ফাতিহা আয়াতঃ
অপ্রতিম শুধু তার পরিবারকে একটি ট্র্যাজেডি দিয়ে যায়নি, সে আমাদের সমাজের বিরুদ্ধে একটি চার্জশিট দিয়ে গেছে।
আর সেই চার্জশিটের প্রথম লাইনে লেখা আছে, আমরা এমন একটি সমাজ বানিয়েছি, যেখানে একটি শিশুকে বাঁচতে হলে শিশুর মতো বাঁচা বন্ধ করতে হয়।
কেন বলছি এ কথা?
আমরা শিশুদের শেখাই, সত্য কথা বলবে, বন্ধু বানাবে, বাইরে যাবে, পৃথিবী দেখবে, মানুষকে বিশ্বাস করবে। তারপর কোনো একদিন সেই পৃথিবীই তাদের একজনকে ফিরিয়ে দেয় নিথর করে। তখন আমরা বাকিদের ডেকে বলি, সাবধানে থেকো। কাউকে বিশ্বাস কোরো না। একা যেয়ো অপরিচিতের সঙ্গে কথা বলো না।
প্রতিটি শিশুহত্যার পর আমরা আসলে বেঁচে থাকা হাজার হাজার শিশুর শৈশব থেকে একটু একটু করে স্বাধীনতা কেটে নিই। একটি করে শিশু মারা যায়, আর আমরা বেঁচে থাকা শিশুদের ঘরে আটকে দিই। একটি করে শিশু বিশ্বাস করে প্রতারিত হয়, আর আমরা হাজার শিশুকে শেখাই, কাউকে বিশ্বাস কোরো না। একটি করে শিশু বাইরে গিয়ে আর ফেরে না, আর আমরা পুরো একটি প্রজন্মকে শেখাই, পৃথিবী তোমার জন্য নয়।
খুনিতো কেবল একজন শিশুকে মারে। আর আমাদের ব্যর্থ সমাজ ধীরে ধীরে মেরে ফেলে বাকিদের শৈশব। যেন প্রতিটি শিশু হত্যার শ্বাস্তি হচ্ছে শিশুদেরই স্বাধীনতার জলাঞ্জলি।
এর চেয়ে ভয়ংকর পরাজয় আর কী হতে পারে?
কারণ একটি সভ্য সমাজের কাজ শিশুকে বিপদ চিনতে শেখানোতেই শেষ নয়। তার চেয়েও বড় কাজ হলো এমন একটি পরিবেশ তৈরি করা, যেখানে শিশুকে প্রতিটি মানুষের ভেতর তার সম্ভাব্য আততায়ীকে খুঁজতে হবে না।
অপ্রতিম যুদ্ধক্ষেত্রে যায়নি। সীমান্ত পেরোয়নি। কোনো অপরাধীর আস্তানায় ঢোকেনি। সে এই সমাজের ভেতরেই ছিল। ১৩ বছরের একটি ছেলে বিকেলে ঘর থেকে বের হওয়া কোনো দুঃসাহস হওয়ার কথা নয়। বন্ধুর সঙ্গে ছবি তুলতে যাওয়া কোনো ঝুঁকিপূর্ণ অভিযান হওয়ার কথা নয়। সন্ধ্যায় সন্তান দেরি করলে একজন মায়ের প্রথম চিন্তা হওয়ার কথা ছিল, “হয়তো খেলছে”। “ও বেঁচে আছে তো?” নয়।
অপ্রতিমের ঘটনায় আমরা আইফোন নিয়ে কথা বলছি, সন্দেহভাজন নিয়ে কথা বলছি, সিসিটিভি নিয়ে কথা বলছি, বিচার নিয়ে কথা বলছি। অবশ্যই বলতে হবে।
কিন্তু আরেকটি প্রশ্নও করতে হবে।
আমরা কবে এমন একটি সমাজ বানালাম, যেখানে একটি শিশুকে নিরাপদ রাখতে তার নির্দোষতাটাকেই আগে হত্যা করতে হয়? আমাদের জিজ্ঞেস করতে হবে, কেন একটি শিশুর নিরাপত্তা এখন ব্যক্তিগত সতর্কতার বিষয়, রাষ্ট্রীয় নিশ্চয়তার নয় কেন?
কেন বাবা-মাকে সন্তান পালনের পাশাপাশি সারাক্ষণ গোয়েন্দাগিরিও করতে হবে? কেন “সাবধানে থেকো” আমাদের সন্তানদের প্রতি ভালোবাসার বাক্য নয়, আতঙ্কের শেষ নির্দেশ হয়ে উঠবে?
তাই অপ্রতিমের জন্য বিচার চাই।
শুধু আদালতের রায়ে নয়, আমাদের collective conscience-এও।
অপ্রতিম আর ফিরবে না।
কিন্তু তার মৃত্যু যদি কেবল শোক হয়ে থাকে, পরিবর্তনের কারণ না হয়, তবে এই হারানো অসম্পূর্ণই থেকে যাবে।
বি.দ্র.
প্রতিবেদক,
একজন শিক্ষাবিদ ও উন্নয়ন কর্মি।
ছবি:
সংগৃহিত।
ইনসেটে, অপ্রতিমের পাশে দুই খুনি। বামপাশে মূল হোত্ তুহিন ডান পাশে আনাস।