শিরোনাম :
ধর্মীয় দৃষ্টিকোন থেকে সুন্নী খারেজী ও রাফেজী সম্প্রদায় —– মাকতুবাত শরীফ। শাপলা চত্বর গণহত্যা মামলা আসামি হচ্ছেন সাবেক আইজিপি চৌধুরী আবদুল্লাহ- আল -মামুন। সংরক্ষিত নারী আসন এবং সমকালীন রাজনৈতিক প্রসঙ্গ। খুলনায় দায়িত্বরত অবস্থায় পুলিশ কনস্টেবল নিজের অ*স্ত্র দিয়ে গু*লি করে আত্ম*হত্যা। টাইম ম্যাগাজিনের জরিপে ১০০ প্রভাবশালীর তালিকায় প্রধান মন্ত্রী তারেক রহমান। দেশে জ্বালানি তেলের তীব্র সংকট পেট্রোল পাম্পে হাহাকার, সরকার বলছে মজুদ সন্তোষজনক, বাস্তব চিত্র ভিন্ন। পুলিশের তথ্য : ওসমান হাদী হত্যায় ব্যবহৃত পিস্তল কেনা হয় ২ লাখ টাকায় শেষ পর্যন্ত পিস্তলটি উদ্ধার হয় নরসিংদী থেকে। কলাপাড়ায় (পটুয়াখালী) পড়া না পারায় অষ্টম শ্রেনীর শিক্ষার্থীকে মারধর, অজ্ঞান অবস্থায় হাসপাতালে ভর্তি । লালন ধর্মের অনুসারী কুষ্টিয়ার কথিত পীর শামীম ওরফে বাবা জাহাঙ্গীর হত্যার অন্ত:রালে। আহমদ ছফার বিয়ে ও শামীম শিকদার প্রসঙ্গ।
সোমবার, ২০ এপ্রিল ২০২৬, ০৩:২৯ অপরাহ্ন

সংরক্ষিত নারী আসন এবং সমকালীন রাজনৈতিক প্রসঙ্গ।

Reporter Name / ২০ Time View
Update : রবিবার, ১৯ এপ্রিল, ২০২৬

আনোয়ার হোসেইন মঞ্জু : আগামী ১২ মে মঙ্গলবার জাতীয় সংসদের ৫০টি সংরক্ষিত নারী আসনে নির্বাচন। ইতোমধ্যে সংরক্ষিত আসনে নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করা হয়েছে এবং আগ্রহী প্রার্থীরা নির্বাচন কমিশন থেকে ১৭ এপ্রিল পর্যন্ত ৩৭৫টি মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করেছেন। নারী আসনে নির্বাচনি আইন অনুযায়ী, সাধারণ নির্বাচনের চূড়ান্ত ফলাফলের গেজেট প্রকাশের ৯০ দিনের মধ্যে এ নির্বাচন সম্পন্ন করতে হবে। এ নিবন্ধ প্রকাশিত হওয়ার আগেই ২১ এপ্রিলের মধ্যে মনোনয়নপত্র জমা দান ও ২৩ এপ্রিলের মধ্যে বাছাইপর্ব শেষ করে পরবর্তী প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার কথা। সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে জাতীয় সংসদে ধাপে ধাপে সংরক্ষিত নারী আসনসংখ্যা বৃদ্ধি করা হলেও নারীরা দেশের জনসংখ্যার অর্ধেক হওয়া সত্ত্বে প্রতিনিধিত্বমূলক যেকোনো প্রতিষ্ঠানে নারী প্রতিনিধি এখনো ন্যূনতম পর্যায়ে অথবা আদৌ নেই।

এমনকি বড় রাজনৈতিক দলগুলোও সরাসরি নির্বাচনে শীর্ষ পর্যায়ের নারী নেত্রী ছাড়া জেলা পর্যায়ের জনপ্রিয় নারী নেত্রীকেও এই আশঙ্কায় দলীয় মনোনয়ন দেয় না যে তারা প্রতিদ্বন্দ্বী দলের প্রার্থীর কাছে পরাজিত হবেন। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ৫১টি রাজনৈতিক দলের স্বতন্ত্র প্রার্থীসহ মোট ২ হাজার ৩৪ জনের মধ্যে নারী প্রার্থীর সংখ্যা ছিলেন মাত্র ৮৬ জন। অর্থাৎ ৪ দশমিক ২৩ শতাংশ। বিএনপি ১৩টি আসনে নারী প্রার্থী মনোনয়ন দিয়েছিল। প্রধান বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামী একজন নারী প্রার্থীকেও মনোনয়ন দেয়নি। ২০০৮ ও ২০১৮ সালের নির্বাচনেও বিএনপি ১৩টি করে আসনে নারী প্রার্থী মনোনয়ন দিয়েছিল, এর অধিকাংশই ছিলেন দলের শীর্ষ নেতানেত্রীর সঙ্গে আত্মীয়তার সম্পর্কে জড়িত।

