স্টাফ রিপোর্টারঃ
দেশের শিল্প খাতে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের গতি কমে আসার ইঙ্গিত দিচ্ছে ব্যাংকঋণের সর্বশেষ পরিসংখ্যান। ২০২৬ অর্থবছরের প্রথমার্ধে মেয়াদি ঋণ বিতরণে গতি থাকলেও শেষ প্রান্তিকে তা উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। বিশেষ করে এপ্রিল-জুন প্রান্তিকে শিল্প খাতে মেয়াদি ঋণ বিতরণ আগের প্রান্তিকের তুলনায় প্রায় ১৬ শতাংশ কমেছে। গত অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় কমেছে প্রায় ১৮ শতাংশ।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ অর্থবছরে শিল্প খাতে মোট মেয়াদি ঋণ বিতরণ হয়েছে ৯৯ হাজার ৭৯৬ কোটি টাকা। আগের অর্থবছরে এ পরিমাণ ছিল ৯৭ হাজার ১৩৮ কোটি টাকা। সে হিসাবে এক বছরে ঋণ বিতরণ বেড়েছে মাত্র ২ দশমিক ৭ শতাংশ।
তবে অর্থবছরের শেষ প্রান্তিকে ঋণ বিতরণের চিত্র ছিল বেশ হতাশাজনক। ২০২৬ অর্থবছরের অক্টোবর-ডিসেম্বর প্রান্তিকে শিল্প খাতে মেয়াদি ঋণ বিতরণ হয়েছিল ৩১ হাজার ২৪৭ কোটি টাকা। পরের জানুয়ারি-মার্চ প্রান্তিকে তা কমে দাঁড়ায় ২৩ হাজার ৭৪৮ কোটি টাকায়। আর এপ্রিল-জুন প্রান্তিকে আরও কমে হয় ২০ হাজার ২৯ কোটি টাকা।
এর আগে জুলাই-সেপ্টেম্বর প্রান্তিকে বিতরণ করা হয়েছিল ২৪ হাজার ৭৭১ কোটি টাকা। অর্থাৎ অর্থবছরের শুরুতে যে পরিমাণ ঋণ বিতরণ হয়েছিল, শেষ প্রান্তিকে তা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০২৬ অর্থবছরের এপ্রিল-জুন প্রান্তিকে শিল্প খাতে মেয়াদি ঋণ বিতরণ আগের অর্থবছরের একই সময়ের ২৪ হাজার ২৯৬ কোটি টাকার তুলনায় ৪ হাজার ২৬৭ কোটি টাকা কমেছে। শতকরা হিসাবে এ পতন ১৭ দশমিক ৬ শতাংশ। আর জানুয়ারি-মার্চ প্রান্তিকের তুলনায় এপ্রিল-জুনে ঋণ বিতরণ কমেছে প্রায় ১৫ দশমিক ৭ শতাংশ।
অন্যদিকে, ঋণ আদায়ের পরিমাণ বেড়েছে। ২০২৬ অর্থবছরে শিল্প খাতে মেয়াদি ঋণ আদায় হয়েছে প্রায় ১ লাখ ১৬ হাজার কোটি টাকা। আগের অর্থবছরে আদায়ের পরিমাণ ছিল ১ লাখ ৭ হাজার কোটি টাকা। সে হিসাবে এক বছরে ঋণ আদায় বেড়েছে প্রায় ৮ দশমিক ৪ শতাংশ।
এদিকে শিল্প খাতে মেয়াদি ঋণের স্থিতিও বেড়েছে। ২০২৫ অর্থবছরে এ ঋণের স্থিতি ছিল ৩ লাখ ৮৫ হাজার কোটি টাকা। ২০২৬ অর্থবছর শেষে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪ লাখ ৫১ হাজার কোটি টাকায়। অর্থাৎ এক বছরে ঋণের স্থিতি বেড়েছে ৬৬ হাজার কোটি টাকা বা প্রায় ১৭ শতাংশ।
শিল্প খাতে ঋণ বিতরণের এই নিম্নমুখী প্রবণতা এমন এক সময়ে দেখা যাচ্ছে, যখন সামগ্রিক অর্থনীতিতেও বিনিয়োগ ও উৎপাদন নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। বিশ্বব্যাংকের অক্টোবর ২০২৬-এর হালনাগাদ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বেসরকারি বিনিয়োগ ও রপ্তানি কমে যাওয়া, ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা এবং গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকটের কারণে ২০২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি কমে ৩ দশমিক ৪ শতাংশে দাঁড়িয়েছে।
ব্যবসায়ীদের জন্য ব্যাংকঋণ পাওয়াও কঠিন হয়ে উঠেছে। ২০২৬ সালের মার্চে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি নেমে আসে ৪ দশমিক ৭২ শতাংশে, যা গত ২৪ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। একই সঙ্গে শিল্প ও চলতি মূলধনের ঋণের সুদহার ১৩ থেকে ১৫ শতাংশ পর্যন্ত পৌঁছেছে। উদ্যোক্তাদের মতে, এত উচ্চ সুদে ঋণ নিয়ে উৎপাদন ও ব্যবসা সম্প্রসারণ করা কঠিন হয়ে পড়েছে।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ব্যাংক খাতের খেলাপি ঋণের চাপ। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জুন শেষে দেশের ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৬ লাখ ৭ হাজার কোটি টাকার বেশি, যা মোট ঋণের ৩২ দশমিক ৭৮ শতাংশ। মোট খেলাপি ঋণের প্রায় ৮৫ শতাংশই রয়েছে ১৫টি ব্যাংকের কাছে। এসব ব্যাংকের খেলাপি ঋণের পরিমাণ প্রায় ৪ লাখ ৯৯ হাজার কোটি টাকা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ব্যাংক খাতের দুর্বলতা, ঋণের উচ্চ সুদহার এবং বিনিয়োগ পরিবেশের অনিশ্চয়তা শিল্প খাতে নতুন বিনিয়োগের পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। খেলাপি ঋণের প্রকৃত চিত্র প্রকাশিত পরিসংখ্যানের চেয়েও ভয়াবহ হতে পারে বলে তাদের আশঙ্কা। দুর্বল সুশাসন ও নীতিগত সমন্বয়ের অভাবও ব্যাংকিং খাতের স্থিতিশীলতাকে ঝুঁকির মুখে ফেলছে। এ পরিস্থিতিতে খেলাপি ঋণ কমাতে বাংলাদেশ ব্যাংক ১৮ মাসের একটি রোডম্যাপ নিয়ে কাজ করছে।
তাদের মতে, ঋণ আদায় বাড়া এবং ঋণের স্থিতি বৃদ্ধি ইতিবাচক মনে হলেও এর অর্থ এই নয় যে শিল্প খাতে নতুন উৎপাদনশীল বিনিয়োগ বেড়েছে। বরং নতুন ঋণ বিতরণের গতি কমে যাওয়ায় শিল্প সম্প্রসারণ ও নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির সক্ষমতা বাধাগ্রস্ত হতে পারে। তাছাড়া বেসরকারি বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের গতি ফিরিয়ে আনতে হলে ব্যাংক খাতের ওপর আস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠা, ঋণের ব্যয় কমানো এবং সম্ভাবনাময় শিল্প প্রকল্পে পর্যাপ্ত অর্থায়ন নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে ব্যাংক খাতের সুশাসন ও ঋণ ব্যবস্থাপনায় কার্যকর সংস্কার জরুরি।
তথ্য: Jago News 24