ডেস্ক রিপোর্ট |জনতার দেশঃ
দীর্ঘদিনের পদোন্নতির জট কাটাতে এবং পুলিশ সদস্যদের মনোবল বাড়াতে চলতি বছরের নভেম্বরের মধ্যে পরিদর্শক থেকে উপমহাপরিদর্শক (ডিআইজি) পদমর্যাদার প্রায় ৪৯২ জন কর্মকর্তাকে পদোন্নতি দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিসের (বিসিএস) বিভিন্ন ব্যাচের কর্মকর্তাদের এই পদোন্নতি বর্তমান সরকারের আমলে প্রথম বড় পদোন্নতি কার্যক্রম।
পুলিশ সদর দপ্তরের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, নভেম্বরের মাঝামাঝি পদোন্নতির প্রক্রিয়া চূড়ান্ত হতে পারে। এরপর জারি হতে পারে প্রজ্ঞাপন।
আগের সরকারের আমলে বছরের পর বছর পদোন্নতি আটকে ছিল। সম্প্রতি কয়েকজন কর্মকর্তাকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানোর পর ঊর্ধ্বতন পদগুলোতেও শূন্যতা তৈরি হয়েছে। এসব কারণে পদোন্নতির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
পদোন্নতি প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত পুলিশ সদর দপ্তরের দুই কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, প্রতিটি শূন্য পদের বিপরীতে অন্তত তিনজন কর্মকর্তার নাম প্রস্তাব করা হয়েছে।
তারা জানান, বিভাগীয় পদোন্নতি কমিটি (ডিপিসি) প্রায় ১৬০ জন পরিদর্শক ও ট্রাফিক পরিদর্শককে সহকারী পুলিশ সুপার (এএসপি) পদে উন্নীত করার অনুমোদন দিয়েছে। তবে এ বিষয়ে এখনো আনুষ্ঠানিক প্রজ্ঞাপন জারি হয়নি।
৩৬তম, ৩৭তম ও ৩৮তম বিসিএস ব্যাচের প্রায় ১৫৫ জন এএসপিকে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার পদে পদোন্নতি দেওয়ার কথা রয়েছে।
এ ছাড়া ২৮তম, ২৯তম ও ৩০তম বিসিএস ব্যাচের আরও ৯৫ জন কর্মকর্তা পুলিশ সুপার (এসপি) পদে পদোন্নতির অপেক্ষায় রয়েছেন। ২৮তম ও ২৯তম বিসিএস ব্যাচের যেসব কর্মকর্তা আগে অতিরিক্ত পদ সৃষ্টি করে এসপি হয়েছিলেন, তাদের পদোন্নতি এবার নিয়মিত করা হবে।
২২তম ও ২৪তম বিসিএস ব্যাচের ৬০ জনের বেশি এসপি আগে অতিরিক্ত পদ সৃষ্টি করে অতিরিক্ত উপমহাপরিদর্শক (অতিরিক্ত ডিআইজি) হয়েছিলেন। তাদের পদোন্নতিও নিয়মিত করার কথা রয়েছে।
পুলিশ সদর দপ্তরের কর্মকর্তারা জানান, ২১তম, ২২তম ও ২৪তম বিসিএস ব্যাচের প্রায় ২০ জন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাকে ডিআইজি পদে পদোন্নতি দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। এ ছাড়া ১৭তম ও ১৮তম বিসিএস ব্যাচের দুজন কর্মকর্তা অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক (অতিরিক্ত আইজিপি) হতে পারেন।
বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকারের আমলে এর আগে দুই দফায় পদোন্নতি দেওয়া হয়েছিল। ওই দুই দফায় ১০ জন ডিআইজিকে অতিরিক্ত আইজিপি পদে পদোন্নতি দেওয়া হয়।
তবে এবার ২০তম বিসিএস ব্যাচের কর্মকর্তাদের ডিআইজি পদে পদোন্নতির জন্য বিবেচনা করা হবে না। এই ব্যাচের প্রায় ৩৩ জন কর্মকর্তা এখনো পদোন্নতি পাননি।
প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত এক কর্মকর্তা বলেন, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে এই ব্যাচের কর্মকর্তারা পাঁচ দফায় পদোন্নতি পেয়েছিলেন। অন্তর্বর্তী সরকারের আমলেও তাদের আরেক দফায় পদোন্নতি দেওয়া হয়েছিল।
সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের সচিবের নেতৃত্বে এএসপি থেকে এসপি পদে পদোন্নতির বিষয়টি পর্যালোচনা করে ডিপিসি কমিটি।
