আহমেদ রফিক বারাকি :
বাংলাদেশের পুলিশ বাহিনীর ইতিহাসে সবচেয়ে কলঙ্কিত নাম সাবেক আইজিপি ও র্যাবের সাবেক ডিজি বেনজীর আহমেদ। ক্ষমতার চরম অপব্যবহার করে তিনি ভয়ের রাজত্ব এবং অকল্পনীয় দুর্নীতির পাহাড় গড়েছিলেন।
২০১৫ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত র্যাবের মহাপরিচালক (DG) থাকাকালীন বেনজীর আহমেদের প্রত্যক্ষ নির্দেশে ও প্রশ্রয়ে দেশে শত শত “বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড” (ক্রসফায়ার) ও গুমের ঘটনা ঘটে। ‘মাদকের বিরুদ্ধে যুদ্ধ’ এবং ‘আইনশৃঙ্খলা রক্ষা’-এর নামে আইনের তোয়াক্কা না করে বিরোধী মত ও সাধারণ মানুষকে নির্মমভাবে হত্যা ও গুম করান তিনি।
এই চরম মানবাধিকার লঙ্ঘনের দায়ে ২০২১ সালের ১০ ডিসেম্বর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র (USA) গ্লোবাল ম্যাগনিটস্কি আইনের আওতায় বেনজীর আহমেদ এবং তাঁর নেতৃত্বাধীন র্যাবের ওপর আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা জারি করে, যা বিশ্বমঞ্চে রাষ্ট্রকে চরম লজ্জিত করে।
২০২৪ সালের মার্চ মাসে গণমাধ্যমে তাঁর বিপুল অবৈধ সম্পদের তথ্য ফাঁস হয়। তিনি ক্ষমতার ভয় দেখিয়ে গোপালগঞ্জ, মাদারীপুরসহ বিভিন্ন এলাকায় সনাতন ধর্মাবলম্বী ও সাধারণ মানুষের প্রায় ৬২১ বিঘা (১১৪ একর) জমি জোরপূর্বক লিখে নেন।
গড়ে তোলেন ‘সাভানা ইকো রিসোর্ট অ্যান্ড ন্যাচারাল পার্ক’। কথিত আছে ঢাকাই সিনেমার নায়িকা বিদ্যা সিনহা মিমের নাকি নিয়মিত যাতায়াত ছিলো সেখানে। অঅভিযোগ আছে বেনজির আহমেদের সাথে বিদ্যা সিনহা মিমের ছিলো ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক । এছাড়াও গুলশানে এক দিনেই তাঁর পরিবারের নামে ৪টি বিলাসবহুল ফ্ল্যাট কেনা হয়।
দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)-এর অনুসন্ধানে তাঁর ও তাঁর পরিবারের (স্ত্রী জিশান মির্জা এবং কন্যা ফারহীন ও তাহসিন) নামে বিশাল অবৈধ সম্পদের খোঁজ মেলে। ২০২৪ সালের মে মাসে ঢাকা আদালত তাঁর ৩৩টি ব্যাংক অ্যাকাউন্ট ও সব সম্পত্তি ক্রোক করার আদেশ দেন।
পরবর্তীতে ২০২৫ সালের ২২ ডিসেম্বর আদালতের নির্দেশে গুলশানের জব্দকৃত ৪টি ফ্ল্যাটের মালামাল সরাসরি সরকারি ‘প্রধান উপদেষ্টার ত্রাণ ও কল্যাণ তহবিলে’ স্থানান্তর করা হয়।
র্যাব এবং পুলিশের শীর্ষ পদে থাকাকালীন বিভিন্ন সময়ে বড় কোনো রাজনৈতিক সংকট বা আওয়ামী সরকারের ব্যর্থতা আড়াল করতে “জঙ্গি নাটক” সাজাতেন তিনি।
