শিরোনাম :
নরসিংদীতে আলোচিত মিজান মিয়া ওরফে হৃদয় হত্যা মামলার প্রধান আসামী গ্রেফতার। সেহরির পরপরই সং/ঘ/র্ষে জড়ালো দুই গ্রুপ, বাবা ছেলেসহ প্রাণ গেল ৪ জনের। বিখ্যাত চলচ্চিত্র পরিচালক ক্যাপ্টেন এহতেশাম এবং তার চলচ্চিত্র জীবন। বিখ্যাত চলচ্চিত্রাভিনেত্রী সাবিত্রী চট্টোপাধ্যায় এর অজানা তথ্য। শিক্ষা মন্ত্রী এহসানুল হক মিলনের শিক্ষাগত যোগ্যতা। মন্ত্রী পরিবারের সন্তান এবার ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জামানত হারালেন। বাউফলে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উদযাপন উপলক্ষে প্রস্তুতিমূলক সভা অনুষ্ঠিত। দুই ভাই এক সংগে এবার ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদে। ১১৪ পটুয়াখালী ৪ আসনের নব নির্বাচিত সংসদ সদস্য  এবিএম মোশাররফ হোসেনকে মন্ত্রিসভার সদস্য করার দাবীতে সংবাদ সম্মেলন। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ২০২৬ ও সমকালীন রাজনৈতিক প্রসঙ্গ।
বুধবার, ২৫ ফেব্রুয়ারী ২০২৬, ০৫:৪১ পূর্বাহ্ন

রবীন্দ্রনাথ ও দূর্গা একটি ধর্মীয় তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ

Reporter Name / ১১৮ Time View
Update : মঙ্গলবার, ৩০ সেপ্টেম্বর, ২০২৫

–রানা চক্রবর্তী
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ঈশ্বরকে কখনোই গতানুগতিক অনুসন্ধান করতে চাননি। তাঁর সমগ্র ধ্যান ধারণা ও কর্মসাধনায় অনন্তের চৈতন্যই সমধিক গুরুত্ব পেয়েছিল। গৃহ ও গৃহকাজের মধ্যেই তিনি ঈশ্বরকে খুঁজে পেয়েছিলেন। আজ গোটা বিশ্বের গবেষকরা রবীন্দ্রনাথের কবিতা, গান, প্রবন্ধ, ছবিআঁকা নিয়ে গবেষণা করছেন। সাধারণভাবে বলা হয়ে থাকে যে, তিনি নিরাকার ঈশ্বরে বিশ্বাসী ছিলেন। তাহলে বাঙালির চিরন্তন উৎসব দুর্গাপূজা নিয়ে তাঁর ভাবনা কি ছিল? আসলে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের দুর্গাপূজা ভাবনাটা বিশেষ জটিল ছিল। তবে জটিল হলেও এটি দুর্বোধ্য নয়। যেমন—কবিগুরুর উপরোক্ত উক্তিটি জটিল হলেও এটি মোটেই দুর্বোধ্য নয়। আসলে তিনি মনেপ্রাণে বিশ্বাস করতেন যে, উৎসবের দিন একলার গৃহ সকলের গৃহ হয়। আর একারণেই ১৯০৩ সালের ২২শে অক্টোবর তারিখে বোলপুর থেকে কাদম্বিনী দেবীকে লেখা একটা চিঠিতে তিনি জানিয়েছিলেন—
“সাকার নিরাকার একটা কথার কথামাত্র। ঈশ্বর সাকার এবং নিরাকার দুই–ই। শুধু ঈশ্বর কেন আমরা প্রত্যেকেই সাকারও বটে নিরাকারও বটে। আমি এ সকল মতামত লইয়া বাদ-বিবাদ করিতে চাই না। তাঁহাকে রূপে এবং ভাবে, আকারে এবং নিরাকারে, কর্মে এবং প্রেমে সকল রকমেই ভজনা করিতে হইবে। আকার তো আমাদের রচনা নহে, আকার তো তাঁহার–ই।”
এর দু’বছর পরে ১৯১২ সালের ১৮ই মার্চ তারিখে আরেকটি চিঠিতে রবীন্দ্রনাথ কাদম্বিনী দেবীকে লিখেছিলেন—
“প্রতিমা সম্বন্ধে আমার মনে কোনো বিরুদ্ধতা নেই। অর্থাৎ যদি কোনো বিশেষ মূর্তির মধ্যেই ঈশ্বরের আবির্ভাবকে বিশেষ সত্য বলে না মনে করা যায় তাহলেই কোনো মুস্কিল থাকে না। তাকে বিশেষ কোনো একটি চিহ্নদ্বারা নিজের মনে স্থির করে নিয়ে রাখলে কোনো দোষ আছে একথা আমি মনে করিনে। কিন্তু এ সম্বন্ধে কোনো মূঢ়তাকে পোষণ করলেই তার বিপদ আছে।”
বস্তুতপক্ষে ধর্ম সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথের উদার মনোভাবের জন্য তিনি নিজেই কাদম্বিনী দেবীকে একবার লিখেছিলেন—
“নানা ব্রাহ্ম সমাজ আমাকে ঠিক ব্রাহ্ম বলে গ্রহণ করেননি এবং আমাকে তাঁরা বিশেষ অনুকূল দৃষ্টিতে কোনোদিন দেখেননি।” (চিঠিপত্র, ৭ম খণ্ড, পৃ- ২৮)
আসলে ধর্ম সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথের এই ধারণা বহুদিন আগেই গড়ে উঠেছিল বলেই প্রচলিত পূজার্চনাবিধির প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে তিনি কখনো বিন্দুমাত্র দ্বিধাবোধ করেননি। তবে আমাদের দেশের পূজার্চনাবিধি সম্পর্কে এবং এর মূল্যবোধ সম্পর্কে তাঁর শ্রদ্ধা থাকলেও দেশের সমকালীন রাজনৈতিক পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে বিচার করে এই পূজার্চনাবিধিকে যাতে কোনো কিছু কলুষিত না করে—এ সম্পর্কেও তিনি সবসময় সম্পূর্ণ সজাগ ছিলেন।
