মো: সাইফুল আলম:
প্রিন্স আলী সলোমন আগা খান ছিলেন ৪৮তম ইসমাইলি ইমাম তৃতীয় আগা খানের (স্যার সুলতান মুহাম্মদ শাহ) পুত্র এবং বর্তমান ৪৯তম ইমাম চতুর্থ আগা খানের (প্রিন্স করিম আগা খান) পিতা। তাঁর পিতা তৃতীয় আগা খান মৃত্যুর আগে উইলে নিজের ছেলে প্রিন্স আলী খানকে পাশ কাটিয়ে সরাসরি নাতি প্রিন্স করিমকে পরবর্তী ‘আগা খান’ বা ইমাম হিসেবে মনোনীত করে যান।
ইমাম না হলেও প্রিন্স আলী খানের নিজস্ব একটি বর্ণাঢ্য পরিচয় ও পদমর্যাদা ছিল। তিনি মূলত একজন আন্তর্জাতিক কূটনীতিক, সমাজকর্মী এবং অত্যন্ত বিলাসবহুল জীবনের অধিকারী ছিলেন। ১৯৫৮ থেকে ১৯৬০ সাল পর্যন্ত তিনি জাতিসংঘে পাকিস্তানের স্থায়ী প্রতিনিধি বা রাষ্ট্রদূত হিসেবে অত্যন্ত সফলতার সাথে দায়িত্ব পালন করেন এবং জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ভাইস-প্রেসিডেন্টও নির্বাচিত হন। ব্যক্তিগত জীবনে তিনি সেসময়কার আন্তর্জাতিক সেলিব্রেটি ছিলেন; বিখ্যাত হলিউড অভিনেত্রী রিটা হেওয়ার্থকে বিয়ের কারণে তিনি বিশ্বজুড়ে সংবাদমাধ্যমের শিরোনাম হয়েছিলেন। এছাড়া তিনি ছিলেন একজন নামকরা ঘোড়দৌড় অনুরাগী এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ফরাসি ও মার্কিন বাহিনীর হয়ে সামরিক দায়িত্বও পালন করেছিলেন। ১৯৬০ সালে ফ্রান্সে এক মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনায় তাঁর মৃত্যু হয়।
‘আগা খান’ বা নিজারি ইসমাইলি শিয়া সম্প্রদায়ের ইমাম পদটির ক্ষমতা ও প্রভাব বিশ্বে অপরিসীম। এই পদে যারা আসেন, তাদের ক্ষমতা কোনো নির্দিষ্ট দেশের সীমানায় আবদ্ধ নয়। আগা খানের কোনো নিজস্ব দেশ বা ভূখণ্ড না থাকলেও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে, বিশেষ করে পশ্চিমা বিশ্বে এবং জাতিসংঘে তাকে একজন স্বাধীন রাষ্ট্রপ্রধানের সমান সম্মান ও প্রটোকল দেওয়া হয়। তাদের সবচেয়ে বড় শক্তির জায়গা হলো ‘আগা খান ডেভেলপমেন্ট নেটওয়ার্ক’ (AKDN), যা বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ বেসরকারি আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থা। এশিয়া ও আফ্রিকার প্রায় ৩০টিরও বেশি দেশে তাদের বিশ্ববিদ্যালয়, হাসপাতাল, ব্যাংক এবং দাতব্য সংস্থা রয়েছে, যার মাধ্যমে বিশ্বে তাদের বিশাল অর্থনৈতিক ও সামাজিক প্রভাব বজায় থাকে। বিভিন্ন দেশের সরকার প্রধানরাও আন্তর্জাতিক কূটনীতি ও শান্তি স্থাপনে আগা খানকে অত্যন্ত সমীহ করে চলেন।
আগা খানের অনুসারীদের ‘নিজারি ইসমাইলি শিয়া মুসলিম’ বলা হয়, যাদের সংখ্যা বিশ্বজুড়ে প্রায় ১.২ থেকে ১.৫ কোটি। তারা মূলত পাকিস্তান, ভারত, আফগানিস্তান, সিরিয়া, তাজিকিস্তান, পূর্ব আফ্রিকার দেশগুলো এবং পশ্চিমা বিশ্বে বসবাস করেন। এই অনুসারীরা বিশ্বাস করেন যে, আগা খান হলেন সরাসরি হযরত আলী (রা.) এবং ফাতেমা (রা.)-এর মাধ্যমে নবী মুহাম্মাদ (সা.)-এর বংশধর, এবং তারা তাদের বর্তমান ইমামকে পরম ভক্তি ও বিশ্বাসের সাথে অনুসরণ করেন। অত্যন্ত সুশৃঙ্খল, আধুনিক, শান্তিপ্রিয় এবং শিক্ষিত এই গোষ্ঠীটি তাদের আয়ের একটি নির্দিষ্ট অংশ সরাসরি ইমামের ফান্ডে জমা দেন। অনুসারীদের দেওয়া এই অর্থ দিয়েই মূলত বিশ্বজুড়ে আগা খান নেটওয়ার্কের বিশাল উন্নয়নমূলক ও দাতব্য কার্যক্রমগুলো পরিচালিত হয়।
আগা খানদের অরিজিন এক সময় ভারত-পাকিস্তান হলেও বর্তমান তাদের কেন্দ্র হচ্ছে ইউরোপ। ক্রমাগত ইউরোপিয় মহিলা বিয়ের ফলে তাদের চেহারাও ইউরোপিয়ানদের মত বর্তমানে দেখতে।
তথ্যসূত্র ও ছবি:
# উইকিপিডিয়া।