এইচ,কবির টিটু:
মুক্তিযোদ্ধা, দুর্দমনীয় সাঁতারু ও রেকর্ডগড়া অভিযাত্রী
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস, ক্রীড়াঙ্গন এবং সাহসিকতার জগতে এক অনন্য নাম ক্ষিতীন্দ্র চন্দ্র বৈশ্য। তিনি শুধু একজন বীর মুক্তিযোদ্ধাই নন, বরং অধ্যবসায়, সাহস এবং আত্মবিশ্বাসের এক উজ্জ্বল প্রতীক। দীর্ঘ দূরত্বের সাঁতারে অসাধারণ কৃতিত্বের মাধ্যমে তিনি দেশ-বিদেশে বাংলাদেশের নাম উজ্জ্বল করেছেন।
১৯৫২ সালের ২৩ মে তৎকালীন ময়মনসিংহ জেলার নেত্রকোণা মহকুমার (বর্তমান নেত্রকোণা জেলা) মদন উপজেলার জাহাঙ্গীরপুর গ্রামে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা ক্ষিতীশ চন্দ্র বৈশ্য এবং মাতা সুপ্রভা রাণী বৈশ্য। শৈশব থেকেই তিনি ছিলেন মেধাবী, সাহসী এবং দৃঢ়চেতা।
শিক্ষাজীবনে তিনি সিলেটের এমসি কলেজ থেকে পদার্থবিদ্যায় স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। পরবর্তীতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে একই বিষয়ে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন।
১৯৮০ সালে উচ্চশিক্ষা সম্পন্ন করার পর বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তরে দুই বছর ফেলোশিপ করেন। ১৯৮২ সালে বাংলাদেশ বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষে বিমান নিয়ন্ত্রক (এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোলার) হিসেবে যোগদান করেন। দীর্ঘ কর্মজীবন শেষে ২০১১ সালে অবসর গ্রহণ করেন। তবে কর্মনিষ্ঠার স্বীকৃতি হিসেবে পরবর্তীতে একই প্রতিষ্ঠানে অ্যাভিয়েশন নেভিগেশন সার্ভিসের পরামর্শক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে তিনি ১১ নম্বর সেক্টরের একজন সাহসী যোদ্ধা হিসেবে অংশগ্রহণ করেন। দেশের স্বাধীনতার জন্য জীবন বাজি রেখে যুদ্ধ করা এই বীর মুক্তিযোদ্ধা পরবর্তী জীবনেও দেশপ্রেম ও সাহসিকতার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করে গেছেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জগন্নাথ হলের আবাসিক ছাত্র থাকাকালেই তাঁর অসাধারণ সাঁতার প্রতিভা জাতির সামনে প্রকাশিত হয়।
১৯৭৪ সালের ১৬ সেপ্টেম্বর তিনি জগন্নাথ হলের পুকুরে টানা ৯৩ ঘণ্টা ১১ মিনিট সাঁতার কেটে জাতীয় রেকর্ড গড়েন। কিন্তু নিজের সাফল্যে সন্তুষ্ট না থেকে আরও বড় চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করেন। ১৯৭৬ সালের ১৪ অক্টোবর থেকে ১৯ অক্টোবর পর্যন্ত টানা ১০৮ ঘণ্টা ৫ মিনিট সাঁতার কেটে তিনি নিজেরই রেকর্ড ভেঙে নতুন ইতিহাস সৃষ্টি করেন।
এরপর তিনি নদীভিত্তিক দীর্ঘ সাঁতার অভিযানে মনোনিবেশ করেন। ১৯৮০ সালে ভারতের মুর্শিদাবাদ জেলার ভাগীরথী নদীতে মাত্র ১২ ঘণ্টা ২৮ মিনিটে ৭৪ কিলোমিটার সাঁতার কেটে তিনি ব্যাপক প্রশংসা অর্জন করেন।
বয়স বাড়লেও তাঁর সাহস ও উদ্যম কখনো কমেনি। ২০১৭ সালের ৪ আগস্ট ময়মনসিংহের ফুলপুর উপজেলা থেকে নেত্রকোণার মদন উপজেলা পর্যন্ত কংস নদীপথে টানা ৪৩ ঘণ্টা ১২ মিনিট সাঁতার কেটে ১৪৬ কিলোমিটার পথ অতিক্রম করেন।
এই অসাধারণ কৃতিত্ব জাতীয় রেকর্ড হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করে।
কিন্তু তাঁর সবচেয়ে বিস্ময়কর অর্জন আসে ২০১৮ সালে। ৩ সেপ্টেম্বর সকালে শেরপুরের নালিতাবাড়ীর ভোগাই নদী থেকে যাত্রা শুরু করে কংস ও মগড়া নদীপথে ১৮৬ কিলোমিটার সাঁতার কেটে তিনি ৫ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যায় নেত্রকোণার মদন উপজেলার দেওয়ান বাজার ঘাটে পৌঁছান।
টানা ৬০ ঘণ্টা ৫৫ মিনিটের এই দুরূহ অভিযানের মাধ্যমে তিনি শুধু নিজের আগের রেকর্ডই ভাঙেননি, গড়েছেন নতুন বিশ্বরেকর্ডও।
তাঁর এই অনন্য সাফল্যের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতিও এসেছে।
২০১৯ সালে ওয়ার্ল্ড ওপেন ওয়াটার সুইমিং অ্যাসোসিয়েশন তাঁকে বিশ্বের ৫০ জন সর্বাধিক অ্যাডভেঞ্চারপ্রিয় ওপেন ওয়াটার সাঁতারুর অন্যতম হিসেবে ঘোষণা করে।
এটি বাংলাদেশের জন্যও এক বিরল সম্মানের বিষয়।
ব্যক্তিগত জীবনে ক্ষিতীন্দ্র চন্দ্র বৈশ্য অনুপমা বৈশ্যের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। তাঁদের এক পুত্র ও এক কন্যা রয়েছে। পরিবার-পরিজন নিয়ে তিনি ঢাকায় বসবাস করেন।
ক্ষিতীন্দ্র চন্দ্র বৈশ্যের জীবন আমাদের শেখায় যে দৃঢ় মনোবল, কঠোর পরিশ্রম এবং অদম্য সাহস থাকলে মানুষের পক্ষে অসম্ভবকেও সম্ভব করা যায়। মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে দেশের স্বাধীনতার জন্য তাঁর অবদান যেমন স্মরণীয়, তেমনি সাঁতারের জগতে তাঁর রেকর্ডগাথা প্রজন্মের পর প্রজন্মকে অনুপ্রাণিত করে যাবে।