প্রসঙ্গতঃ, এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, এককালে কলকাতার জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়িতে দুর্গাপূজার প্রচলন ছিল এবং তা নীলমণি ঠাকুরের আমলে থেকেই শুরু হয়েছিল। ১৭৮৪ সালের জুন মাস থেকে নীলমণি ঠাকুর জোড়াসাঁকোয় গোলপাতার ঘর তৈরি করে বসবাস করতে শুরু করেছিলেন বলে জানা যায়। তখন অবশ্য জোড়াসাঁকোর নাম ছিল মেছুয়াবাজার। পরে নীলমণি ঠাকুরের কন্যা কমলমণি গল্প করেছিলেন যে, জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়ির—
“প্রথম দুর্গাপূজা খোলার ঘরে হয়।”
বস্তুতঃ দ্বারকানাথ ঠাকুরের সময় থেকেই জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়িতে পুজোর সমারোহ শুরু হয়েছিল। তাঁর আমলে ঠাকুরবাড়িতে দুর্গাপূজা, কালীপূজা, লক্ষ্মীপূজা, জগদ্ধাত্রীপূজা এবং এমনকি সরস্বতীপূজাও অনুষ্ঠিত হত। তবে দ্বারকানাথ যেহেতু নিজে ভক্ত বৈষ্ণব ছিলেন, তাই পুজোয় কোন ধরণের জীববলি হত না। তাঁর পৌত্র সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুরের ভাষায়—
“আমাদের বৈষ্ণব পরিবারে কী ভাগ্যি পশুবলির বীভৎস কাণ্ড ছিল না সেই রক্ষা,—পশুর বদল কুমড়ো বলি হয় এই শুনতুম।”
আর এপ্রসঙ্গে তখনকার একটি সংবাদপত্রে যে খবরটি প্রকাশিত হয়েছিল, তা এরকম ছিল—
“শ্রীযুক্ত বাবু দ্বারকানাথ ঠাকুরের সহিত রামমোহন রায়ের আত্মীয়তা আছে কিন্তু রায়জী তাঁহার নিত্যকর্ম কিছুই রহিত করাইতে পারিয়াছেন তাহা কখনই পারিবেন না। ওই বাবুর বাটিতে দুর্গোৎসব, শ্যামাপূজা, জগদ্ধত্রী পূজা ইত্যাদি তাবৎ কর্ম হইয়া থাকে।”
অন্যদিকে দ্বারকানাথ পুত্র দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরও তাঁর এক ভাষণে উল্লেখ করেছিলেন—
“প্রথম বয়সে উপনয়নের পর প্রতিনিয়ত যখন গৃহেতে শালগ্রাম শিলার অর্চনা দেখিতাম, প্রতি বৎসর যখন দুর্গাপূজার উৎসবে উৎসাহিত হইতাম তখন মনে এই বিশ্বাস ছিল যে, ঈশ্বরই শালগ্রাম শিলা, ঈশ্বরই দশভুজা দুর্গা, ঈশ্বরই চতুর্ভুজা সিদ্ধেশ্বরী।”
তবে ব্রাহ্মধর্মে দীক্ষিত হওয়ার পরে মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর দুর্গাপুজোর সময়টা ইচ্ছে করেই প্রবাসে কাটাতেন। এপ্রসঙ্গে মহর্ষি-কন্যা সৌদামিনী দেবী জানিয়েছিলেন—
“পুজোর সময় কোনও মতেই পিতা বাড়ি থাকিতেন না এজন্যই পুজোর উৎসবে যাত্রা গান আমোদ যত কিছু হইত তাহাতে আর সকলেই মাতিয়া থাকিতেন কিন্তু মা তাহার মধ্যে কিছুতে যোগ দিতে পারিতেন না। ষষ্ঠীর দিন সবাইকে জিনিসপত্র ‘বিলি’ করে দেওয়া হত। শুধু ছেলেমেয়েরাই নয়, আত্মীয়-স্বজন, কর্মচারী, ভৃত্য এবং ঝিয়েরাও নতুন জামাকাপড় পেতেন। এর পরে আসত পার্বণীর পালা। … দ্বারকানাথ অত্যন্ত দরাজ ছিলেন এবং প্রচুর খরচ করতেন। এ সময়েই মোয়া, ক্ষীর প্রভৃতি মিশিয়ে একটি বৃহদাকার মেঠাই পুজোর সময় তৈরি করা হত এবং ফুটবলসদৃশ এই বিশাল মেঠাইয়ের স্মৃতি অনেকের মন থেকেই মিলিয়ে যায়নি।”
অন্যদিকে রবীন্দ্রনাথের মেজদা সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুর সেকালের ঠাকুরবাড়ির দুর্গোৎসব প্রসঙ্গে জানিয়েছিলেন—
“দালানে গিয়ে সন্ধ্যার আরতি দেখতুম, তাদের ধূপধুনা বাদ্যধ্বনির মধ্যে আমরা ঠাকুরকে প্রণাম করে আসতুম, এত বাহ্য আড়ম্বরের মধ্যে এই যা ভিতরকার আধ্যাত্মিক জিনিস।”
তখন বিজয়ার দিন প্রতিমার নিরঞ্জনের মিছিলে ঠাকুরবাড়ির ছেলেরাও যোগ দিতেন। এপ্রসঙ্গে মহর্ষি-কন্যা সৌদামিনী দেবী লিখেছিলেন—
“আমাদের বাড়িতে যখন দুর্গোৎসব ছিল ছেলেরা বিজয়ার দিনে নতুন পোশাক পরিয়া প্রতিমার সঙ্গে চলিত আমরা মেয়েরা সেইদিন তেতালার ছাদে উঠিয়া প্রতিমা বিসর্জন দেখিতাম। তখন বৎসরের মধ্যে সেই একদিন আমরা তেতলার ছাদে উঠিবার স্বাধীনতা পাইতাম।”
আর এজন্য মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথের পিসতুতো ভাই চন্দ্রমোহন একবার মহর্ষিকে অভিযোগ করে বলেছিলেন—
“দেখ দেবেন্দ্র, তোমার বাড়ির মেয়েরা বাহিরের খোলা ছাদে বেড়ায়। আমরা দেখিতে পাই, আমাদের লজ্জা করে। তুমি শাসন করিয়া দাও না কেন?”
