বিনোদন ডেক্স:
মিউনিখের হাড়কাঁপানো শীত। মাইনাস দশ ডিগ্রি তাপমাত্রায় জ্যাকেটের পকেটে হাত ঢুকিয়ে যখন তানভীর ট্রাম স্টেশনে দাঁড়িয়ে থাকত, তখন তার মনে হতো ইউরোপের এই চাকচিক্যময় জীবন আসলে এক সোনালী খাঁচা। সাতাশ বছর বয়সী তানভীরের দিন কাটত হাড়ভাঙা খাটুনি আর অনিশ্চয়তায়। দেশে বৃদ্ধ মা-বাবার ওষুধ কেনার টাকা আর নিজের বৈধ কাগজপত্রের দুশ্চিন্তা—এই ছিল তার নিত্যসঙ্গী। এই যান্ত্রিক শহরে তানভীর ছিল বড্ড একা, যেন ভিড়ের মাঝে এক অদৃশ্য সত্তা।
একদিন পাবলিক লাইব্রেরির সামনে বরফে চাকা আটকে যাওয়া এক হুইলচেয়ারকে ধাক্কা দিতে গিয়েই পরিচয় সোফিয়ার সাথে। ছাব্বিশ বছরের সোফিয়া, যার চোখের মণি ছিল নীল, কিন্তু সেই নীলে ছিল এক গভীর বিষাদ। এক সড়ক দুর্ঘটনায় কোমরের নিচ থেকে অবশ হয়ে যাওয়া সোফিয়া ছিল একজন লেখিকা। তানভীর সেদিন তাকে সাহায্য করেছিল কোনো করুণা থেকে নয়, বরং মানুষ হিসেবে। সেই কৃতজ্ঞতা থেকেই শুরু হয় কফি শপের আড্ডা। তানভীর মুগ্ধ হয়ে শুনত সোফিয়ার গল্পের প্লট, আর সোফিয়া অবাক হয়ে দেখত তানভীরের চোখের সারল্য। তানভীর যখন সোফিয়ার হুইলচেয়ার ঠেলে তাকে পার্কে নিয়ে যেত, তখন সোফিয়া প্রথমবারের মতো অনুভব করত—তার অচল পাগুলোর অভাব কোনো একজন মানুষ তার সবল হাত দিয়ে পূর্ণ করে দিচ্ছে।
কিন্তু পৃথিবীর নিয়ম বড় নিষ্ঠুর। তাদের এই পবিত্র সম্পর্কের গায়ে কাদা ছিটাল সমাজ। তানভীরের বাংলাদেশি রুমমেটরা হাসাহাসি করে বলত, “মামা, দারুণ গেম খেলেছিস! একেবারে সিটিজেনশিপ কনফার্ম। পঙ্গু মেয়ে, তাই ডিভোর্সও দেবে না, পাসপোর্টটাও পার্মানেন্ট!” অন্যদিকে জার্মান প্রতিবেশীরা সোফিয়ার মাকে বলত, “তোমার মেয়েকে সাবধান করো। এই এশিয়ান ছেলেগুলো পেপারের জন্য সব করতে পারে। কাগজ পেলেই দেখবে ও হাওয়া হয়ে গেছে।”
এই কথাগুলো তানভীরের বুকে তীরের মতো বিঁধত। সে কি এতটাই নিচে নেমে গেছে? সে কি চোর? নাকি প্রতারক? সে তো সোফিয়ার হাসিকে ভালোবেসেছিল, তার পাসপোর্টের রঙকে নয়। কিন্তু সবচেয়ে বড় ঝড়টা এল যখন সোফিয়া নিজেও সন্দেহ করতে শুরু করল।
