বিনোদন ডেস্ক থেকে
গুলশানুল হক মামুন
ভারত সরকারের পদ্মভূষণ সম্মাননা পাওয়া সংগীত সাধিকা যার সঙ্গে বাংলাদেশের ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার শেকড়ের বন্ধন, সেই মহীয়সী নারীর সাথে ব্রাহ্মণবাড়িয়াবাসীর পরিচয় সামান্যই। আমরা ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁকে চিনি, ওস্তাদ আলী আকবর খাঁ (পদ্মভূষন) ও পন্ডিত রবিশঙ্করকে (ভারতরত্ন) জানি। কিন্তু রওশন আরা খাঁ (অন্নপূর্ণা) সব সময়ই ছিলেন আড়ালে।
সঙ্গীত সাধনা ও জীবনচর্চায় নিবৃত্তচারী রওশন আরা খাঁ আত্মকেন্দ্রিক অভিমানে সমসাময়িকদের তুলনায় অতি দ্রুত চলে যান পাদপ্রদীপের আলোর অন্তরালে। বাবার রাখা নাম রওশন আরা হলেও ভারতীয় সঙ্গীতাঙ্গনে মা অন্নপূর্ণা নামে তিনি ব্যাপক পরিচিত। তিনি ছিলেন সুর সম্রাট ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁর সর্ব কনিষ্ঠ কন্যা, ওস্তাদ আলী আকবর খাঁর কনিষ্ঠ বোন এবং পন্ডিত রবিশঙ্করের সহধর্মিণী। ভারতবর্ষ তথা সারা বিশ্বের সংগীত প্রেমীদের জন্য এটি দুর্ভাগ্য যে ভারতীয় শাস্ত্রীয় সংগীতের এই মহারত্ন টির সম্পূর্ণ প্রতিভা ভারত নিতে পারেনি। তাঁর মৃত্যুর সাথে সাথেই এই অমূল্য প্রতিভারও সমাধি রচিত হয়েছে।
পূর্নিমাতে জন্মনিয়েছিলেন বলে মাইহার রাজ্যের (রামপুর,ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ সাহেবের কর্মস্থল) মহারাজা ব্রিজনাথ হিন্দু ধর্মের দেবী অন্নপূর্ণেশ্বরী বা অন্নপূর্ণা’র নামের অনুকরণে তাঁর নাম রেখেছিলেন অন্নপূর্ণা দেবী। পরবর্তীতে ভারতীয় সংগীত জগতের সবাই তাঁকে “মা অন্নপূর্ণা দেবী” নামে ডাকতেন। অথচ বড় মেয়ের শ্বশুর বাড়িতে সংগীত সংশ্লিষ্ট অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার কারণে রওশন আরা খা কে আলাউদ্দিন খাঁ সংগীত শিখাতে অনিচ্ছুক ছিলেন। ছেলে আলী আকবরের রেওয়াজের সময় ঘটনাচক্রে উনার প্রতিভার প্রকাশ পায়। আলাউদ্দিন খাঁ একদিন ছেলেকে একটা গান (রাগ) শিখতে দিয়ে বলেছিলেন আমি বাজার থেকে আসি, (খাঁসাহেব নিজ হাতে বাজার করতে পছন্দ করতেন) এসে তোমার পড়া নিব। অন্নপূর্ণার বয়স তখন ৮/১০ হবে। ভাই রেওয়াজ করার সময় বার বার স্বরলিপি ভুল করছিলেন, তখন অন্নপূর্ণা এসে বড় ভাইকে স্বরলিপির ভুল সংশোধন করে দিয়ে বললেন তুমিতো ভুল করছ, বাবাত তোমাকে এই ভাবে করতে বলে গেছেন অথচ অন্নপূর্ণা তখনও সংগীতের সাথে জড়িতই হননি।
