মো: মাহবুবুর রহমান খানঃ
লে.জেনারেল খাজা ওয়াসিউদ্দিন ১৯২০ সালের ২০ মার্চ বেঙ্গল প্রেসিডেন্সির অন্তর্ভুক্ত ঢাকার আহসান মঞ্জিলে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা খাজা শাহাবুদ্দিন ছিলেন পাকিস্তানের উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশের গভর্নর এবং ঢাকা নবাব পরিবারের সদস্য; তাঁর পিতার বড় ভাই ছিলেন স্যার খাজা নাজিমুদ্দিন, যিনি পাকিস্তানের দ্বিতীয় গভর্নর-জেনারেল এবং পরবর্তীকালে এর দ্বিতীয় প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। তাঁর মা ফারহাত বানু স্যার তিনি ঢাকা মুসলিম হাই স্কুলে এবং পরে সেন্ট গ্রেগরিজ হাই স্কুলে পড়াশোনা করেন। ১৯৩৮ সালে তিনি প্রিন্স অফ ওয়েলস রয়েল ইন্ডিয়ান মিলিটারি কলেজ থেকে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন।
মেজর জেনারেল খাদিম হোসেন রাজা তার আত্মজীবনীমূলক বই “A Stranger in My Own Country: East Pakistan, 1969-1971”-এ ১৯৭১ সালের প্রেক্ষাপটে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি এবং বাঙালি কর্মকর্তাদের প্রতি পশ্চিম পাকিস্তানি জেনারেলদের দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরেছেন। এই বইতে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর তৎকালীন সবচেয়ে জ্যেষ্ঠ বাঙালি কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট জেনারেল খাজা ওয়াসিউদ্দিন সম্পর্কে তিনি গুরুত্বপূর্ণ কিছু পর্যবেক্ষণ দিয়েছেন।
খাদিম রাজা উল্লেখ করেন যে, খাজা ওয়াসিউদ্দিন ঢাকার উর্দুভাষী নবাব পরিবারের (যারা ঐতিহ্যগতভাবে পাকিস্তানপন্থী হিসেবে পরিচিত ছিল) সন্তান এবং সেনাবাহিনীর শীর্ষ পর্যায়ের কর্মকর্তা হওয়া সত্ত্বেও পাকিস্তানি হাইকমান্ড তাকে কখনোই পুরোপুরি বিশ্বাস করেনি। ১৯৭১ সালের রাজনৈতিক ও সামরিক সঙ্কটের সময় তাকে অত্যন্ত সুকৌশলে পূর্ব পাকিস্তানের নীতিনির্ধারণী ও অপারেশনাল সিদ্ধান্ত থেকে দূরে সরিয়ে রাখা হয়েছিল। পূর্ব পাকিস্তানে সামরিক অভিযান (অপারেশন সার্চলাইট) এবং সাধারণ বাঙালিদের ওপর পাকিস্তান সেনাবাহিনীর নির্মমতা খাজা ওয়াসিউদ্দিনকে গভীরভাবে আহত করেছিল। খাদিম রাজা তার বইতে ওয়াসিউদ্দিনের এই মানসিক দ্বন্দ্বের কথা তুলে ধরেছেন। একজন অত্যন্ত পেশাদার ও অনুগত সেনা কর্মকর্তা হওয়া সত্ত্বেও নিজের জন্মভূমির মানুষের ওপর সেনাবাহিনীর এমন আচরণে তিনি চরম হতাশ ও ব্যথিত হয়েছিলেন।
পাকিস্তানি সামরিক কর্মকর্তা ও তৎকালীন জনসংযোগ কর্মকর্তা সিদ্দিক সালেক তার বিখ্যাত “উইটনেস টু সারেন্ডার” (Witness to Surrender) বইতে খাজা ওয়াসিউদ্দিনকে পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে কর্মরত বাঙালি সৈন্যদের অন্যতম প্রধান পৃষ্ঠপোষক (patron) এবং পথপ্রদর্শক হিসেবে বর্ণনা করেছেন। বইটিতে বলা হয়েছে যে, জেনারেল খাজা ওয়াসিউদ্দিন, কর্নেল এম. এইচ. মজুমদার এবং কর্নেল (অবসরপ্রাপ্ত) এম. এ. জি. ওসমানীর বাঙালি সৈন্যদের ওপর অত্যন্ত গভীর প্রভাব ছিল।সিদ্দিক সালেক উল্লেখ করেছেন যে, বাঙালি সৈন্যদের ওপর এই তিন বাঙালি কর্মকর্তার (যার মধ্যে ওয়াসিউদ্দিন অন্যতম) প্রবল প্রভাবের বিষয়ে পাকিস্তানি হাইকমান্ড, বিশেষ করে তৎকালীন ইস্টার্ন কমান্ডের জিওসি মেজর জেনারেল খাদিম হোসেন রাজা খুব ভালোভাবেই অবগত ও সতর্ক ছিলেন।
বাংলাদেশ স্বাধীন হবার পর খাজা ওয়াসিউদ্দিন বাংলাদেশকে তার দেশ হিসাবে মনোনিত করেন এবং বাংলাদেশে ফেরত আসেন। শেখ মুজিবুর রহমান তাকে সেনাপ্রধান করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু অতন্ত্য দুঃখের বিষয় মুক্তিযোদ্ধা সামরিক অফিসারদের আপত্তিতে তাকে সেনাপ্রধান করা হয় নি। শেখ মুজিব তাকে রাষ্ট্রদুত করে বিদেশ প্রেরন করেন। খাজা ওয়াসিউদ্দিন ২২ সেপ্টেম্বর ১৯৯২ সালে তিনি ঢাকায় মৃত্যুবরণ করেন।
তথ্যঋণঃ
# পাকিস্তানি সামরিক কর্মকর্তা তৎকালীন জনসংযোগ কর্মকর্তা সিদ্দিক সালেহ’র Witness to Surrender গ্রন্হ
# তৎকালীন ইস্টার্ন কমান্ডের জিওসি মেজর জেনারেল খাদিম হোসেন রাজার পাকিস্তান সেনাবাহিনীর আত্ম সমর্পণ বিষয়ক দলিলে পাকিস্তানের উর্ধতন সেনা কর্মকর্তাদের বৈরি আচরণ ও বাংলাদেশ প্রীতি মনোভাব
#৭১ র স্বাধীনতা সংগ্রামে বাংলাদেশী সেনা অফিসারদের ভূমিকা ও দেশ প্রেম বিষয়ক কাহিনি নিয়ে প্রকাশিত বিভিন্ন পত্রিকা,জার্ণাল।
ছবিঃ
সংগৃহিত।
বি.দ্র.
প্রতিবেদক,মাহবুবুর রহমান খান,সম্পাদক – প্রকাশক দৈনিক জনতার দেশ ( ডিজিটাল অনলাইন পোর্টাল).