অন্যদিকে, অতিরিক্ত ডিআইজি থেকে অতিরিক্ত আইজিপি পদে পদোন্নতির দায়িত্ব পালন করে মন্ত্রিপরিষদ সচিবের নেতৃত্বাধীন সুপিরিয়র সিলেকশন বোর্ড (এসএসবি)।
পুলিশ সদর দপ্তরের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, পদোন্নতির ক্ষেত্রে কর্মকর্তাদের জ্যেষ্ঠতা, পেশাগত দক্ষতা, মেধা, চাকরির রেকর্ড, বার্ষিক গোপনীয় প্রতিবেদন এবং গোয়েন্দা যাচাই প্রতিবেদন মূল্যায়ন করা হয়।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক কর্মকর্তা বলেন, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে বিএনপিপন্থী হিসেবে বিবেচিত হওয়ার কারণে যেসব কর্মকর্তার ভালো চাকরির রেকর্ড ও দক্ষতা থাকা সত্ত্বেও পদোন্নতি বা উপযুক্ত পদায়ন হয়নি, তারা এবার অগ্রাধিকার পেতে পারেন।
তিনি বলেন, একই ব্যাচের অনেক কর্মকর্তা এবং তাদের চেয়ে জুনিয়র কর্মকর্তারাও আগেই পদোন্নতি পেয়েছিলেন।
তবে দুই অতিরিক্ত ডিআইজি এ বিষয়ে সতর্ক করে বলেছেন, পদোন্নতি না পাওয়া সব কর্মকর্তা রাজনৈতিক বৈষম্যের শিকার হয়েছেন, এমনটা ধরে নেওয়া ঠিক হবে না।
তাদের ভাষ্য, কারও কারও মেধার ঘাটতি ছিল, চাকরির রেকর্ড ভালো ছিল না কিংবা অসদাচরণের অভিযোগ ছিল।
তাদের একজন বলেন, ‘এসএসবির উচিত সব বিষয় বিবেচনায় নিয়ে মেধা, চাকরির রেকর্ড, নিষ্ঠা ও সততার ভিত্তিতে কর্মকর্তাদের পদোন্নতি দেওয়া।’
আরেক অতিরিক্ত ডিআইজি বলেন, দুই বছর আগেই তার পদোন্নতি পাওয়ার কথা ছিল। তিনি বলেন, ‘একই বিসিএস পরীক্ষার মাধ্যমে সরকারি চাকরিতে যোগ দেওয়া অন্যান্য ক্যাডারের অনেক কর্মকর্তা এরই মধ্যে পদোন্নতি পেয়েছেন। এ ধরনের বৈষম্য কর্মকর্তাদের মনোবল মারাত্মকভাবে দুর্বল করেছে।’
প্রশাসনিক রদবদলের সময় কয়েকজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানোর পর ঊর্ধ্বতন পদগুলো শূন্য হয়েছে। ২০১৮ সালের সরকারি চাকরি আইনের ৪৫ ধারায় জনস্বার্থে ২৫ বছর চাকরি পূর্ণ করা কোনো সরকারি কর্মচারীকে নির্দিষ্ট কারণ উল্লেখ না করেও অবসরে পাঠানোর সুযোগ রয়েছে।
২০১৮ সালের জাতীয় নির্বাচন, রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা কিংবা জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থানের সময় ভূমিকা নিয়ে ওঠা অভিযোগের ভিত্তিতেও কয়েকজন কর্মকর্তাকে অবসরে পাঠানো হয়েছে। তবে অভিযোগগুলো একেক ক্ষেত্রে একেক রকম এবং সব অভিযোগের সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা হয়নি।
বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো কয়েকজন কর্মকর্তা এই প্রতিবেদককে জানিয়েছেন, তাদের কোনো রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা ছিল না। তারা পেশাদারত্বের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেছেন এবং ২০১৮ সালের নির্বাচন কিংবা জুলাইয়ের ঘটনাবলিতে তাদের কোনো ভূমিকা ছিল না। তারপরও তাদের অবসরে পাঠানো হয়েছে।
বিভিন্ন সময়ে ক্ষমতাসীন সরকারগুলো সরকারি চাকরি আইনের ৪৫ ধারা ব্যবহার করে বিরোধী রাজনৈতিক মতাদর্শের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বা বিতর্কিত কর্মকর্তাদের সরিয়ে দিয়েছে।
তবে কয়েকজন পুলিশ কর্মকর্তা বলেছেন, বাহিনীর পেশাদারত্ব ও সততা ফিরিয়ে আনতে বর্তমান পদোন্নতি প্রক্রিয়ায় রাজনৈতিক পরিচয়ের পরিবর্তে মেধাকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।
তথ্য ঋণঃ
# দ্য ডেইলি স্টার বাংলা।
# বিভিন্ন প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক্স মিডিয়ায় প্রচারিত ও প্রকাশিত সংবাদ।