ডেক্স রিপোর্ট :
বিতর্কিত ব্যবসায়ী এস আলম এর হাতে ইসলামী ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ ফেরাতে রাজধানীতে বড় ধরনের শো-ডাউন করেছে তার অনুসারীরা। চাকরিচ্যুত কথিত কর্মীরা এই শোডাউনে অংশ নেন। এ সময় তারা বর্তমান পরিচালনা পর্ষদ ভেঙ্গে দিয়ে এস আলম এর কাছে ব্যাংকের মালিকানা ফিরিয়ে দেওয়া সহ তাদের চাকরিতে পুনর্বহালের দাবি জানান। গতকাল রোববার সকাল ৯ টা থেকে রাজধানীর মতিঝিলে অবস্থিত ইসলামী ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের সামনে এই শো-ডাউন কর্মসূচিতে অংশগ্রহণকারীদের অধিকাংশ চট্টগ্রামের পটিয়া এলাকার বাসিন্দা বলে জানা গেছে। উক্ত এলাকাতেই আলম গ্রুপের চেয়ারম্যান সাইফুল আলম মাসুদের বাড়ি। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাতে মতিঝিলে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়, আশপাশের রাস্তা বন্ধ হয়ে যায়। ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ও তালাবদ্ধ অবস্থায় দেখা যায়। কর্মসূচিতে ইসলামী ব্যাংক ছাড়াও আরো পাঁচটি শরিয়াভিত্তিক ব্যাংক অংশ নেয়।তাদের মধ্যে ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, ইউনিয়ন ব্যাংক, আল আরাফা ইসলামী ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামীব্যাংক ও সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক। আওয়ামী লীগ আমলে রাষ্ট্রীয় মদদে এই ব্যাংক গুলো সহ ইসলামি ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ এস আলমের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছিল। তার নিয়ন্ত্রণে থাকা লুটপাটের মাধ্যমে ব্যাংকগুলোকে ধ্বংস করা হয়। একই সঙ্গে নিয়ম-নীতি তোয়াক্কা না করে কোন ধরনের বিজ্ঞপ্তি ও পরীক্ষা ছাড়াই তার এলাকার বাসিন্দাদের গণহারে নিয়োগ দেওয়া হয়। নিয়োগ প্রাপ্তদের অনেকেই ছিলেন অযোগ্য। যাদের নিয়োগ দেওয়া হয়েছে তাদের নামেও বড় অংকের ঋণ বের করে নেয় এস আলম গ্রুপ। অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে এসব ব্যাংক গ্রুপটির নিয়ন্ত্রণ মুক্ত করা হয়। নতুন পর্ষদ গঠন করার পর অনিয়মের মাধ্যমে নিয়োগ করা কর্মীদের চাকুরিচ্যুত করা হয়। একই সঙ্গে ব্যাংক গুলোতে থাকা এস আলমের শেয়ার বন্ধ করা হয়। পাশাপাশি ব্যাংক রেজুলেশন অধ্যাদেশের মাধ্যমে পাঁচটি ব্যাংক একীভূত করে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক গঠন করা হয়। যার মধ্যে চারটি ব্যাংক ছিল এস আলম গ্রুপের নিয়ন্ত্রণে।
তবে অন্তর্বর্তী সরকারের সময় জারি করা ব্যাংক অধ্যাদেশ সংশোধন করে ব্যাংক গুলোতে থাকা আগের মালিকদের ফেরার সুযোগ রেখে সম্প্রতি জাতীয় সংসদে বিল পাস করা হয়। এরপর থেকে এস আলমের অনুসারী ও চাকুরিচ্যুত কর্মীরা সরব হয়ে ওঠেন। গতকালের ওই শো-ডাউন ছিল এরই অংশ বিশেষ।
ওই শো-ডাউন এর সময় তাদের পুরনো পর্ষদে ফেরত সহ বিভিন্ন স্লোগান দিতে দেখা গেছে।