জাতীয় সংসদে নারী উন্নয়ন ও নারীর ক্ষমতায়নের কথা বলেন না অথবা অতীতে বলেননি, দেশে এমন একজন নেতানেত্রীও খুঁজে পাওয়া যাবে না। সংবিধান প্রণেতারা বর্তমান সময়ের নেতানেত্রীদের চেয়ে নারীর ক্ষমতায়ন ও বিকাশের ব্যাপারে বেশি আশাবাদী ছিলেন। কারণ তারা যে কল্পনার সোনার বাংলা গড়তে চেয়েছিলেন, সেই লক্ষ্যে প্রণীত ১৯৭২ সালের সংবিধানে জাতীয় সংসদে ৩০০ আসনের বিপরীতে সংরক্ষিত নারী আসন রেখেছিলেন মাত্র ১৫টি অর্থাৎ মাত্র ৫ শতাংশ এবং তা-ও মাত্র ১০ বছর বা দুটি জাতীয় সংসদের মেয়াদকাল পর্যন্ত। তারা আশা করেছিলেন, এই সময়ের মধ্যেই বাংলাদেশের নারীরা সব দিক থেকে পুরুষের সমান সক্ষমতা অর্জন করবে এবং সংসদে তাদের জন্য সংরক্ষিত আসনের প্রয়োজন পড়বে না। বরং তারা সরাসরি নির্বাচনে অংশ নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেই সংসদ সদস্য নির্বাচিত হবেন।

তারা যদি আরেকটু সুদূরপ্রসারী চিন্তা করে ১৯৭২-এর মূল সংবিধানেই নারী আসনসংখ্যা ও মেয়াদ বৃদ্ধি করতেন, তাহলে পরবর্তী সংসদগুলোকে অন্তত নারী আসন নিয়ে বারবার সংবিধান সংশোধনের মতো জটিল কাজ করতে হতো না। কিন্তু তা হয়নি। তারা সামান্য দূরে ফেলে আসা ইতিহাসও বিস্মৃত হয়েছিলেন। পাকিস্তান আমলে নারীশিক্ষার হার থেকে শুরু করে সব খাতে নারীর অংশগ্রহণের সূচক এত নিচু ছিল, যে অবস্থা থেকে স্বাধীনতা লাভ করে মাত্র ১০ বছরেই নারীর সক্ষমতা বাড়িয়ে পুরুষের সমান করা যাবে-এটা সংবিধান প্রণেতা এবং ওই সময়ের ক্ষমতাসীন নেতা ও নীতিনির্ধারকদের অলীক ধারণা ছিল। পাকিস্তান আমলে জাতীয় পরিষদে পূর্ব পাকিস্তানকে ৭টি সংরক্ষিত নারী আসন এবং পূর্ব পাকিস্তান প্রাদেশিক পরিষদে ৫টি সংরক্ষিত নারী আসন দিয়ে তুষ্ট রাখা হয়েছিল। কিন্তু স্বাধীন দেশের সংবিধান প্রণেতারা সেই সীমাবদ্ধতার আবর্ত থেকে বের হয়ে আসতে পারেননি।

এমনকি ১৯৯১ থেকে ২০২৪-এর মাঝামাঝি সময় পর্যন্ত ৩৩ বছরের বেশি সময় পর্যন্ত দুজন নারী প্রধানমন্ত্রীর অধীনে বাংলাদেশ পরিচালিত হলেও কর্মক্ষেত্র থেকে শুরু করে কোথাও লিঙ্গ-বৈষম্য দূর হয়নি। জনসংখ্যাভিত্তিক নারীর আনুপাতিক উন্নয়ন ও ক্ষমতায়ন হয়নি। তারা নারীর ক্ষমতায়নে যে কোনো ভূমিকা ও অবদান রাখেননি তা বলা সঠিক হবে না। নারী উন্নয়নে বেশ অগ্রগতি হয়েছে, কিন্তু প্রকৃত অর্থে নারীর ক্ষমতায়ন হয়নি এবং কর্ম ও আচরণের ক্ষেত্রে লিঙ্গ-বৈষম্য দূর হয়নি। বাংলাদেশি সমাজ ও পরিবার এখনো বহুলাংশে পুরুষশাসিতই রয়ে গেছে। জাতীয় সংসদে সংরক্ষিত নারী আসনের ক্ষেত্রেও তা প্রযোজ্য বললে অত্যুক্তি হবে না।

