• সোমবার, ১৯ অক্টোবর ২০২৬, ০৫:২২ অপরাহ্ন
Headline
ফুলবাড়ীতে আশংকাজনক ভাবে মাদকাসক্তের সংখ্যা বাড়ছে, নিশ্চিত ধ্বংসের দিকে যাচ্ছে যুব সমাজ! নরসিংদীর রায়পুরা থানা পুলিশের অভিযানে বিদেশী পিস্তলসহ ০২ জন সন্ত্রাসী গ্রেফতার! নাটোরে সাংবাদিক আলিফ হত্যার প্রতিবাদে গনমাধ্যমকর্মীদের মানববন্ধন ও প্রতিবাদ! সারাদেশে মাদকবিরোধী সংবাদ করলেই হামলা, মামলা, নির্যাতন—সাংবাদিকদের নিরাপত্তা কোথায়? মক্কা অঞ্চলে দুই বাংলাদেশি নাগরিকের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ঘটনা একটি অমানবিক বর্বর ঘটনাঃসৌদি মুলুকিয়ত রাজতন্ত্রের বিচারহীনতা অভিবাসী নির্যাতন ও ঐতিহাসিক দ্বিমুখী নীতি! বাংলাদেশ পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ও সহকারী পুলিশ সুপার (এএসপি) পদমর্যাদার ১১ কর্মকর্তাকে বদলি ও পদায়ন! রাজধানীর ‘ওসমানী উদ্যান’ কে আরো আধুনিকায়ন সহ জুলাই স্মৃতিস্তম্ভ উদ্বোধন করলেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান! বিতর্কিত কর্মকান্ডে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেনকে পদত্যাগের নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান! নরসিংদীর,শিবপুরে কৃষিজমির টপ সয়েল কাটার অভিযোগ জব্দ ভেকু মেশিন! ফুলবাড়ীতে জেলা বিএনপির নেতাদের বিরুদ্ধে অপপ্রচারের প্রতিবাদে বিক্ষোভ সমাবেশ!

সারাদেশে মাদকবিরোধী সংবাদ করলেই হামলা, মামলা, নির্যাতন—সাংবাদিকদের নিরাপত্তা কোথায়?

Reporter Name
Update : সোমবার, ১৯ অক্টোবর, ২০২৬

স্টাফ রিপোর্টার|জনতার দেশঃ

সত্য প্রকাশ কি সাংবাদিকদের অপরাধ? মাদক কারবার, চাঁদাবাজি, দুর্নীতি ও অপরাধের তথ্য তুলে ধরতে গিয়ে যদি সংবাদকর্মীদের হামলা, মামলা, নির্যাতন কিংবা হত্যার শিকার হতে হয়, তাহলে সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে কে? অপরাধের চিত্র জনসমক্ষে তুলে ধরাই যদি জীবনের ঝুঁকি তৈরি করে, তবে সাধারণ মানুষের জানার অধিকার এবং রাষ্ট্রের জবাবদিহি রক্ষা পাবে কীভাবে?

বাংলাদেশে সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগের পেছনে রয়েছে একাধিক নথিভুক্ত ঘটনা। মাদক কারবারের সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে সাংবাদিক আক্রান্ত হওয়া থেকে শুরু করে চাঁদাবাজির খবর প্রকাশের পর সাংবাদিক হত্যার ঘটনা—এসব ঘটনা সংবাদকর্মীদের পেশাগত নিরাপত্তা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তুলেছে। বিভিন্ন সাংবাদিক সংগঠন, মানবাধিকার সংস্থা ও গণমাধ্যমের প্রতিবেদনেও এই উদ্বেগ উঠে এসেছে।

