বিনোদন ডেস্ক|জনতার দেশ:
আমাদের চলচ্চিত্রের সবচেয়ে অবহেলিত তারকার নাম নূতন। মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক চলচ্চিত্র “ওরা এগারো জন” এ বীরাঙ্গনার ভূমিকায় অভিনয় করে নূতন দর্শক হৃদয়ে আজো চিত্রজগতের বীরাঙ্গনা হয়ে আছেন। ভীষণ ট্যালেন্টেড অভিনেত্রী নূতন শাবানা ববিতা রোজিনাদের চাইতে কোনো অংশে কম ছিলেন না। আশির দশকের সর্বকালের সেরা নৃত্যপটীয়সী তারকা ছিলেন নূতন। কিন্তু চলচ্চিত্র পরিচালক / প্রযোজকগণ তাকে ব্যবহার করতে ব্যর্থ হয়েছেন। নাচে নূতন ছিলেন অদ্বিতীয়া। নায়ক রাজ রাজ্জাক এর “পাগলা রাজা” সিনেমায় রুনা লায়লার কণ্ঠের সেই কালজয়ী গানের কথা মনে পড়ে,”বনে বনে যত ফুল আছে”!! অলিভিয়ার লিপসিং ছিল গানটির সঙ্গে এবং গানের সঙ্গে নেচেছিলেন নূতন। মাধবীলতার মত এঁকেবেঁকে হেলেদুলে পারফর্ম করতে সিদ্ধহস্ত ছিলেন তিনি। সেই আমলে রুপালি পর্দায় অনেককেই নাচতে দেখা যেতো। তাদের মধ্যে নূতন ও অঞ্জনাই ছিলেন সবার সেরা। মরহুম নৃত্য পরিচালক আমির হোসেন বাবু বলতেন,”নূতন আর অঞ্জনা ম্যাডামকে নিয়ে নাচ করতে আমার ভীষণ ভালো লাগে। এই দুই সেরা নাচিয়ে যেকোনো নাচের মুদ্রা কয়েক মিনিটেই তুলে ফেলতে পারেন”। ক্লাসিকাল নাচে একমাত্র নূতন ও অঞ্জনাকেই পারফেক্ট নৃত্যশিল্পী বলা যেতে পারে।
নূতন এক শক্তিশালী অভিনেত্রীর নাম। “কাবিন” সিনেমায় শাবানার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে দুর্দান্ত অভিনয় করেছেন তিনি। অনেকাংশে মনে হয়েছিল কিছু দৃশ্যে তিনি শাবানাকে ছাড়িয়ে গেছেন চোখমুখের যাদুকরী অভিব্যক্তি দিয়ে। পারফেক্ট এক ভার্সেটাইল অভিনেত্রী নূতন। অসামান্য গ্ল্যামারে ঝলমল করা নূতনকে কিছু ছবিতে নেগেটিভ চরিত্রেও দেখা গেছে। যেমন, “সানাই” সিনেমায় নায়কের ধনী স্ত্রীর চরিত্রে। যেখানে স্বামীর ঘরনি অথচ গোপনে পরকীয়া প্রেমিকার চরিত্রে অনবদ্য অভিনয় করেছেন।নাইট ক্লাব পার্টিতে যাওয়া ধনীর দুলালীর বখে যাওয়া চরিত্র খুব সুন্দর ফুটিয়ে তুলতেন নূতন। “মানসী” ছবিতেও নূতনের রোল উগ্র হলেও দারুন মানানসই ছিল। নূতনের সবচেয়ে বড় গুণ হল তিনি অকপটে সত্য বলে ফেলেন। সত্য বলার ক্ষেত্রে তিনি কারো তোয়াক্কা করেন না।