আইন প্রণয়ন করার উদ্দেশ্যে যারা জাতীয় সংসদে নির্বাচিত হন এবং যারা আইন প্রণয়নে তাদের পরামর্শ প্রদান করেন, তারা এতটাই স্বল্পদর্শী যে কেবল সংরক্ষিত নারী আসন বৃদ্ধি, মেয়াদ সংরক্ষণ ইত্যাদি কাজেই চারবার সংবিধান সংশোধন করেছেন। ১৯৭৯ সালে সংবিধানের পঞ্চম সংশোধনীতে সংসদে সংরক্ষিত নারী আসনসংখ্যা ১৫টি থেকে ৩০টিতে উন্নীত করে এর মেয়াদ ১৫ বছরের জন্য সম্প্রসারিত করা হয়। সংরক্ষিত নারী আসনের সম্প্রসারিত মেয়াদ ১৯৮৮ সালে শেষ হয়ে যাওয়ায় চতুর্থ জাতীয় সংসদ সংরক্ষিত নারী প্রতিনিধিশূন্য ছিল।

১৯৯০ সালে বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে বিএনপি সরকার গঠন করার পর দশম সংশোধনীতে সংরক্ষিত নারী আসনের বিধান নতুন করে যুক্ত হয় এবং আসনসংখ্যা ৩০ রেখেই মেয়াদ আরও ১০ বছর বৃদ্ধি করা হয়। খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে বিএনপি ২০০১ সালে পুনরায় সরকার গঠন করলে ২০০৪ সালে চতুর্দশ সংশোধনীতে সংরক্ষিত নারী আসন ৩০ থেকে ৪৫টিতে উন্নীত এবং মেয়াদ নবায়ন করা হয় আরও ১০ বছরের জন্য, যা কার্যকর হয় ২০০৯ সালে গঠিত নবম জাতীয় সংসদে এবং যার পুরো সুবিধা ভোগ করে আওয়ামী লীগ সরকার। আওয়ামী লীগ যেহেতু সবকিছুর কৃতিত্ব নেওয়ার একটি দল, তারা নারী আসনের ক্ষেত্রে কৃতিত্ব গ্রহণের জন্য ২০১১ সালে পঞ্চদশ সংশোধনীতে নারী আসনসংখ্যা ৫টি বাড়িয়ে ৫০-এ উন্নীত করে। এই সংশোধনীতে নারী আসনগুলোর সময়সীমা বৃদ্ধি করা হয়নি।

জাতীয় সংসদে সংরক্ষিত নারী আসন মোট নির্বাচিত আসনসংখ্যার ১৬ দশমিক ৭ শতাংশ। এবং সরাসরি নির্বাচনে নির্বাচিত হয়েছেন আরও ৭ জন নারী সদস্য। নির্বাচন আইন ২০০৪-এর বিধান অনুযায়ী প্রতি ছয়টি প্রত্যক্ষভাবে নির্বাচিত আসনের বিপরীতে সংরক্ষিত নারী আসন হবে একটি। সে হিসাবে বিএনপি ও তাদের জোটভুক্তরা পাবে ৩৬টি নারী আসন এবং জামায়াতে ইসলামী ও তাদের জোটভুক্তরা পাবে ১৩টি সংরক্ষিত আসন। সংরক্ষিত আসনে স্থান পাওয়ার আশায় বিএনপির সম্ভাব্য নারী প্রার্থীরা সাত শতাধিক মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করেছেন। এখন দলীয় মনোনয়ন লাভ এবং ইসির নিয়মমাফিক যাচাইবাছাই ও মনোনয়ন প্রত্যাহারপর্ব শেষে যারা টিকে থাকবেন, সরাসরি নির্বাচিত সদস্যরা ভোট দিয়ে তাদের মধ্য থেকে সংরক্ষিত নারী আসনের জন্য সদস্য নির্বাচিত করবেন। কারা নির্বাচিত হন, তা দেখার জন্য ১২ মে পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে।

