ত আলোচিত এবং রাজনৈতিকভাবে স্পর্শকাতর। এই কারণে আবু সালেহ মোহাম্মদ নাসিমের জীবনকে বুঝতে হলে একদিকে যেমন তাঁর মুক্তিযুদ্ধের বীরত্ব ও ‘বীর বিক্রম’ খেতাবকে মনে রাখতে হবে, তেমনি অন্যদিকে সেনাপ্রধান হিসেবে তাঁর শেষ সময়ের ঘটনাগুলোকেও ইতিহাসের অংশ হিসেবে জানতে হবে। কিন্তু সবকিছুর আগে যে বিষয়টি তাঁকে বাংলাদেশের ইতিহাসে আলাদা করে রাখে, সেটি হলো ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে তাঁর সরাসরি অংশগ্রহণ। আশুগঞ্জের যুদ্ধ থেকে শুরু করে বিভিন্ন সম্মুখযুদ্ধে নেতৃত্ব দেওয়া, আহত হওয়া এবং শেষ পর্যন্ত স্বাধীন বাংলাদেশের সেনাবাহিনীর শীর্ষ পদে পৌঁছে যাওয়া—তাঁর জীবন যেন বাংলাদেশের ইতিহাসের একটি দীর্ঘ যাত্রার প্রতিচ্ছবি। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার মাটির সঙ্গে যার শেকড় জড়িয়ে আছে, সেই আবু সালেহ মোহাম্মদ নাসিম আজও আমাদের ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ নাম। একজন মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে তাঁর বীরত্ব, একজন সামরিক কর্মকর্তা হিসেবে তাঁর দীর্ঘ কর্মজীবন এবং সেনাপ্রধান হিসেবে তাঁর আলোচিত অধ্যায়—সব মিলিয়ে তাঁর জীবন আমাদের সামনে বাংলাদেশের ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ সময়কে তুলে ধরে। আর সেই কারণেই আবু সালেহ মোহাম্মদ নাসিম—শুধু একজন সাবেক সেনাপ্রধানের নাম নয়, তিনি মুক্তিযুদ্ধের বীরত্বের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা ব্রাহ্মণবাড়িয়ার একজন স্মরণীয় মানুষ।