এস আলম অনুসারীরা শো-ডাউন করে ঘটনাস্থল ত্যাগের পর একই স্থানে ইসলামিক ব্যাংক গ্রাহক সমন্বয় পরিষদের ব্যানারে পাল্টা কর্মসূচি পালন করেন ব্যাংকের আমানতকারীরা। এ সময় তারা বলেন, আমরা শুনতে পাচ্ছি বর্তমান সরকারের একটি অংশের সহযোগিতায় এস আলম ব্যাংকে ফিরে আসতে চাচ্ছে। আমাদের রক্ত থাকতে লুটেরা এস আলম গং দের দেশের জনপ্রিয় এই ব্যাংক এ ফিরতে দেব না। এ সময় তারা অর্থ লুটপাটের দায়ে এস আলমকে গ্রেপ্তার এবং পাচার করা অর্থ ফেরত আনার দাবি জানান। একই সঙ্গে আলমকে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করা হলে তা প্রতিহত করার ঘোষণা দেন তারা। এস আলম গংয়ের শোডাউন এ অংশ নেওয়া তৌহিদুল ইসলাম বলেন,আমরা দীর্ঘদিন ধরে ব্যাংকে কর্মরত ছিলাম। কিন্তু রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর আমাদের বিনা কারণে চাকরিচ্যুত করা হয়েছে।হুট করে চাকরি হারিয়ে কয়েক হাজার পরিবার মানবেতর জীবন যাপন করছে। আন্দোলনে অংশ নেওয়া অপর একজন দাবি করেন ৫ আগস্ট এর পর মব সৃষ্টি করে কেন্দ্রীয় ব্যাংক কে জিম্মি করে নতুন বোর্ড গঠন করা হয়েছে । যা নিয়ম মেনে করা হয়নি। এস আলম এর নাম উল্লেখ না করে তিনি বলেন, আমাদের দাবি ৮২ শতাংশ শেয়ার যার রয়েছে তার মাধ্যমে বোর্ড পরিচালিত হোক। আমরা চাই আগের মালিকের হাতে ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ ফেরত দেওয়া হোক।
এ সময় তারা বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর আহসান এইচ মনসুরের বিচার এবং ইসলামী ব্যাংকের বর্তমান চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালকের অপসারণ দাবি করেন। এ সময় তারা ছয় দফা লিখিত দাবি পেশ করেন। দাবিগুলো হচ্ছে ১.অন্যায় ভাবে চাকুরীচ্যুত সব কর্মকর্তা-কর্মচারীকে অবিলম্বে পুনর্বহাল ২. মিথ্যা অভিযোগ হয়রানিও বৈষম্যমূলক আচরণ বন্ধ করতে হবে ৩. ব্যাঙ্ক খাতে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ বন্ধ করতে হবে ৪.নিয়োগ ও পদোন্নতিতে স্বচ্ছতা ও মেধা ভিত্তিক প্রক্রিয়া নিশ্চিত করতে হবে ৫. একটি স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্ত কমিশন গঠন করতে হবে ৬. ব্যাংক গুলোতে লুটপাটের সাথে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে হবে
ইসলামী ব্যাংকের বক্তব্য :
এ বিষয়ে জানতে চাইলে ইসলামী ব্যাংকের ভারপ্রাপ্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক আলতাফ হোসেন গণমাধ্যমকে বলেন, ব্যাংক থেকে চাকরিচ্যুতদের পুনর্বহালের বিষয়টি এখন আদালতের চূড়ান্ত আদেশ এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনের ওপর নির্ভর করছে। এখানে আমাদের কিছু করণীয় নেই। আর তাদের দাবি নিয়ে আমাদের কাছে কেউ আসেনি। তারা ব্যাংকের সামনে অবস্থান নিয়ে দিয়েছে।
উল্লেখ্য ফেসিস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের রাজনৈতিক সিদ্ধান্তে গোয়েন্দা সংস্থাকে ব্যবহার করে ২০১৭ সালে ইসলামী ব্যাংক দখল করে নেয় বিতর্কিত এস আলম গ্রুপ। এরপর নামে বেনামে ঋণের নামে ১ লাখ কোটি টাকার বেশি তুলে নেয় গ্রুপটি। এসব ঋণ এখন এক এক করে খেলাপি হতে শুরু করেছে। সম্প্রতি জাতীয় সংসদে শীর্ষ ২০ ঋণ খেলাপির তালিকা প্রকাশ করা হয়। ওই তালিকার শীর্ষ ৫টি সহ ১১টি প্রতিষ্ঠান প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে এস আলমের মালিকানাধীন।
তথ্য সূত্র:
# দৈনিক আমার দেশ
# দৈনিক প্রথম আলো
# দৈনিক ইত্তেফাক
#দৈনিক যুগান্তর
# দৈনিক নয়া দিগন্ত