• সোমবার, ১২ অক্টোবর ২০২৬, ০৮:৪৮ অপরাহ্ন
Headline
মসজিদের ইমাম থেকে মুকুটহীন সম্রাট আন্ডার ওয়ার্ল্ড ডন দাদা তপনের উত্থান – পতনের নেপথ্য কাহিনি! ‎নাসিরনগরে আমার দেশ পত্রিকার সাংবাদিককে হেনস্তার অভিযোগ! মাদারীপুরে মাসিক অপরাধ সভা অনুষ্ঠিত, অপরাধ দমনে পুলিশ সুপারের নির্দেশনা! শিশু বিয়ে আর নয়, কন্যা করবে বিশ্বজয়” এই প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে দিনাজপুরের ফুলবাড়ীতে জাতীয় কন্যাশিশু দিবস উদযাপন! কেন্দুয়ায় জাতীয় কন্যাশিশু দিবস উদযাপন, বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে সচেতনতার আহ্বান! ঠাকুরগাঁওয়ের গড়েয়ায় মাদকবিরোধী অভিযান, আটক ৪ জনের কারাদণ্ড! দুর্গাপূজা নিয়ে মন্দির কমিটির সাথে পুলিশের মতবিনিময় সভা! কুমিল্লায় নারীকে পিটিয়ে হত্যা: প্রধান আসামি রহিম গ্রেফতার! “আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনে কোন দলীয় প্রতীক থাকছে না” এই নির্বাচনকে ঘিরে কোন দলীয় কিংবা প্রশাসনিক প্রভাব বরদাশত করা হবে না —জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ মোহাম্মদ নুরুল ইসলাম! চানপাড়ায় চাঁদাবাজি, রাস্তা দখল ও হয়রানি: আইনি প্রতিকার চেয়ে ভুক্তভোগীর সংবাদ সম্মেলন, বিচার চেয়ে প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ কামনা!

মসজিদের ইমাম থেকে মুকুটহীন সম্রাট আন্ডার ওয়ার্ল্ড ডন দাদা তপনের উত্থান – পতনের নেপথ্য কাহিনি!

Reporter Name
Update : সোমবার, ১২ অক্টোবর, ২০২৬

♦ক্রাইম ডেস্ক|জনতার দেশঃ

দাদা তপন বলছি শুনলেই কেন বুক কাঁপতো সবার?

দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের এক সময়ের মূর্তিমান আতঙ্ক চরমপন্থি সংগঠন ‘জনযুদ্ধের’ নেতা ‘দাদা তপন’। এই নামটি শুনলে এখনও আঁতকে ওঠেন অনেকেই। কথিত বন্দুকযুদ্ধে সেই দাদা তপন নিহত হন। খুলনা অঞ্চলে চরমপন্থি দলের রাজনীতিতে অনেকেই জড়িত ছিলেন। কিন্তু ‘দাদা তপন’ নাম শুনলে কিংবা সামনাসামনি দেখা হলে শরীরের রক্ত হিমশীতল হয়ে যেতো যে কারও।
চরমপন্থি সংগঠন জনযুদ্ধের প্রতিষ্ঠাতা আব্দুর রশিদ মালিথা, ওরফে তপন মালিথা, ওরফে দাদা তপন ২০০৮ সালের ১৮ জুন র‌্যাবের সঙ্গে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত হন। অসংখ্য হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত দাদা তপনের নিথর দেহ পড়ে ছিল কুষ্টিয়া সদরের বাড়াদি স্কুলপাড়া গ্রামে। ওই বাড়িটি ছিল তার নিজের। রিক্তা আক্তার নামে এক নারীও তার সঙ্গে নিহত হন সেদিন। তিনি তার সহযোগী ছিলেন বলে জানা গেছে।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, একসময়ের মাদ্রাসাছাত্র ও মসজিদের ইমাম ছিলেন এই তপন মালিথা। ঝিনাইদহ সদর উপজেলার গান্না ইউনিয়নের পশ্চিম বিষয়খালী গ্রামের ইবাদত হোসেন মালিথার ছেলে তিনি।
স্থানীয় লোকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, নিষিদ্ধঘোষিত চরমপন্থি দলে দাদা তপনের উত্থান ছিল চমকে ভরা। মানুষ খুনের পাশাপাশি চাঁদাবাজির জন্য ঝিনাইদহসহ দক্ষিণাঞ্চলের বিভিন্ন শহরে নির্বিচারে বোমাবাজির অনুঘটক ছিলেন। তার নিশানা থেকে বাঁচার কোনও পথ ছিল না। পুলিশের হেফাজত থেকেও তিনি কয়েকবার পালিয়েছেন। জেলাব্যাপী একের পর এক যখন হত্যা আর রক্তের হোলি খেলায় মেতে ছিলেন তপন, সে সময় পুলিশ অনেকটাই খেই হারিয়ে ফেলে। গোয়েন্দা তথ্য ভুল প্রমাণিত করে একের পর এক হত্যা ও বোমাবাজি চালান নিজ জেলা ঝিনাইদহ শহরে। তার সংগঠন খুলনা, রাজশাহী ও বরিশাল অঞ্চলে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। ওই সময়ে গ্রামের অধিকার বঞ্চিত, অভাবী ও বিচারবঞ্চিত নিম্ন পরিবারের তরুণরা প্রতিশোধ নিতে নাম লেখান জনযুদ্ধে।
তার বাহিনীর তাণ্ডবে প্রায়ই মাঠে-ময়দানে পড়ে থাকতো মানুষের লাশ। প্রতিদিন পত্রিকার পাতা খুললেই রোমহর্ষক খুনের চিত্র চোখে পড়তো। খুনের পর ফোনে এবং ফ্যাক্স করে হত্যার দায় স্বীকার করে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিতো তপন বাহিনী। ‘দাদা তপন বলছি’ শুনলেই আতঙ্কগ্রস্ত হতেন যে কেউ। এভাবে টালমাটাল পরিস্থিতি চলার পর সদর উপজেলার ১৮ মাইল নামক স্থান থেকে ঝিনাইদহ শহরের ব্যাপারীপাড়ার সুমন নামে এক যুবক র‌্যাবের জালে ধরা পড়েন। তার কাছ থেকে উদ্ধার হয় ১৭টি মোবাইল সিম।
খোঁজ মেলে দাদা তপনের আস্তানার। নিখুঁত ছক আর নিশানায় র‌্যাব-১২ ও র‌্যাব-৬ কুষ্টিয়া সদরের বাড়াদি স্কুলপাড়া গ্রামে অভিযান চালায়। দিনের আলো কেবল ফুটতে শুরু করেছিল। প্রাচীর টপকে র‌্যাবের দল প্রবেশ করে বাড়ির ভেতরে। সঙ্গে র‌্যাব-১২ কুষ্টিয়া ইউনিটের ইনচার্জ মেজর আমজাদ হোসেনসহ অন্যান্য কর্মকর্তা। সফলভাবে শেষ হয় অপারেশন। শেষ হয় দাদা তপনের অধ্যায়।