২০২৫ সালের ১৪ অক্টোবর ঢাকা ট্রিবিউন-এর প্রতিবেদনে জানানো হয়, কুষ্টিয়ার কুমারখালী উপজেলার ছেঁউড়িয়ায় লালন মেলার মাঠে মাদক কারবারের তথ্য সংগ্রহ করতে গিয়ে ঢাকা পোস্ট-এর জেলা প্রতিনিধি রাজু আহমেদ হামলার শিকার হন। প্রতিবেদনে বলা হয়, ১৪ অক্টোবর দুপুরে হামলায় আহত হওয়ার পর তাঁকে কুষ্টিয়া জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হয়। রাজু আহমেদ অভিযোগ করেন, স্থানীয় একটি মাদক কারবারি চক্রের সদস্যরা তাঁর ওপর পরিকল্পিতভাবে হামলা চালায়। পুলিশ জানিয়েছিল, ঘটনাটি তদন্ত করা হচ্ছে এবং আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

ঘটনাটি গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রশ্ন সামনে আনে—মাদক কারবারের তথ্য সংগ্রহ করতে গিয়ে একজন সাংবাদিক আক্রান্ত হলে তাঁর নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব কার? অপরাধের তথ্য প্রকাশের ক্ষেত্রে সাংবাদিকদের নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করা না গেলে মাদকবিরোধী জনসচেতনতা ও অপরাধ অনুসন্ধান বাধাগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। তবে অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণ এবং হামলায় জড়িত ব্যক্তিদের দায় নিরূপণের জন্য তদন্ত ও বিচারপ্রক্রিয়ার ফলাফল বিবেচনা করা জরুরি।

২০২৫ সালের ৭ আগস্ট গাজীপুরে দৈনিক প্রতিদিনের কাগজ-এর সাংবাদিক মো. আসাদুজ্জামান তুহিনকে ছুরিকাঘাতে হত্যা করা হয়। আন্তর্জাতিক সাংবাদিক ফেডারেশন (আইএফজে) ৮ আগস্ট প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে জানায়, স্থানীয় চাঁদাবাজির ঘটনা নিয়ে তাঁর প্রতিবেদন প্রকাশের পর হত্যাকাণ্ডটি ঘটে থাকতে পারে বলে অভিযোগ উঠেছিল। একই প্রতিবেদনে বলা হয়, এর আগের দিন গাজীপুরে সাংবাদিক আনোয়ার হোসেনও স্থানীয় দোকানিদের কাছ থেকে চাঁদা আদায়ের প্রতিবাদ করার জেরে হামলার শিকার হয়েছিলেন বলে অভিযোগ করা হয়।

এই ঘটনাগুলো সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিয়ে গভীর উদ্বেগ তৈরি করে। বিশেষ করে অপরাধ ও চাঁদাবাজির তথ্য প্রকাশের পর কোনো সাংবাদিক আক্রান্ত হলে ঘটনার পেছনের কারণ নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা এবং দায়ীদের বিচারের আওতায় আনা অত্যন্ত জরুরি।

একজন সাংবাদিকের জীবন চলে যাওয়ার পর শুধু শোক প্রকাশ যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন কার্যকর তদন্ত, ন্যায়বিচার এবং ভবিষ্যতে এমন ঘটনা প্রতিরোধে দৃশ্যমান পদক্ষেপ।

মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি (এইচআরএসএস)-এর বরাতে দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড ১ জানুয়ারি ২০২৬-এ প্রকাশিত প্রতিবেদনে জানায়, ২০২৫ সালে বাংলাদেশে অন্তত ৩১৮টি ঘটনায় মোট ৫৩৯ জন সাংবাদিক হত্যা, নির্যাতন ও বিভিন্ন ধরনের হয়রানির শিকার হয়েছেন বলে সংস্থাটির বার্ষিক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তথ্যগুলো গণমাধ্যমের প্রতিবেদন ও সংস্থাটির নিজস্ব অনুসন্ধানের ভিত্তিতে সংকলিত হয়েছিল।

অন্যদিকে, ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)-এর গবেষণার বরাতে দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড ৯ ডিসেম্বর ২০২৫-এ জানায়, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট থেকে ২০২৫ সালের ১ নভেম্বর পর্যন্ত ১৫ মাসে ৪৭৬টি পৃথক ঘটনায় ১,০৭৩ জন সাংবাদিক ও গণমাধ্যমকর্মী হামলা, মামলা, হত্যা, হুমকি, হয়রানি, আটক ও চাকরি হারানোর মতো পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছেন বলে গবেষণায় উঠে এসেছে।