তবে দেবেন্দ্র কিন্তু এব্যাপারে বাড়ির মেয়েদের কিছু বলাটা তখন ঠিক কাজ বলে মনে করেননি।
অন্যদিকে সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুরের কাছে তখন—
“বিজয়ার রাত্রে শান্তিজল সিঞ্চন ও ছোটবড় সকলের মধ্যে সদ্ভাবে কোলাকুলি”
—খুব প্রিয় ছিল। এছাড়াও সত্যেন্দ্রনাথ আরো জানিয়েছিলেন—
“বিজয়ার দিন প্রত্যুষে আমাদের গৃহনায়ক বিষ্ণু আগমনী ও বিজয়ার গান করতে আসতেন।”
অন্যদিকে এপ্রসঙ্গে অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর লিখেছিলেন—
“এরপরে বিজয়া। সেইটে ছিল আমাদের খুব আনন্দের দিন। সেদিনও কিছু কিছু পার্বণী মিলত। আমাদের বুড়োবুড়ো কর্মচারী যাঁরা ছিলেন যোগেশদাদা প্রভৃতিকে আমরা পেন্নাম করে কোলাকুলি করতুম। বুড়ো বুড়ো চাকরাও সব এসে আমাদের টিপটিপ করে পেন্নাম করত। তখন কিন্তু ভারি লজ্জা হত। খুশিও যে হতুম না তা নয়। কর্তামশায়কে কর্তাদিদিমাকে এ বাড়ির ও বাড়ির সকলেই প্রণাম করতে যেতুম। বরাবরই আমরা বড়ো হয়েও কর্তামশায়কে প্রতিবছর প্রণাম করতে যেতুম। তিনি জড়িয়ে ধরে বলতেন, ‘আজ বুঝি বিজয়া’।”
আর এরপরে পরবর্তীকালে নিজেদের বাড়িতে অনুষ্ঠিত বিজয়া সম্মিলনী প্রসঙ্গে তিনি লিখেছিলেন—
“বসত মস্ত জলসা। খাওয়া দাওয়া, আতর পান, গোলাপজলের ছড়াছড়ি। ঝাড়বাতি জ্বলছে। কিন্তু ওস্তাদ তানপুরা নিয়ে গানে গানে মাত করে দিতেন।”
সেযুগে জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়ির মা দুর্গাকে খাঁটি সোনার গয়না দিয়ে সাজানো হত, এবং সালংকার সেই প্রতিমাকেই গঙ্গায় বিসর্জন দেওয়া হত। এপ্রসঙ্গে ক্ষিতীন্দ্রনাথ ঠাকুরের স্মৃতিকথায় পাওয়া যায়—
“… ভাসানের সময়েও সে গহনা খুলিয়া লওয়া হইত না সম্ভবত ভাসানের নৌকার দাঁড়ি মাঝি বা অন্য কর্মচারীরা তাহা খুলিয়া লইত, কিন্তু প্রতিমার গা-সাজানো গহনা আবার ঘুরিয়া ফিরিয়া বাড়িতে উঠিত না।”
এমনকি দেবেন্দ্রনাথ কর্তৃক তত্ত্বাবোধিনী সভা প্রতিষ্ঠিত হওয়ার দশ বছর পরেও জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়িতে দুর্গাপূজা আর জগদ্ধাত্রী পূজা নিয়মিতভাবেই অনুষ্ঠিত হয়েছিল। এর কারণ সম্পর্কে জানাতে গিয়ে মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথের কনিষ্ঠ ভ্রাতা নগেন্দ্রনাথ জানিয়েছিলেন—
“দুর্গোৎসব আমাদের সমাজ-বন্ধন, বন্ধু-মিলন ও সকলের সঙ্গে সদ্ভাব স্থাপনের একটি উৎকৃষ্ট ও প্রশস্ত উপায়। ইহার উপরে হস্তক্ষেপ করা উচিত হয় না; করিলে সকলের মনে আঘাত লাগিবে।”
আর রবীন্দ্রনাথের কাছে বোধহয় দুর্গোৎসব নিয়ে নিজের ছোটোকাকার এই ধারণাই বেশি গ্রহণযোগ্য বলে মনে হয়েছিল।
একারণেই জ্ঞানেন্দ্রনাথ চট্টোপাধ্যায় যখন আদি ব্রাহ্মসমাজের ভার নিয়েছিলেন, তখন আদি ব্রাহ্মসমাজের বেদিতে কোন অব্রাহ্মণ আসীন হওয়া নিয়ে একটি আলোচনা সূত্রে রবীন্দ্রনাথ শান্তিনিকেতন থেকে তাঁকে ১৯১১ সালের ১৫ই সেপ্টেম্বর বা ১৩১৮ বঙ্গাব্দের ২৯শে ভাদ্র তারিখের একটি চিঠিতে লিখেছিলেন—
“যদি আদি সমাজে ব্রাহ্মণপূজাই চালাতে চান তবে তেত্রিশ কোটি কি অপরাধ করল? আমার নাম করে বলো পুতুলপুজা তেমন দোষের নয় কারণ তাকে আড়ম্বর বলে গণ্য করা যায়, কিন্তু ব্রাহ্মণকে অন্যান্য সকল মানুষের চেয়ে পুজ্য বলে গণ্য করা ঈশ্বরের নিকট যথার্থ পাপ কারণ তাতে অন্যান্য মানবকে অপমান করা হয়, এই পাপ আমি আদি সমাজে কিছুতেই রাখতে দেব না।”