৭৫ পূর্ববর্তী সময় বীর মুক্তিযোদ্ধা এবং অভিনেতা খসরুর সঙ্গে নূতনের প্রেম ভালোবাসার সম্পর্ক গড়ে ওঠে। খসরু “ওরা এগারো জন” সিনেমার জন্য বিখ্যাত। এই ছবিতে নূতন বীরাঙ্গনার চরিত্রে অভিনয় করেন। পাকিস্তানি হানাহার বাহিনীর হাতে ধর্ষিতা হন। পাক ক্যাম্প থেকে ছাড়া পেয়ে তিনি মুক্তিযোদ্ধা খসরুর কোলে মাথা রেখে মৃত্যুবরণ করেন। ব্যাকগ্রাউন্ডে বাজছিল,”এক সাগর রক্তের বিনিময়ে”!! সেই হৃদয়স্পর্শী দৃশ্য অতুলনীয়। খসরু ও শাবানা অভিনীত “বাদশা” সিনেমার কালজয়ী গান “আরে ও প্রাণের রাজা তুমি যে আমার” নিশ্চয়ই সবার হৃদয়ে জ্বলজ্বল করছে। সেই খসরু বীর মুক্তিযোদ্ধা যাকে ৭৫’ পরবর্তী সময় গুলি করা হয়েছিল। খসরুর ছোটভাই তখন সেনা অফিসার ছিলেন। তিনি খসরুকে হাসপাতালে ভর্তি করেন। খসরুর আশা ছিল নূতন তাঁকে দেখতে হাসপাতালে ছুটে যাবেন। কিন্তু নূতন যেতে পারেননি। কারণ নূতনের উপর তীক্ষ্ম নজরদারি রাখা হয়েছিল। খসরু কিছুটা সুস্থ হয়ে হাসপাতাল থেকে পালিয়ে ভারত চলে যান। নূতনের উপর গোয়েন্দা নজরদারি আরও বাড়ানো হয়। খসরু যখন মনের মানুষের টানে আবার বাংলাদেশে ফিরে আসেন, তখন নূতন বিবাহিতা এবং এক কন্যা সন্তানের জননী। তাঁর স্বামী রুহুল আমিন বাবুল যথেষ্ট প্রভাবশালী চলচ্চিত্র প্রযোজক। তাঁদের একমাত্র কন্যা সন্তানের নাম ফারাহ আমিন জিশা। তিনি আমেরিকায় থাকেন। রুহুল আমিন বাবুল সম্ভবত দেড় বা দুই বছর আগে ক্যান্সারে মারা গেছেন।
বঙ্গবন্ধু সাংস্কৃতিক জোটের কার্যক্রমে রুহুল আমিন বাবুল এবং নূতন সহায়তা করতেন। কিন্তু আওয়ামী লীগ সরকার কখনো নূতনের সেই অবদানের মূল্যায়ন করেনি। সুদিনের কোকিলদের ভিড়ে নূতন ও তাঁর স্বামীর অবদান ভুলে গিয়েছিল সরকার। দুধের মাছিদের ভিড়ে আসল নকল চিনতে পারেননি নেত্রী। অযোগ্যদের আস্ফালন দেখে অভিমানে নিজেকে গুটিয়ে নিয়েছেন নূতন। খসরুর দেশে ফিরে আসার পর এক বড় প্রযোজনা সংস্থা খসরুর সঙ্গে নূতনকে নায়িকা করে সিনেমা বানানোর প্রস্তাব দেয়। কিন্তু নূতন সেই প্রস্তাব ফিরিয়ে দিয়েছিলেন। নূতনের যুক্তি ছিল, যদিও অতীত ভুলে গিয়ে খসরুর সঙ্গে তিনি বন্ধুর মত আচরণ করবেন। কিন্তু লোকে নানা কাহিনীর জন্ম দেবে। এতে তাঁর পারিবারিক জীবন বিপর্যস্ত হবে, সামাজিক মর্যাদা ক্ষুন্ন হবে। তিনি চাননা তাঁর স্বামী মনে কষ্ট পান। স্বামী তাঁকে প্রচন্ড ভালোবাসেন। তিনি চাননি স্বামীর মনে অবিশ্বাস জমে ওঠুক। তাই খসরুর সঙ্গে তিনি অভিনয় করেননি। কিংবদন্তি নূতন তাঁর ভক্তদের হৃদয়ে নক্ষত্র হয়ে বেঁচে থাকবেন এমনটিই প্রত্যাশা।
তথ্য ও ছবি:
#সংগৃহিত