একদিন বিকেলে সোফিয়া চিৎকার করে কেঁদে উঠল, “তানভীর, তুমি কেন আমার সাথে আছো? আমার মতো একটা অচল বোঝা টেনে তোমার কী লাভ? তুমি কি সত্যিই আমাকে ভালোবাসো, নাকি সবাই যা বলছে সেটাই সত্যি? আমার পাসপোর্টটাই কি আমার একমাত্র যোগ্যতা?” সোফিয়ার এই আত্মবিশ্বাসহীনতা আর কান্না তানভীরকে দুমড়ে মুচড়ে দিল। সে বুঝতে পারল, সমাজের এই বিষাক্ত কথাগুলো সোফিয়ার মনে গেঁথে গেছে।
সেদিন রাতে তানভীর ঘুমাতে পারল না। সে ভাবল, ভালোবাসার প্রমাণ কি কোনো কাগজ দিয়ে হয়? পরদিন সে সোফিয়ার বাসায় গেল। তার হাতে ছিল দুটো ওয়ান-ওয়ে টিকিট। সোফিয়া অবাক হয়ে তাকাল। তানভীর সোফিয়ার হাত দুটো নিজের বুকের কাছে ধরে বলল, “সোফিয়া, সবাই বলছে আমি তোমার পাসপোর্টের লোভে আছি। এই নাও, আমি সব ছেড়ে দিতে রাজি। চলো আমরা বাংলাদেশে চলে যাই। সেখানে ধুলোবালি আছে, ট্রাফিক জ্যাম আছে, কিন্তু সেখানে তোমার পাসপোর্ট কোনো কাজেই আসবে না। সেখানে আমাকে কেউ বলবে না আমি লোভে পড়ে তোমাকে বিয়ে করেছি। তুমি কি যাবে আমার সাথে ওই অনিশ্চিত জীবনে? শুধু আমার ওপর বিশ্বাস করে?”
সোফিয়া স্তব্ধ হয়ে গেল। যে ছেলেটা ইউরোপের নিরাপদ জীবন, নিশ্চিত ভবিষ্যৎ—সব এক মুহূর্তে ছুড়ে ফেলতে রাজি শুধু তাকে পাওয়ার জন্য, তার ভালোবাসায় কোনো খাদ থাকতে পারে না। সোফিয়া তানভীরের বুকে মাথা রেখে সেদিন শিশুর মতো কেঁদেছিল। সেই কান্না ছিল সন্দেহের মেঘ কেটে যাওয়ার কান্না, সেই কান্না ছিল বিশ্বাস ফিরে পাওয়ার কান্না।
তাদের বিয়েটা হলো মিউনিখের এক ছোট গির্জায়। বাইরের কেউ আসেনি, সমাজ তাদের বয়কট করেছিল। কিন্তু তানভীর যখন বিয়ের পোশাকে সোফিয়াকে হুইলচেয়ার থেকে পাঁজাকোলা করে কোলে তুলে নিল, তখন মনে হচ্ছিল সে কোনো পঙ্গু মানুষকে নয়, বরং পৃথিবীর সবচেয়ে দামী রাজকন্যাকে কোলে তুলে নিয়েছে। তানভীরের চোখে ছিল গর্ব, আর সোফিয়ার চোখে ছিল জল।
আজ তারা জার্মানিতেই আছে। তানভীর সিটিজেনশিপ পেয়েছে কি না তা নিয়ে কেউ আর মাথা ঘামায় না। কারণ, মিউনিখের রাস্তায় যখন তানভীর সোফিয়ার হুইলচেয়ার ঠেলে নিয়ে যায় এবং মাঝে মাঝে নিচু হয়ে তার কপালে জমে থাকা ঘাম মুছে দেয়, তখন পথচারীরা থমকে দাঁড়ায়। যারা একদিন তাকে ‘প্রতারক’ বলেছিল, তারা এখন দীর্ঘশ্বাস ফেলে ভাবে—এমন নিঃস্বার্থ ভালোবাসা কজনার ভাগ্যে জোটে? তানভীর প্রমাণ করেছে, ভালোবাসা হাঁটতে পারে না, ভালোবাসা উড়তে পারে—যদি সেই ভালোবাসার ডানায় বিশ্বাসের জোর থাকে।
তথ্যসূত্র:
# B- Deshi Khobor থেকে সংগৃহীত কপি পোস্ট।