হেল্থ ডেস্ক |জনতার দেশঃ
সম্প্রতি চিকিৎসাবিষয়ক সাময়িকী ‘জামা নেটওয়ার্ক ওপেন’-এ প্রকাশিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, বয়স্ক মানুষের স্বাভাবিক হাঁটার গতি এবং দৈনন্দিন চলাফেরার সময় কদম ফেলার গতি থেকে অকালমৃত্যুর ঝুঁকি সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়।
গবেষকদের মতে, বয়স্ক মানুষের শারীরিক অবস্থা ও দীর্ঘায়ু সম্পর্কে ধারণা পেতে হাঁটার গতি একটি নির্ভরযোগ্য মাপকাঠি হতে পারে।
গবেষণায় যা দেখা গেছে,
যুক্তরাজ্যের দীর্ঘমেয়াদি ‘হোয়াইটহল-২’ গবেষণায় ৪ হাজার ৬৭ জন বয়স্ক মানুষের তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়েছে।
গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়, অংশগ্রহণকারীদের গড় বয়স ছিল ৬৯ দশমিক ৩ বছর। তাদের মধ্যে ৩ হাজার ২৪ জন পুরুষ এবং ১ হাজার ৪৩ জন নারী। ২০১২ থেকে ২০১৩ সালের মধ্যে তাদের প্রাথমিক তথ্য সংগ্রহ করা হয়। এরপর ২০২৪ সালের আগস্ট পর্যন্ত প্রায় ১২ বছর ধরে তাদের পর্যবেক্ষণ করেন গবেষকেরা। এই সময়ের মধ্যে ৭৩৯ জন বা ১৮ দশমিক ২ শতাংশ অংশগ্রহণকারীর মৃত্যুও হয়।
গবেষণার শুরুতে দুইভাবে অংশগ্রহণকারীদের হাঁটার গতি মাপা হয়। প্রথমে ক্লিনিকের পরিবেশে ২ দশমিক ৪৪ মিটার বা প্রায় ৮ ফুট লম্বা একটি নির্দিষ্ট পথ ধরে তাদের স্বাভাবিক গতিতে হাঁটতে বলা হয়। অর্থাৎ, দোকানে যাওয়ার সময় রাস্তায় যেভাবে হাঁটেন, সেভাবে হাঁটতে বলা হয়েছিল। তিনবার হাঁটার পর গতি মেপে তার গড় হিসাব করা হয়। এতে দেখা যায়, অংশগ্রহণকারীদের গড় হাঁটার গতি ছিল প্রতি সেকেন্ডে ১ দশমিক ২ মিটার।
দ্রুত বা বেশি হাঁটলে আয়ু বাড়ে? যা বলছে গবেষণা
দ্বিতীয় পদ্ধতিতে তাদের প্রতিদিনের হাঁটার গতি মাপা হয়। এ জন্য টানা নয় দিন তাদের কবজিতে একটি গতি মাপার যন্ত্র বা অ্যাক্সিলারোমিটার পরিয়ে রাখা হয়। যন্ত্রটির তথ্য থেকে প্রতি মিনিটে তারা কতটি কদম ফেলেছেন, তা হিসাব করা হয়। হাঁটার এই হিসাবকে বলা হয় ‘ক্যাডেন্স’।
প্রায় ১২ বছর পর্যবেক্ষণের পর গবেষকেরা দেখেন, বয়স, লিঙ্গ, ধূমপান, খাদ্যাভ্যাস, শরীরের ওজন এবং উচ্চ রক্তচাপ বা হৃদরোগের মতো দীর্ঘমেয়াদি অসুস্থতার বিষয়গুলো বিবেচনায় নেওয়ার পরও দ্রুত হাঁটার সঙ্গে মৃত্যুঝুঁকি কম থাকার সম্পর্ক রয়েছে।
গবেষণায় দেখা গেছে, ক্লিনিক্যাল পরীক্ষায় হাঁটার গতি প্রতি সেকেন্ডে শূন্য দশমিক ১ মিটার বাড়লে যেকোনো কারণে মৃত্যুর ঝুঁকি ১০ শতাংশ কমে। যাদের হাঁটার গতি বেশি ছিল, তাদের মৃত্যুর ঝুঁকি সামগ্রিকভাবে ২৩ শতাংশ পর্যন্ত কম দেখা গেছে।
অন্যদিকে, দৈনন্দিন জীবনে যাদের গড় কদম ফেলার গতি বেশি ছিল, তাদের মৃত্যুর ঝুঁকি ১৭ শতাংশ কম ছিল। আর যারা সবচেয়ে দ্রুত কদম ফেলতেন, তাদের ক্ষেত্রে ঝুঁকি কম ছিল ১৮ শতাংশ পর্যন্ত। দিনে মোট কত কদম হাঁটছেন, সেই হিসাব বিবেচনায় নেওয়ার পরও দ্রুত হাঁটার সঙ্গে মৃত্যুঝুঁকি কম থাকার সম্পর্ক দেখা গেছে।
বেশি গরম চা খেয়ে স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়াচ্ছেন না তো? কী বলছে গবেষণা তা জেনে নিন।