এখানে বলাই বাহুল্য যে, ইতিহাসের দিক থেকে রবীন্দ্রনাথের এই চিঠিটি একারণে বিশেষ মূল্যবান যে, এরমধ্যে দিয়ে সমাজবিপ্লবী রবীন্দ্রনাথের বজ্রগম্ভীর বাণী আমাদের সচেতন করে তোলে।
বাঙালি জাতির ইতিহাস লক্ষ্য করলে দেখা যায় যে, অবর্ণনীয় দুঃখ আর অনির্বচনীয় আনন্দের ঠিক মাঝখানটিতে বাঙালি চিরকাল দাঁড়িয়ে রয়েছে। এটাই হল জাতিগতভাবে বাঙালির অনন্যতা, আর এখানেই বাঙালির অমরত্ব। এই কোজাগরী পূর্ণতার মধ্যেই বাঙালি হিন্দুরা যখন মৃন্ময়ী জননীর মুখ দেখতে পান, তখন ক্ষুদ্রতায় ঘেরা তাঁর গৃহকোণ জীবনলীলার মহাঙ্গন হয়ে ওঠে। ফলে জগজ্জননী বসুন্ধরা বাঙালি হিন্দুর কাছে বিশ্বরূপা, ভয়ঙ্করী আদ্যশক্তি থেকে শুভঙ্করীতে রূপান্তরিত হয়ে যান। আর এই জীবন প্রতিমতা থেকেই তখন বাঙালির হাতে প্রতিমা জন্ম নেয়। ফলে মাতৃপূজা হয়ে ওঠে মুক্তির পূজা, মানুষের পূজা। এতে দেবী বাঙালি হিন্দুর কাছে মানবীমূর্তিতে গার্হস্থ্য গরিমায় দেখা দেন। একারণেই রবীন্দ্রসাহিত্যে দুর্গাপূজা খুবই স্বাভাবিকভাবেই এসেছে; আর রবীন্দ্রনাথ রচিত কবিতায়, ছড়ায়, গল্পে, উপন্যাসে সর্বত্রই দুর্গা উৎসবের প্রাসঙ্গিকতা দেখতে পাওয়া যায়। বিশেষতঃ নিজের কিছু ছোটো গল্পের মধ্যে রবীন্দ্রনাথ দুর্গাপুজোকে যে স্থান দিয়েছেন, তা রীতিমত লক্ষ্যণীয়। যেমন—তাঁর ‘দেনা পাওনা’ গল্পের রামসুন্দর মিত্রকে আজও বহু মেয়ের পিতার মধ্যে দেখতে পাওয়া যায়, যাঁদের দুর্ভাগা কন্যারা তাঁদের শ্বশুরবাড়িতে এক নিদারুণ মানসিক এবং কখনও বা শারীরিক নির্যাতন ও লাঞ্ছনার মধ্যে দিয়ে দিন কাটান। তাঁদের অপরাধ এটাই যে, তাঁদের পিতারা পর্যাপ্ত পরিমাণে যৌতুক দিতে অপারগ ছিলেন। রবীন্দ্রসাহিত্যে রামসুন্দর মিত্রের কন্যা নিরুপমাকেও তাঁর শ্বশুরবাড়িতে এই একই অপরাধের জন্য এক অমানুষিক নির্যাতনের বলি হতে হয়েছিল। এমনকি শ্বশুরবাড়িতে তাঁর আদরের কন্যা নিরুপমা কেমন আছেন, তা দেখতে গিয়ে রামসুন্দর মিত্রকেও বারবার নিদারুণ অপমানের সম্মুখীন হতে হয়েছিল। তাই অবশেষে, রামসুন্দর—
“মনে মনে প্রতিজ্ঞা করিলেন, যতদিন না সমস্ত টাকা শোধ করিয়া দিয়া অসংকোচে কন্যার উপরে দাবি করিতে পারিবেন, ততদিন আর বেহাইবাড়ি যাইবেন না।”
কিন্তু পিতার মন বলে দেখতে দেখতে পুজোর সময় চলে আসবার ফলে রামসুন্দর আর স্থির থাকতে পারেননি।
“আশ্বিন মাস আসিল। রামসুন্দর বলিলেন, ‘এবার পূজার সময় মাকে ঘরে আনিবই, নহিলে আমি’ খুব একটা শক্ত রকম শপথ করিলেন’। পঞ্চমী কি যষ্ঠীর দিনে আবার চাদরের প্রান্তে গুটিকতক নোট বাঁধিয়া রামসুন্দর যাত্রার উদ্যোগ করিলেন। পাঁচ বৎসরের এক নাতি আসিয়া বলিল, ‘দাদা, আমার জন্যে গাড়ি কিনতে যাচ্ছিস?’ বহুদিন হইতে তাঁহার ঠেলাগাড়িতে চড়িয়া হাওয়া খাইবার শখ হইয়াছে, কিন্তু কিছুতেই তাহা মিটিবার উপায় হইতেছে না। ছয় বৎসরের এক নাতিনী আসিয়া সরোদনে কহিল, পূজার নিমন্ত্রণে যাইবার মতো তাঁহার একখানিও ভালো কাপড় নাই। রামসুন্দর তা জানিতেন এবং সে-সম্বন্ধে তামাক খাইতে খাইতে বৃদ্ধ অনেক চিন্তা করিয়াছেন। রায়বাহাদুরের বাড়ি যখন পূজার নিমন্ত্রণ হইবে তখন তাঁহার বধূগণকে অতি যৎসামান্য অলংকারে অনুগ্রহণপাত্র দরিদ্রের মতো যাইতে হইবে, একথা স্মরণ করিয়া তিনি অনেক দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলিয়াছেন; কিন্তু তাহাতে তাঁহার ললাটের বার্ধক্যরেখা গভীরতর অঙ্কিত হওয়া ছাড়া আর কোনো ফল হয় নাই।”