এগুলো সংশ্লিষ্ট সংস্থার নিজস্ব পর্যবেক্ষণ ও গণনা। প্রতিবেদন দুটির সময়সীমা এবং তথ্য সংগ্রহের পদ্ধতি এক নয়; তাই সংখ্যাগুলোকে একই পরিসংখ্যানের অংশ হিসেবে যোগ করা যাবে না। তবে উভয় প্রতিবেদনই সাংবাদিকদের নিরাপত্তা ও পেশাগত স্বাধীনতা নিয়ে উদ্বেগের মাত্রা তুলে ধরে।

২০২৬ সালের ৪ অক্টোবর রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে সংবাদ সংগ্রহের সময় হামলার ঘটনায় অন্তত চার সাংবাদিকসহ মোট ১০ জন আহত হওয়ার কথা জানায় দ্য ডেইলি স্টার। ৬ অক্টোবর প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়, সম্পাদক পরিষদ ঘটনাটির নিন্দা জানিয়ে দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্ত, দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা এবং সাংবাদিকদের জন্য নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করার দাবি জানায়।

কোনো সংবাদ, মতামত কিংবা পেশাগত কাজের সঙ্গে দ্বিমত থাকলেই সাংবাদিককে আক্রমণ, হুমকি বা সংবাদ সংগ্রহে বাধা দেওয়ার অধিকার কারও নেই। অভিযোগের প্রতিকার হতে হবে আইনসম্মত উপায়ে।

এই ঘটনা আবারও স্মরণ করিয়ে দেয়, সাংবাদিকদের নিরাপত্তা শুধু সংবাদমাধ্যমের অভ্যন্তরীণ বিষয় নয়; এটি জনসাধারণের জানার অধিকার এবং স্বাধীন সাংবাদিকতার পরিবেশের সঙ্গেও সরাসরি সম্পর্কিত।

একজন সাংবাদিক মাঠপর্যায়ে অপরাধ, দুর্নীতি, মাদক কারবার, অনিয়ম কিংবা সাধারণ মানুষের ওপর সংঘটিত অন্যায়ের তথ্য সংগ্রহ করেন। তাঁর প্রতিবেদন প্রশাসনকে কোনো ঘটনা সম্পর্কে অবহিত করতে পারে, অপরাধের তদন্তে জনমত তৈরি করতে পারে এবং সাধারণ মানুষকে সচেতন করতে পারে।

কিন্তু সাংবাদিক যদি তথ্য সংগ্রহ করতে গিয়ে হামলার শিকার হন, হুমকি পান কিংবা হয়রানিমূলক মামলার আশঙ্কায় থাকেন, তাহলে ভবিষ্যতে একই ধরনের ঘটনা অনুসন্ধানে অন্য সংবাদকর্মীরাও ঝুঁকি অনুভব করতে পারেন। এতে জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট গুরুত্বপূর্ণ তথ্য প্রকাশ বাধাগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়।

সাংবাদিকদের কাজের সমালোচনা করা যেতে পারে, ভুল তথ্যের প্রতিবাদ জানানো যেতে পারে এবং আইনসম্মত প্রতিকার চাওয়া যেতে পারে। কিন্তু কোনো প্রতিবেদনকে কেন্দ্র করে সহিংসতা, হুমকি কিংবা প্রতিশোধমূলক আচরণ গ্রহণযোগ্য নয়।

সাংবাদিকের ওপর হামলা কিংবা হত্যার প্রভাব শুধু তাঁর নিজের জীবনে সীমাবদ্ধ থাকে না; পরিবারের সদস্যরাও নিরাপত্তাহীনতা, আর্থিক অনিশ্চয়তা এবং বিচার পাওয়ার দীর্ঘ প্রতীক্ষার মুখোমুখি হতে পারেন।