নিহত তপনের পাশে তখনও পড়ে ছিল তার একে-৪৭ রাইফেলটি। দাদা তপন নিহত হওয়ার পর তার আইটি উইংয়ের প্রধান ছোট ভাই আকাশ, টিক্কা ও তার দলের কয়েকজন বন্দুকযুদ্ধে নিহত হন।
যেকোনও হত্যাকাণ্ডের পর দাদা তপনের ছোট ভাই আকাশ ফ্যাক্সবার্তায় হত্যার দায় স্বীকার করে বিবৃতি দিতেন। মুকুটহীন সম্রাটের মতোই দাদা তপন আন্ডারওয়ার্ল্ডে ছড়িয়ে দেন বিভীষিকা। তার আগ্রাসী তৎপরতায় পূর্ববাংলার অপর গ্রুপ বিপ্লবী কমিউনিস্ট পার্টি, শ্রমজীবী মুক্তি আন্দোলন, গণমুক্তিফৌজ, কৃষক সংগ্রাম সমিতি, জাসদ গণবাহিনী, সর্বহারা পার্টিসহ গোপন এবং প্রকাশ্য সংগঠনগুলো কোণঠাসা হয়ে পড়ে। ঝিনাইদহের অনেক বড় বড় নেতা ও ঠিকাদারদের নিয়মিত চাঁদা দিতে হতো দাদা তপনকে। এর ব্যতিক্রম হলে বোমার ঝাঁক গিয়ে পড়তো ওসব নেতার বাড়িতে অথবা ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ৯০-এর দশকের শুরুতে পূর্ববাংলা কমিউনিস্ট পার্টির দাপট বাড়ে। সে সময় হরিণাকুণ্ডু উপজেলার হিঙ্গেরপাড়া গ্রামের দর্জি টিপু ছিলেন জেলার আন্ডারওয়ার্ল্ডের রাজনীতির মুকুটহীন সম্রাট। টিপু সঙ্গী হিসেবে পান আরেক চরমপন্থি ইছাকে। পুলিশের সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে নিহত হন ইছা। দলীয় ক্যাডাররা বিশ্বাসঘাতকতা করে টিপু ও তার তিন সঙ্গীকে চুয়াডাঙ্গার আলমডাঙ্গার এক বিলের মধ্যে জীবন্ত কবর দেয়। শেষ হয় টিপুর অধ্যায়। এভাবে ক্ষমতার পালা বদলে আন্ডারওয়ার্ল্ড অশান্ত হয়ে পড়ে।
১৯৯৭ সালের দিকে বিপ্লবী কমিউনিস্ট পার্টির তাত্ত্বিক নেতা হিসেবে ঝিনাইদহের মীর ইলিয়াস হোসেন দিলীপের নেতৃত্বে গঠন করা হয় শ্রমজীবী মুক্তি আন্দোলন। দলের সামরিক শাখার নাম দেওয়া হয় গণমুক্তিফৌজ। বিপ্লবী কমিউনিস্ট পার্টির বেশিরভাগই গণমুক্তিফৌজে যোগ দেয়। ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম ১৯৯৯ সালে চরমপন্থিদের সাধারণ ক্ষমার সুযোগ দেন। শুরু হয় আত্মসমর্পণের প্রক্রিয়া। এ সময় বিপ্লবী ও পূর্ববাংলা কমিউনিস্ট পার্টি আত্মসমর্পণে সাড়া দেয়নি।
২০০০ সালের ১৫ জানুয়ারি শহরের পাগলাকানাই মোড়ে গুলিতে সঙ্গী আলফাজসহ নিহত হন মীর ইলিয়াস হোসেন দিলীপ। ২০০২ সালের দিকে পূর্ববাংলার কমিউনিস্ট পার্টি ভেঙে এমএল লাল পতাকা, এমএল জনযুদ্ধ ও এমএল যোদ্ধা— এই ৩ ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়ে। সামরিক শক্তি এবং হত্যা কৌশলের দিক থেকে আবদুর রশিদ মালিথা ওরফে দাদা তপনের নেতৃত্বাধীন পূর্ববাংলা কমিউনিস্ট পার্টি (এমএল জনযুদ্ধ) শীর্ষে চলে যায়। বিচার না করে গ্রাম-শহরের বিশিষ্ট ব্যক্তি, রাজনৈতিক নেতা, ঠিকাদার ও সাধারণ মানুষকে হত্যার নিশানা বানিয়ে দাদা তপন সবার কাছে এক মূর্তিমান আতঙ্ক হয়ে দাঁড়ায়।
