আন্তর্জাতিক ডেস্ক|জনতার দেশঃ
ইজরাইলি সেনাবাহিনীর একজন মেজর নিরীহ ফিলিস্তিনিদের উপর চালানো বর্বরতাকে সহ্য করতে না পেরে চাকুরী ছেড়ে দিয়ে নিজ দেশ পোল্যান্ডে পাড়ি জমিয়েছেন এবং নিজের ভাষায় ইসরায়েলি বাহিনীতে চাকুরী করার কষ্ট ও ফিলিস্তিনের উপর চালানো ইতিহাসের নিকৃষ্টতর বর্বরতার বর্ণনা দিয়েছেন।
নিম্নে তা তুলে ধরা হলোঃ-
“আমি আর নীরব থাকতে পারছি না” লিখেছেন ইসরাইলি
সেনা অফিসার মেজর আভদার শাইলোভস্কি।
মেজর আভদার শাইলোভস্কি ইসরায়েলি পক্ষ বা সামরিক বাহিনী ত্যাগ করে তাঁর পূর্বপুরুষদের দেশ পোল্যান্ডে চলে যাওয়ার কথা বর্ণনা করেছেন ঠিক এভাবে!
আমি আভদার শাইলোভস্কি। ইসরায়েলি সেনা বাহিনীর একজন মেজর, আমি ইসরাইলি সেনা বাহিনী ত্যাগ করেছি।
আমি সম্পূর্ণ সুস্থ মস্তিষ্কে ঘোষণা করছি যে, পাঁচ বছরের চাকরিজীবনে নিজের চোখে দেখা সমস্ত অপরাধের নীরব সাক্ষী হয়ে থাকা- এবং এভাবে নিজের মানবিকতার সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করা-আমার পক্ষে আর সম্ভব হচ্ছেনা বলেই আমি ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী ছেড়ে দিয়েছি।
আমি যা দেখেছি, তা আপনাদের সঙ্গে ভাগ করে না নিলে সেই ঘটনাগুলো আমাকে ভেতর থেকে শ্বাসরুদ্ধ করে ফেলবে। আমার গভীর শোকের ভারে যেকোনো মুহূর্তে আমার মৃত্যু হতে পারে।
তাই সত্য প্রকাশে আমাকে অবশ্যই কিছু অবদান রাখতে হবে। হয়তো এতে আমার অপরাধবোধ কিছুটা লাঘব হবে, আর হয়তো ঈশ্বর আমার সেই যন্ত্রণাও হালকা করবেন, যে যন্ত্রণা আমার জন্য ইহকাল ও পরকালে অপেক্ষা করছে!
ইসলায়েলি বাহিনীর একজন সদস্য হয়ে মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ করেছি, নৃশংস ঘটনাবলী সংঘটিত করেছি, ভয়াবহ কর্মকাণ্ডে অংশ নিয়েছি; তার জন্যে নিশ্চয়ই আমার ঈশ্বর আমাকে কঠিন শাস্তি দিবেন।
এভাবেই প্রচন্ড মানুসিক কষ্টে দিন কাটছিল। আর একদিন আমি স্বপ্নে একটি ঐশী ইঙ্গিত পেলাম:
“সবকিছু পেছনে ফেলে নিজের পথে চলে যাও।”
ঘুম ভেঙে যাবায়ার পর আমি অস্থির হয়ে পড়লাম এবং বললাম “হে ঈশ্বর, আমাকে পথ দেখানোর জন্য তোমাকে ধন্যবাদ।”
এল আলের বিমানটি ওয়ারশ বিমানবন্দরে অবতরণ করার সঙ্গে সঙ্গেই আমি নিরাপদ বোধ করলাম- ইসরায়েলের সেই ভূমি থেকে অনেক দূরে, যে ভূমি এখন আমার কাছে আর কোনো অর্থ বহন করে না।
আমাদের শেখানো হয়েছিল, এই ভূমি ঈশ্বর আমাদের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। কিন্তু এটি এমন এক বিরাট মিথ্যা, যা ইহুদি জনগণকে প্রতারিত করার জন্য ব্যবহার করা হয়েছে। এটি একটি দীর্ঘস্থায়ী ও অব্যাহত মিথ্যা- যার মাধ্যমে গত আশি বছর ধরে নিরস্ত্র ও অসহায় ফিলিস্তিনি জনগণকে তাদের নিজস্ব ভূমি থেকে উচ্ছেদ করা হয়েছে। শুধু তা-ই নয়, আজও ঐ মানুষগুলোকে অকল্পনীয় দুর্ভোগ সহ্য করতে হচ্ছে।
ইসরাইলি সেনাবাহিনী ফিলিস্তিনিদের ওপর যে নিষ্ঠুরতা, জঘন্যতা ও নৃশংসতা চালায়, তা বর্ণনা করার মতো শব্দ কোথায়? পৃথিবীর কোনও বই বা ডিকশনারিতে সেই শব্দ খুজে পাওয়া যাবেনা।
নেতানিয়াহু একটা চরম মিথ্যাবাদী, সে যা বলে, তা বিশ্বাস করেনা। সে একজন ঘৃণ্য মিথ্যাবাদী- বিশেষ করে যখন সে IDFকে ‘বিশ্বের সবচেয়ে নৈতিক সেনাবাহিনী’ বলে বর্ণনা করে। বাস্তবতা তার সম্পূর্ণ বিপরীত!