এছাড়া রবীন্দ্রনাথ তাঁর বেশ কিছু প্রবন্ধেও দুর্গাপ্রসঙ্গ নানাভাবে আলোচনা করেছিলেন, যেগুলিতে বিষয়ের তাৎপর্য অনুযায়ী তাঁর আলোচনার গভীরতাও বিভিন্ন রূপ নিয়েছিল। যেমন—‘লোকসাহিত্য’–র অন্তর্ভুক্ত ‘ছেলেভুলানো ছড়া’ নামক প্রবন্ধটি একটি বহু প্রচলিত ছড়া প্রসঙ্গে রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন—
“আমাদের বাংলাদেশের এক কঠিন অন্তরবেদনা আছে মেয়েকে শ্বশুরবাড়ি পাঠানো। অপ্রাপ্তবয়স্ক অনভিজ্ঞ মূঢ় কন্যাকে পরের ঘরে যাইতে হয়, সেইজন্য বাঙালি কন্যার মুখে সমস্ত বঙ্গদেশের একটি ব্যাকুল করুণ দৃষ্টি নিপতিত রহিয়াছে। সেই সকরুণ কাতর স্নেহ বাংরবার শারদোৎসবে স্বর্গীয়তা লাভ করিয়াছে। আমাদের এই ঘরের স্নেহ, ঘরের দুঃখ, বাঙালির গৃহের এই চিরন্তন বেদনা হইতে অশ্রুজল আকর্ষণ করিয়া লইয়া বাঙালির হৃদয়ের মাঝখানে শারদোৎসব পল্লবে ছায়ায় প্রতিষ্ঠিত হইয়াছে। ইহা বাঙালির অম্বিকাপূজা এবং বাঙালির কন্যাপূজাও বটে। আগমনী এবং বিজয়া বাংলার মাতৃহৃদয়ের গান। অতএব সহজেই ধরিয়া লওয়া যাইতে পারে যে, আমাদের ছড়ার মধ্যে বঙ্গজননীর এই মর্মব্যথা নানা আকারে প্রকাশ পাইয়াছে।

‘আজ দুর্গার অধিবাস, কাল দুর্গার বিয়ে।
দুর্গা যাবেন শ্বশুরবাড়ি, সংসার কাঁদায়ে॥
মা কাঁদেন, মা কাঁদেন ধূলায় লুটায়ে।
সেই-যে মা পলাকাটি দিয়েছেন গলা সাজায়ে॥
বাপ কাঁদেন, বাপ কাঁদেন দরবারে বসিয়ে।’ …”

আসলে রবীন্দ্রনাথের মানবধর্ম আবিষ্কার হঠাৎ করে হয়নি, বরং তাঁর এই আবিষ্কারের পিছনে কয়েক হাজার বছরের ভারতীয় সভ্যতা, দর্শন ও সংস্কৃতির বিবর্তন রয়েছে। এমনকি হিন্দু ও মুসলমানের মধ্যে সৃষ্টিশীল আদান-প্রদানের ইতিহাসের বিষয়েও রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের আগ্রহ বেশ গভীর ছিল। রবীন্দ্রনাথ বিশ্বাস করতেন যে, সমসাময়িকতায় আচ্ছন্ন অনেক ভারতীয় ইসলামের এই প্রভাবকে মেনে না নিলেও, হিন্দুধর্মের বিবর্তনকে নিরপেক্ষভাবে দেখলে মহান ধর্ম ইসলামের সৃষ্টিশীল প্রভাবকে অস্বীকার করবার কোনও উপায় থাকে না। আর একারণেই তিনি বারবার বলেছিলেন যে, ধর্মীয় সহিষ্ণুতার ব্যাপারে সম্রাট আকবরের উদার প্রয়াস ভারতের রাজনীতির ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। প্রসঙ্গতঃ স্মরণীয় যে, ভারতের ইতিহাসকে জানাও রবীন্দ্রনাথের শিক্ষাক্রমের এক গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল। আর এজন্য তাঁর সেসব পণ্ডিতদের প্রয়োজন হয়েছিল, যাঁরা শাস্ত্রে পারদর্শী হয়েও গোঁড়ামিতে আবদ্ধ ছিলেন না। তাই বাঙালি হিন্দুর চিরন্তন উৎসব দুর্গোৎসবকেও তিনি অতীব গুরত্বের সঙ্গে গ্রহণ করেছিলেন। একথার উদাহরণস্বরূপ বলা চলে যে, নিজের বহু চিঠিপত্রের মধ্যেও রবীন্দ্রনাথ দুর্গা এবং দুর্গাপূজাকে কেন্দ্র করে নানা বিষয়ে তাঁর অভিমত ব্যক্ত করেছিলেন। এপ্রসঙ্গে এখানে প্রথমে রবীন্দ্রনাথের তেমন কয়েকটি চিঠিপত্রের কথা উল্লেখ করা যেতে পারে, যেগুলিতে ধর্মের ব্যাপারে তাঁর বক্তব্য পরিস্ফুটিত হয়ে উঠেছিল।
