• সোমবার, ০২ নভেম্বর ২০২৬, ১০:০৭ অপরাহ্ন
Headline
বড় পর্দায় জসীমউদ্‌দীনের ‘সোজন বাদিয়ার ঘাট’। শ্রমিকের অর্থনৈতিক উন্নতি মানেই দেশের অর্থনৈতিক উন্নতি—— নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী চবিতে মানবাধিকার সংগঠন এইচআরডিএসের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উদযাপন! মিরপুরে পুলিশের গাড়িতে আগুন লাগানোর কথা জানিয়ে ‘ফেসবুকে পোস্ট’, গ্রেপ্তার ১! নারীর অধিকার ও নিরাপত্তায় রাষ্ট্রের করণীয়! ডিমলায় ১৬০ কেজি পচা চিংড়ি মাছ জব্দ, দুই প্রতিষ্ঠানকে জরিমানা! বারহাট্টায় বড় ভাইয়ের লাঠির আঘাতে ছোট ভাই নি*হত, স্ত্রী-কন্যা আহত। মেসির নৈপুণ্যে মায়ামির জয়! নিরাপত্তা উদ্বেগের মধ্যে এএফসি চ্যাম্পিয়নস লিগের স্কোয়াডে নেই রোনালদো! বেতন নিয়ে আন্দোলন, মালদ্বীপে ১৫০ বাংলাদেশিকে দেশে পাঠানোর শঙ্কা!

নারীর অধিকার ও নিরাপত্তায় রাষ্ট্রের করণীয়!

Reporter Name
Update : সোমবার, ২ নভেম্বর, ২০২৬

ডেস্ক রিপোর্ট|জনতার দেশঃ

একটি সমাজের প্রকৃত অগ্রগতি নির্ভর করে সেখানে নারী কতটা স্বাধীন, নিরাপদ ও মর্যাদার সঙ্গে জীবনযাপন করতে পারছেন, তার ওপর। পরিবার থেকে রাষ্ট্র—প্রতিটি ক্ষেত্রে নারীর অবদান অপরিসীম। শিক্ষা, চিকিৎসা, কৃষি, শিল্প, ব্যবসা, প্রশাসন কিংবা রাজনীতি—সবখানেই নারীরা নিজেদের যোগ্যতার প্রমাণ দিচ্ছেন। তবু সমাজের নানা স্তরে নারীরা এখনো বৈষম্য, সহিংসতা, বাল্যবিবাহ, যৌতুক এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণে উপেক্ষার শিকার হচ্ছেন। ফলে নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠার প্রশ্নটি শুধু নারীর ব্যক্তিগত স্বাধীনতার বিষয় নয়; এটি একটি ন্যায়ভিত্তিক, মানবিক ও উন্নত সমাজ গঠনের অপরিহার্য শর্ত।
অধিকার প্রতিষ্ঠার দীর্ঘ পথচলা
নারীর অধিকার বলতে বোঝায় পুরুষের মতো সমান মর্যাদা, স্বাধীনতা, সুযোগ ও আইনি সুরক্ষা পাওয়ার অধিকার। শিক্ষা গ্রহণ, সম্পত্তির মালিকানা, নিজের পেশা বেছে নেওয়া, মতপ্রকাশ, রাজনৈতিক অংশগ্রহণ, নিরাপদ কর্মপরিবেশ এবং নিজের জীবন সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেওয়া—এসবই নারীর মৌলিক অধিকারের অংশ। বাংলাদেশের সংবিধান নারী-পুরুষের সমতা এবং রাষ্ট্র ও জনজীবনের সর্বস্তরে নারীর সমান সুযোগের নীতিকে স্বীকৃতি দিয়েছে। আন্তর্জাতিকভাবেও মানবাধিকার সনদ ও নারীর প্রতি সব ধরনের বৈষম্য বিলোপ সনদ নারীর সমান অধিকার প্রতিষ্ঠার গুরুত্ব তুলে ধরে। তবে আইন ও নীতিতে সমতার স্বীকৃতি থাকলেই বাস্তবে সমতা প্রতিষ্ঠিত হয় না। সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি, অর্থনৈতিক নির্ভরশীলতা এবং দীর্ঘদিনের পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতা অনেক ক্ষেত্রে নারীর অগ্রযাত্রাকে বাধাগ্রস্ত করে। তাই নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য আইনি কাঠামোর পাশাপাশি প্রয়োজন সামাজিক সচেতনতা ও মানসিকতার পরিবর্তন।