এদিকে খাঁ সাহেব আড়ালে দাঁড়িয়ে ভাই ও বোনের কথা শুনছিলেন, তিনি আবিষ্কার করলেন মেয়ে তার অত্যন্ত প্রতিভাময়ী এবং নিখুঁত। স্বরলিপি মনে রাখার অসাধ্য সক্ষমতা তাঁর, অথচ যে এখনো শিখা শুরুই করে নাই। মেয়ের প্রতিভা দেখে আশ্চর্যান্বিত হয়ে মেয়েকে জরিয়ে ধরে বললেন মা আমার ভুল হয়ে গেছে, আমি তোমার সাথে অবিচার করেছি। আজ থেকে আমি তোমাকেও শিখাব। আর সেই ঘটনার পরে সেই দিন থেকেই শুরু হলো অন্নপূর্ণার সংগীতের পথচলা। তারপর রবিশঙ্কর আসলেন আলাউদ্দিনের ছাত্র হয়ে। রবি শংকরের মা হেমাঙ্গিনী দেবী আলাউদ্দিনকে বলেছিলেন, “দেখবেন আমার এই ছেলেটিকে, কিছুদিন আগে তার পিতা পন্ডিত শ্যামশঙ্কর চৌধুরী গত হয়েছেন। আজ থেকে আপনিই তার বাবা, আপনার হাতে তার অভিভাবকত্ব ছেড়ে দিলাম, ভুল-ত্রুটি হলে ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন।” আবেগি মানুষ ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ সাহেব ক্রন্দনরত অবস্থায় রবির দায়িত্ব নিলেন এবং বললেন, “আজ থেকে আপনার ছেলে আমার ছেলে হল। আমার একটি ছেলে ছিল এখন দুটো হল, সে আমার বড় ছেলে হল।” তার পরেরটা সব ইতিহাস। খাঁ সাহেব শত শত ছাত্রদের মাঝে এই তিন মহারথীর তুলনায় বলেছিলেন প্রতিভার বিচারে আলী আকবর ও রবিশঙ্করকে এক পাল্লায় ও অন্নপূর্ণাকে অন্য পাল্লায় দিলে অন্নপূর্ণার পাল্লাই ভারী হবে।
শিক্ষা শেষে পারিবারিক সম্মতিতে খাঁ সাহেব রবিশঙ্কর ও অন্নপূর্ণার বিয়ে দিয়ে দেন, বিয়ের সময় রবিশঙ্করের বয়স ছিল ২১ এবং অন্নপূর্ণার মাত্র ১৫ পেরিয়েছে। রবিশঙ্কর ছিলেন খুবই উচ্চাভিলাষি। বিয়ের কিছুদিন পরে তাঁরা বোম্বে চলে আসেন, শুরু হয় তাদের জয়জয়কার। নিজ গুরুর কাছথেকে শেখা আলাউদ্দিন খাঁর স্পেশাল আইটেম ছিল সুরবাহার যা তিনি শুধুমাত্র অন্নপূর্ণাকেই শিখিয়েছিলেন। আর এই সুরবাহারের কল্যাণে অন্নপূর্ণা রাতারাতি রবিশঙ্করের চেয়ে বেশী জনপ্রিয় ও উপার্জনশীল হতে থাকেন, যা রবিশঙ্করের মর্ম পিড়ার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। একদিন অন্নপূর্ণা অবাক বিস্ময়ে লক্ষ্য করলেন রবিশঙ্কর গোপনে নৃত্যশিল্পী কমলা শাস্ত্রীর সঙ্গে প্রেম এবং বিবাহ বহির্ভূত সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েছেন। কমলার সঙ্গে রবিশঙ্করের সম্পর্কের জেরে তাদের বৈবাহিক সম্পর্ক ভেঙে যায়।
রবিশঙ্করের ছাত্র এবং ‘দ্য নবভারত টাইমস’ এর সংগীত সমালোচক মদন লাল ব্যাস বলেন, কনসার্ট শেষে লোকজন অন্নপূর্ণা কে ছেঁকে ধরতো যা পন্ডিত জির পক্ষে সহ্য করা ছিল দুরূহ। তিনি বলেন অন্নপূর্ণা ছিলেন অসামান্যা এক প্রতিভা। এমনকি তাঁর আপসহীন, শিক্ষার সময় ক্ষমাহীন গুরুবাবা আলাউদ্দিন খাঁ তাঁকে মূর্তিমতী সরস্বতী বলে সম্বোধন করতেন। এর চেয়ে বড় প্রশংসা আর কি হতে পারে ?