১৯৩৪ সালের ২৫শে এপ্রিল তারিখে শান্তিনিকেতন থেকে একটি চিঠিতে তিনি অমিয় চক্রবর্তীকে লিখেছিলেন—
“… আমি যে জন্মব্রাত্য, শিশুকাল থেকেই আমি শ্রেণীভ্রষ্ট, এমনকি ব্রাহ্মসমাজও আমাকে খুঁটিতে বাঁধতে পারেনি। এইজন্যেই দেশের লোকের কাছ থেকে আমি প্রশংসা পেয়েছি প্রীতি পাইনি। কিন্তু বাঁধনের শর্তে প্রীতি যদি না পেয়ে থাকি তবে তা নিয়ে খেদ করব না। …”
এর আগে ১৯৩১ সালের ২৬শে জুলাই তারিখে শান্তিনিকেতন থেকে হেমন্তবালা দেবীকে রবীন্দ্রনাথ একটি চিঠিতে লিখেছিলেন—
“… আমি যে গৃহে জন্মেছি সেখানকার ধর্মেই দীক্ষা পেয়েছিলুম। সে ধর্মও বিশুদ্ধ। কিন্তু আমার মন তারই মাপে নিজেকে ছেঁটে নিতে কোনোমতেই রাজি ছিল না। তবু আমি এ নিয়ে টানা হেঁচড়া না করে বেশ সহজভাবেই আপন প্রকৃতির পথে চলেছিলুম। সেই পথ ধরেই আজ আমি নিজের উপযোগী গন্তব্যস্থানে পৌঁছেছি। এটাকে অপরাধ বলে মাথা খুঁড়ে মরি নি। …”
আর এর পরের দিনই, অর্থাৎ—১৯৩১ সালের ২৭শে জুলাই তারিখে হেমন্তবালা দেবীকে আরেকটি চিঠিতে রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন—
“… কিন্তু একটি কথা মনে রেখ, চতুষ্পদে আমার চলা; সম্প্রদায়ের দুর্গে রুদ্ধদ্বারের মধ্যে আমি বাঁচি নে। এই জন্যে যদিও আমিও নিজের মত গোপন করি নে, তবু কাউকে ডাকাডাকি করে কোনদিন বলিনে আমার মত গ্রহণ করো। তুমি নিজের পথে নিজের মতে চললে তোমার প্রতি আমার স্নেহ কিছুমাত্র ক্ষুণ্ন হবে এমন শঙ্কা কোনোদিন কোরো না। …”
আবার এই হেমন্তবালা দেবীকেই ১৯৩২ সালের ৮ই নভেম্বর তারিখের আরেকটি চিঠিতে রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন—
“… তোমার মা আমাকে ভুল বুঝেছেন। অবশ্য ধর্মমত আমার আছে কিন্তু কোনো সম্প্রদায় আমার নেই। আমি নিজেকে ব্রাহ্ম বলে গণ্যই করিনে। … কোনো ধর্মসম্প্রদায়ের দীক্ষা দেওয়া আমার পক্ষে অসাধ্য। কেননা আমি নিজেই যূথভ্রষ্ট, আমি ধর্মসমাজের তক্মাপরা ছাপ-মারাদের মধ্যে কেই নই, রাজার দত্ত উপাধি আমি ত্যাগ করেছি, সম্প্রদায়ের দত্ত উপাধিও আমার নেই। …”
এরপরে হেমন্তবালাদেবীর কন্যা বাসন্তী দেবীকে ১৯৩৩ সালের ৫ই নভেম্বর তারিখের একটি চিঠিতে রবীন্দ্রনাথ এবিষয়ে প্রায় একই মতামত জানিয়ে লিখেছিলেন—
“শুনে আশ্চর্য হবে তোমার সঙ্গে আমাদের ধর্মের অমিল নেই। আমি দীক্ষা নিই নি, নেবও না, আমার ভগবান কোনো সম্প্রদায়ের ছাঁচে ঢালা ভগবান নন। …”
তবে ধর্ম সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথ তাঁর সবথেকে মূল্যবান অভিমতটি হেমন্তবালা দেবীকে লিখিত ১৯৩৪ সালের ১৭ই আগস্ট তারিখের একটি চিঠিতে ব্যক্ত করেছিলেন। শান্তিনিকেতন থেকে এই চিঠিতে রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন—
“… তোমাদের সমাজের দিক থেকে আমি ব্রাত্য, আমি এক ঘরে, আমি অস্পৃশ্য। এই বর্জন আমার জীবনে দেবতার বরের মত কাজ করছে, এতে মানুষের অভিশাপ যদি লাগে, তবে তাতে সাপের নিঃশ্বাস লাগবে মাত্র বিষ লাগবে না। …”
আর তাঁর মনের এই ভাবটিই এরপরে ‘পত্রপুট’–এর পনেরো সংখ্যক কবিতায় প্রকাশ পেয়েছিল।

“হে চিরকালের মানুষ, হে সকল মানুষের মানুষ,
পরিত্রাণ কর,—
ভেদচিহ্নের তিলক–পরা
সংকীর্ণতার ঔদ্ধত্য থেকে।
হে মহান পুুরুষ, ধন্য আমি, দেখেছি তোমাকে
তামসের পরপার হতে
আমি ব্রাত্য, আমি জাতিহারা। …
আমি ব্রাত্য, আমি মন্ত্রহীন
সকল মন্দিরের বাহিরে
আমার পূজা আজ সমাপ্ত হল