শিক্ষা ও অর্থনৈতিক স্বাধীনতা
নারীর ক্ষমতায়নের অন্যতম প্রধান ভিত্তি শিক্ষা। শিক্ষিত নারী নিজের অধিকার সম্পর্কে সচেতন হতে পারেন, কর্মসংস্থানের সুযোগ গ্রহণ করতে পারেন এবং পরিবার ও সমাজের সিদ্ধান্ত গ্রহণে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারেন। বাংলাদেশে মেয়েদের শিক্ষার প্রসার এবং বিভিন্ন পেশায় নারীর অংশগ্রহণ বেড়েছে। তৈরি পোশাকশিল্প, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা, কৃষি ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা খাতে নারীদের অবদান দেশের অর্থনীতিকে সমৃদ্ধ করছে।
তারপরও শিক্ষায় ঝরে পড়া, বাল্যবিবাহ, কর্মক্ষেত্রে বৈষম্য এবং নিরাপদ যাতায়াতের অভাব অনেক মেয়ের সম্ভাবনাকে সীমিত করে। কর্মজীবী নারীদের ক্ষেত্রে ঘরের কাজ ও সন্তান লালন-পালনের অধিকাংশ দায়িত্বও প্রায়ই তাঁদের ওপর বর্তায়। এর ফলে পেশাগত উন্নতি ব্যাহত হয়। নারীর অর্থনৈতিক স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে মানসম্মত শিক্ষা, দক্ষতা উন্নয়ন, নিরাপদ কর্মপরিবেশ, সমান কাজের জন্য সমান মজুরি এবং শিশুযত্নের সুবিধা বাড়ানো প্রয়োজন। একই সঙ্গে গৃহস্থালির কাজকে নারী ও পুরুষের যৌথ দায়িত্ব হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে হবে।
সহিংসতা ও নিরাপত্তার সংকট
নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠার পথে সবচেয়ে বড় বাধাগুলোর একটি হলো সহিংসতা। পারিবারিক নির্যাতন, যৌতুকের জন্য হয়রানি, যৌন হয়রানি, ধর্ষণ, বাল্যবিবাহ এবং অনলাইনে অপমান ও হুমকি নারীর স্বাধীন চলাচল ও আত্মবিশ্বাসকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। অনেক নারী সামাজিক সম্মানহানি, আর্থিক অনিশ্চয়তা কিংবা বিচার না পাওয়ার আশঙ্কায় নির্যাতনের কথা প্রকাশ করতে পারেন না।
শুধু আইন প্রণয়ন করলেই এ সমস্যার সমাধান হবে না; আইনের কার্যকর প্রয়োগ, ভুক্তভোগীর নিরাপত্তা, সহজলভ্য আইনি সহায়তা এবং দ্রুত ও নিরপেক্ষ বিচার নিশ্চিত করতে হবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, কর্মক্ষেত্র ও গণপরিবহনে অভিযোগ জানানোর কার্যকর ব্যবস্থা গড়ে তোলা জরুরি। পাশাপাশি পরিবার থেকেই শিশুদের সম্মতি, পারস্পরিক শ্রদ্ধা এবং নারী-পুরুষের সমান মর্যাদার শিক্ষা দিতে হবে। নারীর পোশাক, চলাফেরা কিংবা ব্যক্তিগত পছন্দকে দোষারোপ না করে সহিংসতার দায় অপরাধীর ওপরই বর্তাতে হবে।
পরিবার ও সমাজে সমান মর্যাদা
নারীর প্রতি বৈষম্যের সূচনা অনেক সময় পরিবার থেকেই হয়। একই পরিবারের ছেলে ও মেয়ের জন্য আলাদা নিয়ম, ছেলের শিক্ষাকে অগ্রাধিকার দেওয়া, মেয়ের মতামত উপেক্ষা করা কিংবা বিয়ের সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়া—এসব আচরণ নারীর স্বাধীন ব্যক্তিসত্তার বিকাশকে বাধাগ্রস্ত করে। অথচ পরিবারে নারীর মতামত, পছন্দ ও সিদ্ধান্তের গুরুত্ব স্বীকার করা হলে একটি সুস্থ সম্পর্ক ও দায়িত্বশীল