অন্নপূর্ণা ও রবিশঙ্করের ব্যক্তিগত জীবনের কাহিনী নিয়ে বোম্বেতে ১৯৭৩ সালে একটি খুবই জনপ্রিয় ছবি নির্মিত হয়, নাম অভিমান। অমিতাভ বচ্চন ও জয়া বচ্চন প্রধান চরিত্রে অভিনয় করেন। ছবিতে যদিও অভিনেতা-অভিনেত্রীর সম্পর্ক স্বাভাবিক হয়ে গিয়েছিল কিন্তু প্রকৃত জীবনে সংসার ধরে রাখতে জনসমক্ষে পরিবেশনা ছেড়ে দেওয়ার মত বিশাল আত্মত্যাগের পরও অন্নপূর্ণা নিজের সংসার টিকাতে পারেননি। তারপরেই তিনি নিজেকে গুটিয়ে নেন,আর কোন দিন প্রকাশ্যে আসেননি। ভারতবর্ষ হারায় এক অমূল্য রত্মকে। যদিও রবিশঙ্কর পরবর্তীতে নিজের দোষ স্বীকার করে নিয়েছিলেন।
রবিশঙ্কর ও অন্নপূর্ণার বৈবাহিক জীবনের একমাত্র সাক্ষী তাঁদের একমাত্র ছেলে শুভেন্দ্র শঙ্কর যিনি পরবর্তীতে আমেরিকাতে মারা যান। রবিশঙ্কর ষাটের দশকের প্রথম দিকে প্রেমিকা কমলা শাস্ত্রীকে নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের উদ্দেশ্যে ভারতবর্ষ ত্যাগ করেন। কমলা শাস্ত্রীর সঙ্গে লিভ টুগেদার এবং তাকে বিয়ে করতে না পারার প্রসঙ্গে রবিশঙ্কর তাঁর আত্মজীবনী “রাগ অনুরাগে” বলেছেন, “কি জানি, নিজের বিয়ে এবং অন্য অনেকের বিয়ে দেখে বিয়ের উপর থেকে আমার সমস্ত শ্রদ্ধা নষ্ট হয়ে গিয়েছিল। তবে ভালো স্ত্রী বা সঙ্গীরা একজন পুরুষকে সফল হতে অনুপ্রেরণা দেয়।” দীর্ঘদিন পর ১৯৮২ সালে অন্নপূর্ণা ও রবিশঙ্করের বিবাহ বিচ্ছেদ হয়।
উনার রেওয়াজের ঘরে কারোই যাওয়ার অনুমতি ছিল না। রবিশঙ্করের কাছে তাঁর প্রতিভার কথা জেনে ১৯৭০ সালে আমেরিকার বিশ্ব বিখ্যাত রক সংগীতের দল The Beatles এবং পৃথিবী বিখ্যাত বেহালা বাদক Yehudi Menuhin তাঁর রেওয়াজ দেখার জন্য ভারতে আসেন কিন্তু অনুমতি পাননি, পরবর্তীতে ভারতের ততকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর বিশেষ অনুরোধে তাঁদেরকে অনানুষ্ঠানিক ভাবে পাশের রুম থেকে রেওয়াজ দেখার অনুমতি দিয়েছিলেন। যদিও তিনি ইতিপূর্বে তাঁর পারফমেন্স সরাসরি দেখার ব্যাপারে ইন্দিরা গান্ধীর নিজের অনুরোধকেই প্রত্যাখ্যান করেছিলেন।
উনার অনেক বিখ্যাত শিষ্য আছেন যারা এখন সারা বিশ্ব মাতিয়ে বেড়াচ্ছেন। তাঁর শিষ্যত্ব নেওয়াটাও ছিল দুরূহ। পাঁচ থেকে দশ বৎসরও অপেক্ষা করতে হয়েছে। তাঁর বিখ্যাত ছাত্রদের অন্যতম কয়েকজন হলেন ১। ওস্তাদ আশীষ খাঁ সরোদ ২। পন্ডিত অমিত ভট্টাচার্য সরোদ ৩। ওস্তাদ বাহাদুর খাঁ সরোদ ৪। পন্ডিত হরিপ্রসাদ চৌরাসিয়া বাসুরী ৫। পন্ডিত নিত্যানন্দ হলদিপুর বাসুরী ৬। পন্ডিত বসন্ত বাবরা সরোদ ৭।পন্ডিত জতীন ভট্টাচার্য সরোদ ৮। পিটার কল্ট সেতার।
ভারতীয়দের বিশ্বাস অনুযায়ী একানব্বই বৎসর বয়সে চলে গেলেন বটে,তবে এ যাওয়া দেবী অন্নপূর্ণার মতই বারবার ফিরে আসার জন্য যাওয়া। তাঁর বিস্ময়কর প্রতিভার যে অমরত্ব ভারতীয় শাস্ত্রীয় সংগীত কে ছেয়ে আছে, সেই অমরত্তেই বসবাস করবেন এই সংগীতের দেবী চিরকাল।”পদ্মভূষণ” ছাড়াও তিনি “সংগীত নাটক একাদেমি” পুরষ্কার এবং বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে “দেশিকোত্তম” পুরস্কারে ভূষিত হোন। শেষ জীবনে মুম্বাইয়ের আকাশগঙ্গা অ্যাপার্টমেন্টে তাঁর ছাত্ররাই সন্তান রূপে আবির্ভূত হয়ে মাতৃসমা মমত্বে তাঁকে দেখাশোনা করতেন। তাদের অন্যতম ছিলেন পন্ডিত নিত্যানন্দ হলদিপুর।
রওশন আরা খাঁ (অন্নপূর্ণা দেবী)
জন্ম ২৩ এপ্রিল ১৯২৭ খ্রি.
মৃত্যু ১৩ অক্টোবর ২০১৮ খ্রি.
#সংগৃহিত তথ্য
ছবি: উইকিপিডিয়া থেকে।