যুক্তরাজ্য থেকে মোহাম্মদ সানাউল ইসলাম :
তিনি আমাদের গর্ব, আমাদের অহংকার—জনাব মোহাম্মদ আব্দুল গনি (এম. এ. গনি)। নরসিংদীর শিবপুর উপজেলার বাঘাব ইউনিয়নের প্রায় চল্লিশ বছর নির্বাচিত চেয়ারম্যান হিসেবে নেতৃত্ব দিয়েছেন, এবং তিনি আমাদের বাঘাব ইউনিয়ন উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতা প্রধান শিক্ষক ছিলেন।
আমার জানামতে, তিনিই তৎকালীন বৃহত্তর ঢাকা জেলাবাসী যিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি সাহিত্যে প্রথম মুসলিম হিসেবে মাস্টার্স ডিগ্রি অর্জন করেন। উনি 80 বছর এলাকার চেয়ারম্যান এবং প্রধান শিক্ষক হিসেবে বিভিন্ন স্কুলের দায়িত্ব পালন করেছিলেন। উনি ১৯২৭ ইং সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আবার ডাবল এম, এ, ডিগ্রি অর্জন করেন!
উনাকে নিয়ে একটি ঐতিহাসিক ও অনুপ্রেরণামূলক গল্প প্রচলিত আছে। একবার তিনি লুঙ্গি পরে এম. এ. পরীক্ষায় অংশ নিতে গিয়েছিলেন। একজন ইংরেজ অধ্যাপক রাগান্বিত হয়ে উনাকে হলরুম থেকে বের করে দেন। কিন্তু তিনি দমে যাননি; তৎকালীন প্রেক্ষাপটে পার্শ্ববর্তী এক লন্ড্রি দোকান থেকে একটি প্যান্ট সংগ্রহ করে পুনরায় পরীক্ষা হলে প্রবেশ করেন এবং অত্যন্ত সফলতার সাথে মাস্টার্স ডিগ্রী অর্জন করেন। এই গল্পটি উনার আত্মমর্যাদা ও জেদের এক অনন্য প্রতীক। তিনি সাবেক পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম লীগের অন্যতম সদস্যও ছিলেন!
তিনি ছিলেন দক্ষিণ জয়মঙ্গলবাসী আমার দাদা মরহুম আজগর আলীর অতি নিকটতম বন্ধু ও বড় ভাইতুল্য। উনারা দুজনে মিলেই আজকের এই বাঘাব ইউনিয়ন উচ্চ বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। এই অঞ্চলের শিক্ষাদীক্ষায় তাঁদের এই অসামান্য অবদান এলাকাবাসী চিরদিন অত্যন্ত কৃতজ্ঞতার সাথে মনে রাখবে।
আমার আব্বা সিরাজুল ইসলাম ছিলেন উনার অত্যন্ত প্রিয়ভাজন এবং সন্তানতুল্য। জনাব আব্দুল গনি সাহেবের পর উনার যোগ্য উত্তরসূরি হিসেবে বাঘাব ইউনিয়ন হাই স্কুলের হাল ধরেছিলেন এবং দীর্ঘদিন প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পালন করেছিলেন।
সম্ভবত ১৯৭৩ ইং সালের একটি ঘটনা, আমার বয়স তখন মাত্র পাঁচ বছর। আব্বার সাথে ঢাকা মেডিকেল কলেজে উনাকে দেখতে গিয়েছিলাম, তিনি তখন অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি ছিলেন। আমাকে কাছে পেয়ে তিনি অত্যন্ত স্নেহভরে জড়িয়ে ধরে মাথায় হাত বুলিয়ে দোয়া করে দিয়েছিলেন। শৈশবের সেই পবিত্র ও মধুর দৃশ্যটি আজও আমার স্মৃতিতে উজ্জ্বল হয়ে আছে। পরবর্তী সময়ে তিনি লোকচক্ষুর অন্তরালে চলে যান এবং একান্তে শান্তিময় জীবন যাপন করেন।
তিনি ছিলেন আমাদের ভালোবাসার জয়মঙ্গল তথা গোটা বাঘাব ইউনিয়নের গর্ব, এক জীবন্ত কিংবদন্তি! সম্পর্কে তিনিও ছিলেন আমার দাদা। আজ উনার স্মৃতি চারণ করতে পেরে নিজেকে ধন্য মনে করছি। মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিন উনাকে জান্নাতুল ফেরদাউস নসিব করুন। আমিন।