সমাজ গড়ে ওঠে। সম্পত্তি ও উত্তরাধিকারের ক্ষেত্রেও নারীর অধিকার নিয়ে সচেতনতা জরুরি। বাংলাদেশে উত্তরাধিকারের নিয়ম ধর্মভেদে ভিন্ন; তাই প্রচলিত আইন সম্পর্কে সঠিক ধারণা এবং প্রাপ্য অধিকার নিশ্চিত করার ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন। একই সঙ্গে সামাজিক প্রথা বা পারিবারিক চাপের কারণে যেন কোনো নারী তাঁর আইনগত অধিকার থেকে বঞ্চিত না হন, তা নিশ্চিত করতে হবে।
রাজনীতি ও নেতৃত্বে নারীর অংশগ্রহণ
দেশের উন্নয়ন পরিকল্পনা ও নীতিনির্ধারণে নারীর সক্রিয় অংশগ্রহণ ছাড়া অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন সম্ভব নয়। স্থানীয় সরকার থেকে জাতীয় সংসদ, প্রশাসন থেকে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান—সব পর্যায়ে নারীর নেতৃত্বের সুযোগ বাড়াতে হবে। সিদ্ধান্ত গ্রহণের টেবিলে নারী থাকলে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, নিরাপত্তা, কর্মসংস্থান ও সামাজিক সুরক্ষার মতো বিষয়গুলোতে নারীর বাস্তব অভিজ্ঞতা যথাযথভাবে প্রতিফলিত হওয়ার সুযোগ বাড়ে। তবে নেতৃত্বে আসার ক্ষেত্রে নারীরা রাজনৈতিক ও সামাজিক বাধা, অনলাইন হয়রানি এবং চরিত্রহননের মতো সমস্যার মুখোমুখি হন। তাঁদের জন্য নিরাপদ পরিবেশ, সমান সুযোগ, নেতৃত্বের প্রশিক্ষণ এবং প্রাতিষ্ঠানিক সহযোগিতা নিশ্চিত করা জরুরি।
ডিজিটাল যুগে নতুন চ্যালেঞ্জঃ
প্রযুক্তি নারীর শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও উদ্যোক্তা হওয়ার নতুন সুযোগ তৈরি করেছে। কিন্তু একই সঙ্গে অনলাইন হয়রানি, ব্যক্তিগত ছবি বা তথ্যের অপব্যবহার এবং সাইবার বুলিং নারীর নিরাপত্তার জন্য নতুন হুমকি হয়ে উঠেছে। তাই নারীদের ডিজিটাল দক্ষতা বাড়ানোর পাশাপাশি সাইবার নিরাপত্তা সম্পর্কে সচেতনতা, অভিযোগ জানানোর সহজ ব্যবস্থা এবং অপরাধের বিরুদ্ধে কার্যকর আইনি পদক্ষেপ প্রয়োজন। প্রযুক্তির জগতে নারীর অংশগ্রহণ যেন ভয় বা সামাজিক বাধার কারণে সীমিত না হয়, সেটিও নিশ্চিত করতে হবে।
উপসংহার
নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠা কোনো একক ব্যক্তি, পরিবার কিংবা সরকারের দায়িত্ব নয়; এটি সমগ্র সমাজের সম্মিলিত অঙ্গীকার। আইন প্রয়োগ, শিক্ষার প্রসার, অর্থনৈতিক স্বাধীনতা, সামাজিক সচেতনতা এবং সহিংসতার বিরুদ্ধে দৃঢ় অবস্থানের মাধ্যমে বৈষম্য কমিয়ে আনা সম্ভব। নারীর ক্ষমতায়ন মানে পুরুষের অধিকার হরণ নয়; বরং সবার জন্য সমান সুযোগ ও মর্যাদা নিশ্চিত করা। যে সমাজ নারীকে নিরাপদে বাঁচতে, স্বাধীনভাবে ভাবতে এবং নিজের যোগ্যতা অনুযায়ী এগিয়ে যেতে দেয়, সেই সমাজই প্রকৃত অর্থে উন্নত। তাই নারীর অধিকারকে বিশেষ কোনো সুবিধা হিসেবে নয়, মানবাধিকার ও ন্যায়বিচারের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে হবে। নারী-পুরুষের সম্মিলিত অগ্রযাত্রাতেই গড়ে উঠতে পারে সমতাভিত্তিক, মানবিক ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category