সত্য হলো, এটি বিশ্বের সবচেয়ে অধঃপতিত, নিষ্ঠুর ও বর্বর সেনাবাহিনী। হ্যাঁ, বিশ্ববাসী, ইসরাইল গাজায় ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়েছে, বিপর্যয় নামিয়ে এনেছে, সেই বর্বরতার সাক্ষী হয়ে থাকা আমার পক্ষে আর সম্ভব হচ্ছে না।
আমি গাজায় দায়িত্ব পালন করেছি। নিজের চোখে দেখেছি, কীভাবে একজন ট্যাংক কমান্ডার তাঁর ট্যাংকের কামান নিয়ে যেন খেলায় মেতে উঠতেন! তাঁবুর ভেতরে গাদাগাদি করে আশ্রয় নেওয়া ফিলিস্তিনিদের দিকে গোলা ছুড়তেন।
কখনো আবার বেকারির সামনে কিংবা খাদ্য ও ত্রাণ বিতরণকারী যানবাহনের পাশে লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষের ওপর গোলাবর্ষণ করতেন! কি জঘন্যতা! অমানবিকতা!
আমি নিজের চোখে দেখেছি, কীভাবে বিমান থেকে জনবসতিপূর্ণ আবাসিক ভবনগুলোতে ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করা হতো, আর ভবনগুলো ধসে পড়ে তার ভেতরে থাকা মানুষদের ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা দিত।
নিজের চোখে দেখেছি, দখলদার বাহিনীর স্নাইপাররা ত্রাণ পাওয়ার জন্য লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা শিশু, প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ ও নারীদের গুলি করে হত্যা করে যেন নিজেদের বিনোদন খুঁজে নিত। ফিলিস্তিনিদের হত্যা করা যেন এক উন্মাদনা!
আমি যেসব অপরাধের সাক্ষী হয়েছি, সেগুলো পৃথিবীর অন্য কোথাও ঘটতে পারে না। এগুলো কেবল ফিলিস্তিনের মাটিতেই ঘটে। পৃথিবী দেখেও দেখে না। ইসরাইলকে কেউ কিচ্ছু বলেনা। ইসরাইল সকল অপরাধের ঊর্ধ্বে। এটা কি করে সম্ভব! মাননতা কোথায়? ফিলিস্তিনে এসে মানবতা হারিয়ে গেছে!
আমি নিজের চোখে দেখেছি, একটি শিশু রক্তে ভেজা বাসি রুটির টুকরো আঁকড়ে ধরে তার মায়ের মৃতদেহের পাশে কাঁদছে। আর সৈন্যরা তাকে দেখে হাসছে- যেন কোনো হাস্যরসাত্মক ভিডিও দেখছে। কী জঘন্য বর্বরতা!
