মো: মাহবুবুর রহমান খান :
রংপুর শহরে একই পরিবারের চারজনকে শ্বাস রোধ করে হত্যার ঘটনায় গ্রেফতার সিদ্ধার্থ দাস এবং মুগ্ধ দাসের ডোপ টেস্টে কোন মাদকের অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি।
ব্যাক গ্রাউণ্ড:
গত ২০ আগস্ট ২০২৬ তারিখে রংপুর শহরের মাছুয়া পাড়া এলাকায় অবসরপ্রাপ্ত স্কুল শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী (৬৫) তার স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী ( ৫০) ভার্সিটি পড়ুয়া মেয়ে আগামী চক্রবর্তী ( ২৫) এবং ১২ বছরের শিশু প্রীয়ম চক্রবর্তী কে হত্যা করা হয় দুর্বৃত্তরা। গত ২২ আগস্ট তাদের মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ।
গ্রেপ্তার ও স্বীকারোক্তি :এ ঘটনায়;সিদ্ধার্থ দাস ও মুগ্ধ দাস নামের দুই তরুণকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। পুলিশের দাবি, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে তারা হত্যার কথা স্বীকার করেছে।
পুলিশের ভাষ্য নিয়ে বিতর্কঃ
এই ঘটনায় পুলিশ কমিশনার জানান, ইয়াবা সেবনে বাঁধা প্রাপ্ত হয়ে তারা ওই হত্যাকাণ্ড ঘটায়। ঘটনার ৮ দিন পর ৩০ আগস্ট পর্যন্ত মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে তাদের ডোপ টেস্ট করানো হলে ৩১ আগস্ট প্রাপ্ত প্রতিবেদনে কোন মাদকের অস্তিত্ব মেলেনি। বিষয়টি নিয়ে ধুম্রজাল তৈরি হচ্ছে। পুলিশের কথাবার্তায় গরমিল পাওয়া যাচ্ছে
মামলা দায়ের :
অবশেষে নিহতের ভাই গোপীনাথ চক্রবর্তী বাদী হয়ে কোতোয়ালি থানা একটি হত্যা মামলা দায়ের করেছেন।
গত রোববার রাতে রংপুর মূখ্য মহানগর হাকিম আদালত অভিযুক্ত সিদ্ধার্থ দাস এবং মুগ্ধ দাসের জবানবন্দী শেষে দুজনকে কারাগারে পাঠান। প্রিজন ভ্যানে তোলার মধ্যবর্তী পথে কয়েকজনকে নিম্নোক্ত প্রশ্নগুলো করতে শোনা যায়। অভিযুক্ত দুজনের কেউ কোনো কথা বলেনি।
প্রশ্নগুলো ছিলঃ ভাই, এটা কি ইয়াবা সংক্রান্ত ঘটনা? এত ছোট বাচ্চাটাকে কেন মারছিলেন? এই শার্ট কি আপনার ছিল? বিদ্যুতের লাইন কেন বন্ধ করেছিলেন? কে কে জড়িত ছিল ইত্যাদি ইত্যাদি।
২০ আগস্ট বৃহস্পতিবার দিবাগত শেষ রাতে হাই স্কুলের অবসরপ্রাপ্ত গণপতি চক্রবর্তী তার স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী তাদের স্নাতক উত্তরসম্পন্ন করা কন্যা সন্তান আগামী চক্রবর্তী ছোট ছেলে প্রিয়ম চক্রবর্তী কে শহরের মাছুয়া পাড়া নিজ বাসায় খুন হন। শনিবার দিবাগত রাতে তাদের মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
রোববার দুপুরে মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার মোঃ আব্দুল মাবুদ গ্রেপ্তারকৃত ব্যক্তিদের কাছ থেকে প্রাপ্ত তথ্য সাংবাদিকদের সামনে উপস্থাপন করেন। তিনি বলেন, মুগ্ধ এবং তার বন্ধু রাতে ইয়াবা সেবন করতে গণপতি চক্রবর্তীর বাসার ছাদে যায়। তখন গণপতি ইয়াবা সেবনে বাধা দিলে গামছা গলায় পেঁচিয়ে তাকে হত্যা করে দুজন। এরপর তার স্ত্রী এলে তাকে হত্যা করে। ঘটনাটি দেখে ফেলায় তাদের সন্তান আগামী চক্রবর্তী ও প্রিয়ম চক্রবর্তীকেও শ্বাসরোধে হত্যা করা হয়।