ঢাকার বাইরের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে নিরীহ ও সাধারণ তরুণদের তুলে এনে, তাঁদের ওপর অমানুষিক নির্যাতন চালিয়ে কথিত ‘জঙ্গি আস্তানা’ বা ‘বন্দুকযুদ্ধ’-এর নাটক সাজিয়ে রাজনৈতিক ফায়দা হাসিল এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাহবা পাওয়ার চেষ্টা করতেন তিনি।
আইজিপি থাকাকালীন (২০২০-২০২২) পুলিশ বাহিনীতে কনস্টেবল, সাব-ইন্সপেক্টর (SI) নিয়োগ এবং বিভিন্ন লাভজনক থানায় অফিসার ইন চার্জ (OC) বা জেলা এসপি (SP) পদায়নের ক্ষেত্রে কোটি কোটি টাকার ঘুষের সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ করতেন বেনজীর।
বাহিনীর ভেতরে যারা সৎ, চাটুকারিতা বিরোধী এবং পেশাদার অফিসার ছিলেন, তাঁদের বেছে বেছে ওএসডি (OSD) করা, প্রত্যন্ত অঞ্চলে শাস্তিমূলক বদলি কিংবা বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠিয়ে ক্যারিয়ার ধ্বংস করে দেওয়া হতো। শুধুমাত্র চরম তোষামোদকারী এবং দলীয় অনুগতদের পদোন্নতি দিয়ে পুলিশের পুরো চেইন অফ কমান্ড ও নিরপেক্ষতা ধ্বংস করেছিলেন তিনি।
২০০৯ সালের ২৫-২৬ ফেব্রুয়ারি পিলখানায় ৫৭ জন সেনা কর্মকর্তাকে নৃশংসভাবে হত্যার ঘটনার পর বেনজীর আহমেদ ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) শীর্ষ পদে আসেন (২০১০ সালে ডিএমপি কমিশনার হন)।
শেখ হাসিনা সরকারের চরম বিশ্বস্ত চাটুকার হিসেবে পিলখানা হত্যাকাণ্ডের মূল কুশীলব ও নেপথ্য ষড়যন্ত্রকারীদের আড়াল করতে তিনি ছায়া হিসেবে কাজ করেছেন।
আইজিপি থাকাকালীন পিলখানা ট্র্যাজেডির পুঙ্খানুপুঙ্খ ও নিরপেক্ষ তদন্তের যেকোনো দাবিকে তিনি ক্ষমতার জোরে কঠোরভাবে দমন করেন এবং ভুক্তভোগী সেনা পরিবারগুলোকে বছরের পর বছর নজরদারিতে রেখে মানসিক নির্যাতন চালান তিনি।
তবে প্রকৃতির বিচার এড়ানো যায় না। ২০২৪ সালের মে মাসে তার বিরুদ্ধে মামলার প্রক্রিয়া শুরুর ঠিক আগে সপরিবারে দেশ ছেড়ে পালিয়ে যান বেনজীর। ২০২৫ সালের ২২ এপ্রিল আন্তর্জাতিক পুলিশ সংস্থা ইন্টারপোল তাঁর বিরুদ্ধে ‘রেড নোটিশ’ জারি করে।
২০২৬ সালের ৩ মে, ঢাকার বিশেষ জজ আদালত-৫-এর বিচারক আব্দুল্লাহ আল মামুন তাঁর বিরুদ্ধে জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জন ও মানি লন্ডারিংয়ের অভিযোগে আনুষ্ঠানিকভাবে চার্জশিট গঠন করে বিচার শুরু করেছেন । বর্তমানে তিনি বিশ্বজুড়ে পরিচিত একজন চিহ্নিত কুখ্যাত পলাতক আসামি।
ক্ষমতার দম্ভ ও জুলুমের সাম্রাজ্য যতই শক্তিশালী হোক না কেন, শেষ পর্যন্ত পতন অনিবার্য। ইতিহাসের আস্তাকুঁড়েই অপরাধীদের শেষ স্থান হয়। তবে আমরা কেউই ইতিহাস থেকে শিক্ষা নেই না।
নিউজ সম্পাদনায়:
মাহবুবুর রহমান খান।
তথ্য সহযোগিতায়
মো: হাদিউজ্জামান।