দেবলোক থেকে
মানবলোকে,
আকাশে জ্যোতির্ময় পুরুষ
আর মনের মানুষে আমার অন্তরতম আনন্দে।”

আসলে ধর্ম সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথের এই ধারণা বহুদিন আগেই গড়ে উঠেছিল বলেই প্রচলিত পূজার্চানাবিধির প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে তিনি কখনো বিন্দুমাত্র দ্বিধাবোধ করেননি। কিন্তু আমাদের দেশের পূজার্চনাবিধি সম্পর্কে এবং এর মূল্যবোধ সম্পর্কে তাঁর শ্রদ্ধা থাকলেও দেশের সমকালীন রাজনৈতিক পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে বিচার করে এই পূজার্চনাবিধিকে কোনো কিছু যাতে কলুষিত না করে, এসম্পর্কেও তিনি সম্পূর্ণ সজাগ ছিলেন। একারণেই পুলিনবিহারী সেনকে ১৯৩৭ সালের ২০শে নভেম্বর তারিখের একটি চিঠিতে রবীন্দ্রনাথ একটি ঘটনার উল্লেখ করে লিখেছিলেন—
“একদিন আমার পরেলোকগত বন্ধু হেমচন্দ্র বসু মল্লিক বিপিন পাল মহাশয়কে সঙ্গে করে একটি অনুরোধ নিয়ে আমার কাছে এসেছিলেন। তাঁদের কথা ছিল এই যে, বিশেষভাবে দুর্গামূর্তির সঙ্গে মাতৃভূমির দেবীরূপ মিলিয়ে দিয়ে তাঁরা শারদীয়া পূজার অনুষ্ঠানকে নূতনভাবে দেশে প্রবর্তিত করতে চান, তার উপযুক্ত ভক্তি ও উদ্দীপনামিশ্রিত স্তবের গান রচনা করবার জন্য আমার প্রতি তাঁদের বিশেষ অনুরোধ। আমি অস্বীকার করে বলেছিলুম, এ-ভক্তি আমার আন্তরিক হতে পারে না; সুতরাং এতে আমার অপরাধের কারণ ঘটবে। বিষয়টা যদি কেবলমাত্র সাহিত্যের ক্ষেত্রের অধিকারগত হত তাহলে আমার ধর্মবিশ্বাস যাই হোক আমার পক্ষে তাতে সংকোচের কারণ থাকত না; কিন্তু ভক্তির ক্ষেত্রে পূজার ক্ষেত্রে অনধিকার প্রবেশ গর্হণীয়। আমার বন্ধুরা সন্তুষ্ট হননি। আমি রচনা করেছিলুম ‘ভূবনমনোমোহিনী’, এ গান পূজামণ্ডপের যোগ্য নয় সে কথা বলা বাহুল্য।”
তবে তা বলে পুজোর সময় কি রবীন্দ্রনাথ ব্যস্ত থাকতেন না? অবশ্যই থাকতেন, কিন্তু অন্য কাজে—লেখালেখির কাজে। সেযুগেও পুজোর সময়ে নামী লেখকদের লেখা পাওয়ার জন্য বিভিন্ন পত্রপত্রিকার সম্পাদকেরা পুজোর বেশ কিছুদিন আগে থেকেই তোড়জোড় শুরু করে দিতেন। তাই বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় লেখা দেওয়ার জন্য নানা সম্পাদকের কাছ থেকে রবীন্দ্রনাথও অনুরোধ পেতেন। তবে এবিষয়ে ইতিহাস থেকে যত দূর জানা যায়, রবীন্দ্রনাথ ‘পার্বণী’ নামের একটি শারদীয় বার্ষিকীতে প্রথম নিজের পুজোর লেখা দিয়েছিলেন। এই ‘পার্বণী’ ছিল প্রথম বাংলা পূজাবার্ষিকী। এটি ১৩২৫ বঙ্গাব্দে প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল, এবং রবীন্দ্রনাথের ছোট জামাই নগেন্দ্রনাথ গঙ্গোপধ্যায় এর সম্পাদনার দায়িত্বে ছিলেন। এই পত্রিকার প্রথম পূজাবার্ষিকীতে রবীন্দ্রনাথ—‘শরতে আজ কোন্ অতিথি এল প্রাণের দ্বারে’—গানটি ‘শরতের গান’ নাম দিয়ে লিখেছিলেন। আর লিখেছিলেন ‘ইচ্ছাপূরণ’ নামক গল্পটি ও ‘ঠাকুর্দ্দার ছুটি’ নামক কবিতাটি। এই ‘পাবর্ণী’ পত্রিকার প্রথম শারদীয় বার্ষিকীটি হাতে পেয়ে রবীন্দ্রনাথ এর সম্পাদক নগেন্দ্রনাথ গঙ্গোপাধ্যায়কে একটি চিঠিতে লিখেছিলেন—