কমিশনার আরো উল্লেখ করেন, পার্শ্ববর্তী দেবুর বাড়ির তিন তলা থেকে গণপতির বাড়ির ছাদে তারা লাফিয়ে গিয়েছিল। দিনটি শুক্রবার হওয়ার কারণে জুমার নামাজ পর্যন্ত তারা অপেক্ষা করছিল যাতে মুসল্লিরা ঘটনাটি দেখতে না পান। খুনিরা খুন করার পর খেজুর, শসা খেয়েছে স্বর্ণ পরীক্ষা করেছে আগুন জ্বালিয়ে। এরকম অনেক তথ্য দেন পুলিশ কমিশনার। তথ্যে অসংগতি থাকায় পুলিশের তদন্ত নিয়ে নেতিবাচক প্রশ্ন তৈরি হয়েছে জনমনে।
রংপুর ডিবি উপকমিশনার সনাতন চক্রবর্তী একটি সাক্ষাৎকারে বলেছেন তাদের একজন শুভাকাঙ্ক্ষী জানান যে সিদ্ধার্থের শরীরে অনেক আঘাতের চিহ্ন আছে। মুগ্ধর প্রতি সন্দেহের কথাও তিনি বলেছেন।এখন এই বিষয়টি নিয়ে জনমনে সন্দেহ পুলিশ তাদের প্রচণ্ড মারধোর করে তাদের কথা মত স্বীকারোক্তি মূলক জবানবন্দি দিতে বাধ্য করেছে।
ঘটনাস্থল পরিদর্শনের সময়ে ডিবি পুলিশের উপ-কমিশনারের শার্ট ও সিদ্ধার্থ শার্ট ছিল একই রংয়ের একই প্রিন্টের। সিদ্ধার্থর বাবাও বলেছেন তিনি যখন ছেলেকে পুলিশের হাতে তুলে দেন তখন তার পরনে ছিল গেঞ্জি।
এ ব্যাপারে জিজ্ঞাসাবাদ করা হলেপুলিশ কর্মকর্তা সাংবাদিকদের কাছে বলেন, “আড়ং তো মাত্র একটি সাট তৈরি করেনি?একই রংগের দুই শার্ট থাকতেই পারে। ”
জনমনেপ্রশ্ন, বাসার বিদ্যুতের লাইন কেন খোলা ছিল? সীমান্তর বাসায় যদি ইয়াবা সেবন করে তাহলে আবার কেন ইয়াবা সেবন করার জন্য ঝুঁকি নিয়ে এক বাসা থেকে আরেক বাসার ছাদে লাফিয়ে যাবে? যে বাসা থেকে লাফিয়ে গেছে সেই ছাদে কিংবা নির্মাণাধীন নির্জন তিন তলার মেঝেতে বসে ইয়াবা সেবন করলো না কেন? হিন্দু অধ্যুষিত মাছুয়া পাড়ায় শুক্রবারে মুসল্লিদের কথা আসছে কেন? ঘর কেন তছনছ করা ছিল? অভিযুক্ত ব্যক্তিদের যিনি ধরিয়ে দিয়েছেন তিনি মুগ্ধ কে কেন সন্দেহ করেছিলেন? দুজন মিলে কি চারজন মানুষকে হত্যা করেছে? চারজন মানুষকে খুন করার পর সেই বাসায় গোসল করা, খেজুর খাওয়া, স্বর্ণ পরীক্ষা করা কিভাবে সম্ভব?
গণপতির পরিবার যে বাসায় খুন হয়েছেন সেখানে গত রোববার গণমাধ্যম কর্মিরা সরেজমিন গিয়েছিলেন। তারা সেখানে পুলিশের কথার সাথে বাস্তবতার অনেক অসঙ্গতি দেখতে পান।
বাসার বিদ্যুতের লাইন কেটে দেওয়া বিশেষ উদ্দেশ্য প্রণোদিত বলে অনেকে মনে করছেন । ইয়াবা সেবনে বাঁধা দেওয়ার সঙ্গে বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার কোন সম্পর্ক নেই বলে অনেকে বলছেন। তারপর আবারও ইয়াবা খাওয়ার বিষয়টিকে অনেকে বিশ্বাস করতে চাইছে না। পুলিশের হাতে গ্রেফতারকৃত অভিযুক্তদের নির্জন স্হান বাড়ির ছাদ থাকতে পাশের বাড়ির দেয়াল ডিঙিয়ে গণপূর্তির বাড়ির ছাদে ইয়াবা সেবনের কোন প্রশ্নই উঠে না,সাংবাদিকদের সামনে এমন মন্তব্য করেছেন এলাকার অনেক সচেতন মানুষ।স্থানীয় এলাকাবাসীর দাবি, একের দোষ অন্যের ঘাড়ে না চাপিয়ে নিরপেক্ষ সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে উপকৃত অপরাধীদের খুঁজে বের করা হোক।এই খুনের দায়ে কোন নিরীহ মানুষকে যেন হয়রানি না করা হয় এ ব্যাপারে তারা আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রতি বিনীত অনুরোধ জানিয়েছেন।
তথ্যসূত্র:
# বিবিসি (বাংলা)
# বাংলা ট্রিবিউন
# ভয়েস বাংলা
ছবি:নিহত পরিবার।
(সংগৃহিত)।