সংরক্ষিত নারী আসনে নির্বাচিতদের নিয়ে অতীতে অনেক কথা হয়েছে। স্বজনপ্রীতি, পক্ষপাতেরও অভিযোগ উঠেছে। রাজনীতির সঙ্গে কখনো সংশ্লিষ্ট ছিলেন না, এমন নারীকেও সংসদের শোভাবর্ধন করতে দেখা গেছে। ১৯৮৬ সালের সংসদে অর্থাৎ তৃতীয় জাতীয় সংসদে সংরক্ষিত নারী সদস্যদের নিয়ে সাপ্তাহিক ‘যায়যায়দিন’-এ ‘৩০ সেট অলংকার’ শীর্ষক কভার স্টোরি করার কারণে ম্যাগাজিনটির প্রকাশনা নিষিদ্ধ করেছিল এরশাদ সরকার। সম্পাদক শফিক রেহমান গ্রেপ্তার এড়াতে দেশ থেকে পালাতে বাধ্য হয়েছিলেন। বর্তমান সংসদের সংরক্ষিত আসনের নারী সদস্যরা সংসদে তাদের যথাযথ ভূমিকা রাখবেন বলে আশা করি।

আরও একটি বিষয়ের প্রতি সংশ্লিষ্ট সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করছি, সেটি হলো আমাদের প্রতিবেশী দেশগুলোর পার্লামেন্টে সংরক্ষিত নারী আসনের অনুপাতের দিকে লক্ষ্য রেখে বারবার সংবিধান সংশোধন করে নারী আসনের সংখ্যা বৃদ্ধির পরিবর্তে সুদূরপ্রসারী চিন্তা করে নারী আসন সংরক্ষণ করা প্রয়োজন। পাকিস্তান জাতীয় সংসদে সরাসরি ভোটে নির্বাচিত আসনসংখ্যা ২৬৬, সংরক্ষিত নারী আসন ৬০টি এবং সংখ্যালঘুদের জন্য সংরক্ষিত আসন ১০টি।

নির্বাচিত আসনের বিপরীতে সংরক্ষিত নারী আসন ১৭ শতাংশ। ভারতীয় লোকসভায় বর্তমানে ৫৪৩টি সরাসরি নির্বাচিত আসনের বিপরীতে ৭৪ জন নারী সংরক্ষিত আসনে আছেন। ২০২৩ সালে ভারতীয় সংবিধানের ১০৬তম সংশোধনীতে বা ‘নারী আসন সংরক্ষণ’ বিধানে লোকসভা ও রাজ্য বিধানসভাগুলোর ৩৩ শতাংশ নারী আসন সংরক্ষণ করা হয়েছে। এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় আইন প্রণয়ন নিয়ে এখনও বিতর্ক অব্যাহত আছে। দক্ষিণের রাজ্যগুলো আপত্তি জানাচ্ছে যে, ৩৩ শতাংশ সংরক্ষিত নারী আসন উত্তর প্রদেশসহ অধিক জনসংখ্যা অধ্যুষিত রাজ্যগুলো সুবিধা পাবে বেশি। যাহোক, ২০২৭ সালের আদমশুমারি ও নতুন নির্বাচনি এলাকা নির্ধারণের পর লোকসভার আসন বর্তমান ৫৪৩-এর থেকে বৃদ্ধি পেয়ে ৮১৬টি বা আরও বেশি হবে এবং এর মধ্যে ২৭৩ থেকে ২৮৩টি আসন সংরক্ষিত থাকবে নারীদের জন্য। অর্থাৎ প্রতি তিনজন নির্বাচিত সদস্যের মধ্যে একজন হবেন নারী। রাজনীতিতে নারীদের প্রত্যক্ষ ভূমিকা রাখার সুযোগ নিশ্চিত করার লক্ষ্যে এ সংশোধনী পাস করা হয়েছে। এ সংরক্ষণের মেয়াদ হবে ১৫ বছর। এরপর লোকসভা স্থির করবে এ ব্যবস্থা বহাল থাকবে কি না, অথবা মেয়াদ সম্প্রসারণ করা হবে কিনা। এ দৃষ্টান্ত থেকে বাংলাদেশেরও উচিত জনসংখ্যার অর্ধেককে রাজনীতিতে তাদের যোগ্য ভূমিকা রাখার সুযোগ দিতে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।
বি.দ্র.
প্রতিবেদক,যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসি একজন সাংবাদিক, কলামিস্ট লেখক ও বুদ্ধিজীবী।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category