গবেষণার প্রধান লেখক নরওয়েজিয়ান ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজির গবেষক রায়ানে হাদ্দাজ ও তার সহকর্মীরা আরও একটি বিষয় দেখেছেন। ক্লিনিক বা চিকিৎসকের সামনে মানুষ যে গতিতে হাঁটেন, বাড়িতে স্বাভাবিকভাবে হাঁটার গতি তার সঙ্গে খুব বেশি মেলে না। তাই গবেষকদের মতে, এই দুই পদ্ধতিতে হাঁটার গতি মাপার ফল একে অপরের বিকল্প নয়। বরং দুটি পদ্ধতি থেকে আলাদা আলাদা তথ্য পাওয়া যায়।
‘ষষ্ঠ ভাইটাল সাইন’
প্রবীণদের শারীরিক অবস্থা বোঝার ক্ষেত্রে চিকিৎসা ও ফিজিওথেরাপিতে হাঁটার গতিকে গুরুত্বপূর্ণ সূচক হিসেবে দেখা হয়।
মার্কিন সংবাদমাধ্যম ফক্স নিউজ ডিজিটালকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট লুইসের ‘হাউসফিট ফিজিক্যাল থেরাপি অ্যান্ড ফিটনেস’-এর প্রধান নির্বাহী ও বয়স্কদের ফিজিওথেরাপি বিশেষজ্ঞ বেথ টেম্পলিন বলেন, ‘ফিজিক্যাল থেরাপিতে আমরা হাঁটার গতিকে শরীরের ষষ্ঠ গুরুত্বপূর্ণ জীবন-সূচক বলি। কারণ, শরীরের বিভিন্ন অঙ্গ ও ব্যবস্থা একসঙ্গে কতটা ভালোভাবে কাজ করছে, তা হাঁটার গতি থেকে বোঝা যায়।’
তিনি বলেন, ‘দ্রুত ও স্বাভাবিকভাবে হাঁটতে পায়ের পেশি শক্তিশালী হতে হয়। পাশাপাশি হৃৎপিণ্ড ও ফুসফুস সুস্থ থাকা, শরীরের ভারসাম্য ঠিক থাকা এবং মস্তিষ্ক ও স্নায়ুতন্ত্রের মধ্যে ভালো সমন্বয় থাকাও জরুরি।’
তার মতে, ‘কারও হাঁটার গতি কমতে শুরু করলে অনেক সময় রক্ত পরীক্ষা বা অন্য পরীক্ষায় কোনো রোগ ধরা পড়ার আগেই তা সতর্কসংকেত দিতে পারে। এর অর্থ, শরীরের কোনো একটি অংশ আগের মতো ভালোভাবে কাজ করছে না।’
বার্ধক্যের দুর্বলতা কাটাতে দ্রুত হাঁটাঃ
শুধু মৃত্যুঝুঁকি কমানো নয়, বয়সের সঙ্গে শরীরে যে দুর্বলতা তৈরি হয়, তা কাটাতেও দ্রুত হাঁটা সাহায্য করতে পারে। বিজ্ঞান সাময়িকী ‘প্লস ওয়ান’-এ প্রকাশিত আরেকটি গবেষণার তথ্য তুলে ধরে স্বাস্থ্যবিষয়ক ওয়েবসাইট ‘ফিট অ্যান্ড ওয়েল’ জানিয়েছে, ধীরগতিতে হাঁটার চেয়ে একটু জোরে হাঁটা বয়স্কদের শারীরিক দুর্বলতা কমাতে বেশি কার্যকর।
১৬ সপ্তাহ ধরে চলা ওই গবেষণায় প্রবীণদের সপ্তাহে তিন দিন বিশেষজ্ঞদের তত্ত্বাবধানে হাঁটানো হয়। এক দলকে দ্রুতগতিতে হাঁটানো হয়, যাতে তাদের হৃৎস্পন্দন সর্বোচ্চ মাত্রার ৭০ শতাংশে পৌঁছায়। অন্য দলটি নিজেদের পছন্দমতো স্বাভাবিক বা ধীরগতিতে হাঁটেন। এ দলের হৃৎস্পন্দন ছিল সর্বোচ্চ মাত্রার ৬০ শতাংশের নিচে।
বিষণ্ণতার নতুন ধরন খুঁজে পেলেন বিজ্ঞানীরা!
ফলাফলে দেখা যায়, দ্রুতগতিতে হাঁটা দলের ৬৯ দশমিক ৬ শতাংশ প্রবীণের শারীরিক দুর্বলতা কমেছে। অন্যদিকে, ধীরগতিতে হাঁটা দলের ক্ষেত্রে এই হার ছিল ৪৬ দশমিক ৪ শতাংশ। গবেষকদের মতে, একটু জোরে হাঁটলে শরীর বেশি সক্রিয় হয়। এতে পেশি ও শরীরের বিভিন্ন অঙ্গ ভালোভাবে কাজ করতে পারে।
হাঁটার গতি ও সক্ষমতা বাড়াবেন কীভাবে?
অনেকেই মনে করেন, প্রতিদিন বেশি হাঁটলেই শরীর ভালো থাকবে। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু হাঁটার পরিমাণ বাড়ানো যথেষ্ট নয়। হাঁটার গতি বাড়াতে শরীরের শক্তি ও ভারসাম্যও ভালো রাখতে হবে।
টেম্পলিনের পরামর্শ, ‘শুধু হাঁটার অভ্যাস করলেই হবে না, শরীরকেও শক্তিশালী করতে হবে। অনেকেই বেশি হাঁটার চেষ্টা করেন, কিন্তু দ্রুত হাঁটার জন্য শরীরের শক্তি ও ভারসাম্য দরকার।’
তথ্যসূত্রঃ
# বিভিন্ন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক হেল্থ জার্ণাল
# ছবিঃ
প্রতীকি।