“তোমার ‘পার্বণী’ পড়িয়া বিশেষ আনন্দ পাইয়াছি। ইহা ছেলে বুড়ো সকলেরই ভালো লাগিবে। তোমার পরিশ্রম সার্থক হইয়াছে। দেশের প্রায় সমস্ত বিখ্যাত লেখকদের ঝুলি হইতে বাংলাদেশের ছেলেদের জন্য এই যে পার্বণী আদায় করিয়াছ ইহা একদিকে যত বড়োই দুঃসাধ্য কাজ অন্যদিকে ততবড়ই পুণ্য কর্ম। বস্তুত ইহার বৈচিত্র্য। সৌষ্ঠব ও সরসতা দেখিয়া বিস্মিত হইয়াছি অথচ ইহার মধ্যে পাঠকদের জানিবার ভাবিবার বুঝিবার কথাও অনেক আছে। তোমার এই সংগ্রহটি কেবলমাত্র ছুটির সময় পড়িয়া তাহার পরে পাতা ছিঁড়িয়া, ছবি কাটিয়া, কালি ও ধুলার ছাপ মারিয়া জঞ্জালের সামিল করিবার সামগ্রী নহে ইহা আমাদের শিশুসাহিত্যের ভাণ্ডারে নিত্যব্যবহারের জন্যই রাখা হইবে। প্রথম খণ্ড পার্বণীতে যে আদর্শে ডালি সাজাইয়াছ বৎসরে বৎসরে তাহা রক্ষা করিতে পারিলে মা ষষ্ঠী ও মা সরস্বতী উভয়েরই প্রসাদ লাভ করিবে। আজকাল কাগজ প্রভৃতির দুর্মূল্যতার দিনে কেমন করিয়া দেড় টাকা দামে তুমি এই বই বাহির করিলে বুঝিতে পারিলাম না। বোধ করি সংগ্রহ করিবার উৎসাহে লাভ লোকসান খতাইয়া দেখিবার সময়ও পাও নাই।
ইতি
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।
৯ই আশ্বিন, ১৩২৫।”
এমনকি এরপরে ১৯৩৫ সালেও ‘আনন্দবাজার’ ও ‘দেশ’ পত্রিকার পক্ষ থেকে পুজো সংখ্যায় লেখা দেওয়ার জন্য রবীন্দ্রনাথকে একশো টাকা বায়না দেওয়া হয়েছিল। এই ঘটনাটির উল্লেখ করে রবীন্দ্রনাথ ১৯৩৫ সালের ২৯শে আগস্ট তারিখে শান্তিনিকেতন থেকে রামানন্দ চট্টোপাধ্যায়কে একটি চিঠিতে লিখেছিলেন—
“এখানকার বন্যাপীড়িতদের সাহায্যার্থে অর্থসংগ্রহ-চেষ্টায় ছিলুম। ব্যক্তিগতভাবে আমারও দুঃসময়। কিছু দিতে পারছিলুম না বলে মন নিতান্ত ক্ষুব্ধ ছিল। এমন সময় দেশ ও আনন্দবাজারের দুই সম্পাদক পূজার সংখ্যার দুটি কবিতার জন্যে একশো টাকা বায়না দিয়ে যান, সেই টাকাটা বন্যার তহবিলে গিয়েছে। আগেকার মতো অনায়াসে লেখবার ক্ষমতা এখন নেই। সেইজন্যে ‘বিস্ময়’ কবিতাটি দিয়ে ওদের ঋণশোধ করব বলে স্থির করেছি। ক্লান্ত কলম নতুন লেখায় প্রবৃত্ত হতে অসম্মত। …”
আসলে সেযুগের শারদীয় সংখ্যায় রবীন্দ্রনাথের লেখা পাওয়ার জন্য সম্পাদকের চেষ্টার কোন অন্তঃ থাকত না। আর যে পত্রিকা সম্পাদক তখন তাঁর কাছ থেকে পুজোর লেখা আদায় করতে সক্ষম হতেন না তিনি তাঁর কাছে অনুযোগ করতেন। এমনকি এব্যাপারে তখন কখনও কখনও উড়ো খবরও প্রচারিত হত। যেমন—‘কবিতা’ পত্রিকার সম্পাদক বুদ্ধদেব বসু একবার খবর পেয়েছিলেন যে, রবীন্দ্রনাথ নাকি সেবছর পুজোতে সঞ্চয় ভট্টাচার্যের পত্রিকায় লেখা দিচ্ছেন। এর রবীন্দ্রনাথ বুদ্ধদেব বসুকে শান্তিনিকেতন থেকে ১৯৩৯ সালের ২রা আগস্ট তারিখে লেখা একটি চিঠিতে বলেছিলেন—
“নিজের কাজের ভিড় জমে উঠেছে তাছাড়া শরীর ক্লান্ত। লিখে ওঠা সম্ভব হবে না। খোঁচার ঘায়ে খেজুরের গাছের অসম্মান করলে সে রস দেয়, বোধহয় এই গুজবটা রটে গেছে তাই সঞ্জীব ভট্টাচার্য তাঁর পুজোর সংখ্যক কাগজের জন্য আমার একখানা লেখা দাবি করেছেন, আমি বিস্মিত।”
এই চিঠিতে উল্লেখিত ‘সঞ্জীব ভট্টাচার্য’ খুব সম্ভবতঃ ‘সঞ্জয় ভট্টাচার্য’ই হবেন।
তবে বিজয়া দশমী নিয়ে রবীন্দ্রনাথের ভাবনা, চিন্তা ও আগ্রহ কম কিছু ছিল না। বরং সমস্ত রকমের ধর্মীয় সংকীর্ণতা এবং কুসংস্কারের বেড়াজালকে ভেদ করে রবীন্দ্রনাথ বিজয়ার মর্মকে উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন।

N.B.লেখক সাহিত্য – সংস্কৃতি ও ইতিহাস বিশারদ।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category