তারা দাবি করে, এই মানুষগুলো মানুষ নয়; তারা আমাদের সমান নয়, আমরা ইহুদিরা যেমন, তারা তেমন নয়। আমি সাহস সঞ্চয় করে সহকর্মীদের বলতাম, “ভাই, ওরা যদি একদল বানরও হতো, তাহলেও কি আমরা এভাবে তাদের হত্যা করতে পারতাম?” তারা জবাব দিত, “তুমি কাপুরুষ, তুমি দুর্বল- তুমি ইহুদি হওয়ার যোগ্য নও।”
আমি দেখেছি পশ্চিম তীরে বসতি স্থাপনকারীদের জলপাইগাছ উপড়ে ফেলতে, নিজেদের জমিতে কাজ করা কৃষকদের ওপর হামলা করতে, গুলি চালাতে। আমি তাদের বাড়িঘর ধ্বংস করতে দেখেছি। বাড়ির মালিকদের তাৎক্ষণিকভাবে বাড়ি ছেড়ে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হতো, অথচ বাসিন্দারা ভেতরে থাকা অবস্থাতেই বাড়িগুলো গুঁড়িয়ে দেওয়া হতো।
আমি নিজ চোখে দেখেছি, একজন সৈন্য একজন ফিলিস্তিনিকে খুদে বার্তা পাঠিয়ে বলেছিল, “তুমি
ছাদে উঠে যাও। নইলে তোমার পরিবারের সকল সদস্যরা ঘরের ভেতরে থাকা অবস্থাতেই আমরা বাড়িটি ধ্বংস করে দেব- আর এর জন্য দায়ী থাকবে তুমি।”
লোকটি যখন ছাদে উঠে একটি সাদা কাপড় নাড়াতে শুরু করল, তখন ঐ ইসরাইলি সৈন্যটি তাকে সেখানেই গুলি করে হত্যা করল। কেউ কি এসব বিশ্বাস করতে পারে? এমন দৃশ্য কতটা মর্মান্তিক তা ভাষায় প্রকাশ করা যায় না।
ইসরায়েলিদের এই নিষ্ঠুরতার কোনো ব্যাখ্যা আমি খুঁজে পাইনি- আমরা ইহুদি হিসেবে যেভাবে বেড়ে উঠেছি, তা ছাড়া। আমাদের শেখানো হয়েছিল, আরবরা নোংরা, বর্বর এবং চরমপন্থী মুসলিম হত্যাকারী। আরও শেখানো হয়েছিল, আমরা যদি তাদের প্রতি সদয় হই, তাহলে তারা আমাদের সমুদ্রে নিক্ষেপ করবে।
একবার ভাবুন তো, আমাদের কী ধরনের মগজধোলাই করা হয়েছিল!
আমাদের শেখানো হয়েছিল, ফিলিস্তিনের ভূমি আমাদের-ইহুদিদের। তারা দাবি করেছিল, গোলান মালভূমি এবং সমগ্র লেভান্ত অঞ্চল সিয়োনের সন্তানদের। আমাদের শেখানো হয়েছিল, ‘বৃহত্তর ইসরায়েল’ ইউফ্রেটিস নদী থেকে নীল নদ পর্যন্ত বিস্তৃত।
এই সমস্ত মিথ্যায় বিশ্বাস করার জন্য আমরা ইহুদিরা কতটা নিকৃষ্ট হতে পারি! আমরা যদি নিকৃষ্ট, নির্বোধ ও নৈতিকতাহীন না হতাম, তাহলে কখনোই এসব আদেশ পালন করতাম না। আমি আর এই নৃশংসতার সাক্ষী হয়ে থাকতে পারছি না।
প্রতিরাতে আমি কাঁদতাম। আমার সহযোদ্ধারা আমাকে উপহাস করে কাপুরুষ বলত। তারা জোর দিয়ে বলত, একজন ইহুদির মধ্যে আরবদের হত্যা করার এবং প্রতিশ্রুত ভূমি থেকে তাদের নির্মূল করার প্রবল আকাঙ্ক্ষা থাকা উচিৎ।
আমি এমন একটি দিনের জন্য প্রার্থনা করি, যেদিন আরবরা জেগে উঠে বুঝতে পারবে যে, ইসরায়েল একটি অলীক ধারণা- একটি মিথ্যা-যার একদিন অবসান ঘটবেই।
একটা কথা না বললেই নয়- আরব নেতারা যদি অপরাধী নেতানিয়াহু ও তাঁর চক্রের সঙ্গে আঁতাত না করতেন, তাহলে আমরা কখনোই এত অপরাধ ও নৃশংসতা সংঘটিত করতে পারতাম না।
হে প্রভু, নিরপরাধ ফিলিস্তিনিদের সঙ্গে আমরা যা কিছু করেছি, তার জন্য আমাকে ক্ষমা করো। হে ঈশ্বর, আমরা যে নৃশংসতা চালিয়েছি, তার জন্য আমাকে ক্ষমা করো।
মুসলমানরা যেমন বলে, তুমিই ‘পরম ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু’। তাই আমি নিশ্চিত, তুমি আমাকে ক্ষমা করবে। কারণ, পথ হারিয়ে ফেলার পর অবশেষে আমি আমার সঠিক পথ খুঁজে পেয়েছি।
হে ঈশ্বর, আমাকে সরল পথের সন্ধান দেওয়ার জন্য তোমাকে ধন্যবাদ- সেই সত্য, ভালোবাসা ও শান্তির পথ, যা অপরাধী ইসরায়েল রাষ্ট্রের পথ থেকে সম্পূর্ণ আলাদা।
বি.দ্র.
# তথ্য ও ছবি সংগৃহিত।