তাই নিহত, নির্যাতিত ও হুমকির মুখে থাকা সাংবাদিকদের পরিবারের নিরাপত্তা এবং প্রয়োজনীয় সহায়তা নিশ্চিত করা জরুরি। ঝুঁকিতে থাকা পরিবারকে পরিস্থিতি অনুযায়ী সুরক্ষা দিতে হবে। হত্যাকাণ্ডের তদন্তে স্বচ্ছতা বজায় রাখতে হবে এবং ভুক্তভোগী পরিবারকে বিচারপ্রক্রিয়ার অগ্রগতি সম্পর্কে যথাযথ তথ্য দিতে হবে।

একজন সাংবাদিকের মৃত্যুর পর তাঁর পরিবারকে যেন নিরাপত্তা ও ন্যায়বিচারের জন্য অসহায়ভাবে অপেক্ষা করতে না হয়—এটি নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে কার্যকর ভূমিকা রাখতে হবে।

সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকার, প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, গণমাধ্যমের মালিকপক্ষ ও সাংবাদিক সংগঠনগুলোর সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। বিশেষ করে মাদক কারবার, চাঁদাবাজি, দুর্নীতি ও সংগঠিত অপরাধ নিয়ে সংবাদ সংগ্রহকারী সাংবাদিকদের ঝুঁকি মূল্যায়ন এবং প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা সহায়তা দেওয়া জরুরি।

সাংবাদিকদের ওপর হামলা, হুমকি, নির্যাতন ও হত্যার প্রতিটি অভিযোগ নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করতে হবে। প্রমাণের ভিত্তিতে দায়ীদের আইনের আওতায় আনতে হবে। একই সঙ্গে হয়রানিমূলক মামলা প্রতিরোধ, পেশাগত দায়িত্ব পালনের সময় নিরাপত্তা এবং ঝুঁকিতে থাকা সাংবাদিক ও তাঁদের পরিবারের সুরক্ষায় কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে।

গণমাধ্যমের স্বাধীনতা রক্ষার পাশাপাশি সাংবাদিকদেরও তথ্য যাচাই, নিরপেক্ষতা, পেশাগত নৈতিকতা ও দায়িত্বশীল সংবাদ প্রকাশের নীতি অনুসরণ করতে হবে। স্বাধীনতা ও জবাবদিহি—দুটিই সুস্থ সাংবাদিকতার অপরিহার্য অংশ।

মাদকবিরোধী সংবাদ প্রকাশ, অপরাধের তথ্য উদঘাটন এবং জনস্বার্থে প্রতিবেদন তৈরি করতে গিয়ে সাংবাদিকদের নিরাপত্তাহীনতা কোনোভাবেই উপেক্ষা করা যায় না। সাংবাদিকদের ওপর হামলা শুধু একজন সংবাদকর্মীর ক্ষতি নয়; এটি স্বাধীন সাংবাদিকতা, জনগণের জানার অধিকার এবং রাষ্ট্রের জবাবদিহি প্রতিষ্ঠার পরিবেশকেও ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।

মাদকের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে, সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে, হামলা ও হত্যার অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত এবং দায়ীদের আইনানুগ বিচার করতে হবে। নিহত ও নির্যাতিত সাংবাদিকদের পরিবারের নিরাপত্তা এবং প্রয়োজনীয় সহায়তাও নিশ্চিত করতে হবে।

সাংবাদিকরা রাষ্ট্রের প্রতিপক্ষ নন; তাঁরা সমাজের বাস্তব চিত্র তুলে ধরে জনগণ ও রাষ্ট্রের কল্যাণে ভূমিকা রাখেন। তাঁদের ভয় দেখিয়ে নয়, নিরাপত্তা নিশ্চিত করেই সত্য প্রকাশের পরিবেশ তৈরি করতে হবে।

সত্য প্রকাশের জন্য কোনো সাংবাদিককে যেন প্রাণের ঝুঁকি নিতে না হয়। সাংবাদিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করুন, অপরাধের বিচার নিশ্চিত করুন এবং সংবাদ প্রকাশের স্বাধীনতা বাস্তবে প্রতিষ্ঠা করুন।

তথ্য ঋণঃ

# সাংবাদিক নির্যাতন প্রতিরোধ কমিটি ( প্রেক্ষিত: বাংলাদেশ)

 


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category