২০০৮ সালে পুলিশের সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধের ঘটনায় নিহত হন নিষিদ্ধ সংগঠন পূর্ব বাংলার কমিউনিস্ট পার্টির (এমএল লাল পতাকা) শীর্ষ নেতা কোটচাঁদপুরের ডা. মিজানুর রহমান টুটুল ওরফে রাকেশ কামাল। এমবিবিএস চিকিৎসক টুটুল আটক হবার পর তার মা নভেরা খাতুন ঝিনাইদহ প্রেসক্লাবে সংবাদ সম্মেলনে আকুতি জানিয়েছিলেন যে, তার ছেলেকে যেন ‘ক্রসফায়ারে মারা না হয়’। তবে ঝিনাইদহ, যশোর, খুলনা ও কুষ্টিয়া অঞ্চলে জনযুদ্ধের দাদা তপনই এক মূর্তিমান আতঙ্ক ছিলেন, যা এখনকার প্রজন্মের কাছে রূপকথার গল্পের মতো।
আব্দুর রশিদ মালিথা ওরফে দাদা তপন (৪৫) ছিলেন মাদ্রাসা ছাত্র। কওমি মাদ্রাসার অন্যতম বড় ডিগ্রি দাওরা হাদিস পাসের পর কুষ্টিয়ার একটি মসজিদে ইমামের চাকরিতেও নিয়োজিত ছিলেন। ধীরে ধীরে জড়িয়ে যান বাম রাজনীতিতে। একসময়ে শীর্ষ চরমপন্থি নেতা হন। তিনি অস্ত্র হিসেবে সব সময় ব্যবহার করতেন একে-৪৭ রাইফেল। ছিল তার নিজস্ব ডেথ স্কোয়াড। একবার কুষ্টিয়া থানায় হামলা চালিয়ে পাঁচ পুলিশ সদস্যকে হত্যা করে অস্ত্রও লুট করিয়েছিলেন। আন্ডারওয়ার্ল্ডে তার খেতাবি নাম ছিল দাদা তপন। ১৫ বছরের ক্যারিয়ারে একবারও জেল খাটেননি তপন। পুলিশের হাতে ধরা পড়লেও তার বাহিনীর তৎপরতায় পালিয়ে যেতে সক্ষম হন। তার ও বাহিনীর হাতে ১৫০ জনেরও বেশি মানুষ খুন হন। বেশিরভাগকে জবাই করে হত্যা করা হয়।
খুলনার রূপসা ঘাটের টোল নিয়ে বিরোধ থাকায় বিরোধী পক্ষকে প্রকাশ্যে ব্রাশফায়ার করেন। নিহত হয় ছয় জন। প্রতিটি বড় কিলিং মিশনের পর একটি কমন প্যাটার্ন ছিল লাশের পাশে বা ঘটনাস্থলে একটি চিঠি বা চিরকুট ফেলে রাখা। তাতে লেখা থাকতো— ‘জনগণের শত্রুকে খতম করা হলো-দাদা।’ তার বাহিনী দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে যশোর, কুষ্টিয়া, ঝিনাইদহ, মেহেরপুর, চুয়াডাঙ্গা মাগুরা, নড়াইল, সাতক্ষীরা, খুলনা, মোংলা, বাগেরহাটে হাই-প্রোফাইল খুন বা বোমাবাজি করার পরপরই খবরের কাগজ ও পুলিশ ফাঁড়িতে ফ্যাক্স বার্তা বা ফোন করে বুক ফুলিয়ে হত্যার দায় স্বীকার করতেন এবং প্রশাসনকে ওপেন চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিতেন। কোনও কোনও এলাকায় প্রতিপক্ষ গ্রুপ যখন শক্তিশালী অবস্থানে থাকতো, তখন তাদের যাতায়াতের কাঁচা রাস্তায় বা মেঠোপথে রিমোট কন্ট্রোলড বা শক্তিশালী দেশীয় তৈরি বোমা পুঁতে রাখা হতো। প্রতিপক্ষ দলের লাইন-কমান্ডাররা যখন দলবল নিয়ে হেঁটে বা মোটরসাইকেলে ওই পথ দিয়ে যেতেন, তখন দূর থেকে বিস্ফোরণ ঘটিয়ে তাদের উড়িয়ে দেওয়া হতো।
একের পর এক নৃশংস হত্যাকাণ্ড চালিয়ে ‘আমি আবির হাসান বলছি’ ছদ্মনাম ব্যবহার করে মিরপুর উপজেলার মালিহাট গ্রামের নছর হত্যার দায় স্বীকারের মাধ্যমে আতঙ্ক সৃষ্টি করেন। এ ছাড়াও সিরাজ, লাল্টু, ঠাণ্ডুসহ অনেকই ছিলেন তার দলের চরমপন্থি নেতা।

তথ্যসূত্রঃ

#বিভিন্ন প্রিন্ট ইলেকট্রনিকস মিডিয়ায় প্রচারিত ও প্রকাশিত সংবাদ।

ছবিঃ

# সংগৃহিত।

(ইনসেটে দাদা তপন ওরফে তপন মালিথা)


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category