একটি গবেষণা ধর্মী প্রতিবেদন (পর্ব-১)
মো: মাহবুবুর রহমান খান
কিশোর গ্যাং হলো এমন একটি দল বা গোষ্ঠী যেখানে সাধারনত কিশোররা ১৪ থেকে ২০ বছর বয়সি একত্রিত হয়ে অপরাধমূলক কর্মকান্ড করে। এসব গ্যাং বিভিন্ন ধরনের অপরাধে জড়িত থাকে যেমন চুরি- ডাকাতি, মাদক বিক্রি, ছিনতাই, মারামারি , চাঁদাবাজি, জমি দখল জনমনে ভীতি সৃষ্টি। গ্যাং গুলো কখনো কখনো রাজনৈতিক বা সামাজিক সমর্থনও পেয়ে থাকে যা তাদের কর্মকান্ডকে আরো বিস্তৃত করতে সহায়তা করে। এসব গ্যাং প্রায়ই কিছু রাজনৈতিক নেতাদের সমর্থন পেয়ে থাকে।যারা তাদের ‘বড় ভাই’ হিসেবে পরিচিত।
কিশোর গ্যাং এর অপরাধ চিত্র ও প্রভাব :
*অস্ত্রের মহড়া *
ছুরি রামদা নিয়ে এলাকা নিয়ন্ত্রণ এবং ককটেল বিস্ফোরণ ঘটিয়ে জনমনে আতঙ্ক সৃষ্টি করা।অনেক ক্ষেত্রে আগ্নেয়াস্ত্রও ব্যবহার করে।
*ছিনতাই ও মাদক *
সন্ধ্যার পর বা জনশূন্যস্থানে পথচারীদের সর্বত্র লুটে নেওয়া।
*সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম *
টিক টক বা ফেসবুকের মাধ্যমে নিজেদের গ্যাং কালচার ও শক্তি প্রদর্শন।
*ইভটিজিং ও খুন *
স্কুল কলেজ এলাকায় মেয়েদের উত্তক্ত করা এবং আধিপত্য নিয়ে নিজেদের মধ্যে খুনাখুনির বিস্তৃতি ঘটানো।
*সামাজিক প্রভাব *
গবেষণায় দেখা গেছে যে, বাংলাদেশে কিশোর গ্যাং সংস্কৃতির সমাজ, অর্থনীতি এবং মনস্তাত্ত্বিক বিষয়ের ওপর গুরুতর প্রভাব ফেলছে। বিশেষ করে শহরাঞ্চলে অপরাধের হার বাড়িয়ে তুলছে।নিরপরাধ সাধারণ মানুষ যার মধ্যে পথচারী ও দর্শকও অন্তর্ভুক্ত প্রায়ই গ্যাং সহিংসতার শিকার হয়। কিশোর গ্যাং গুলোর উপস্থিতি একটি আতঙ্ক এবং নিরাপত্তা হীনতার পরিবেশ তৈরি করে যা প্রভাবিত কমিউনিটির সামগ্রী উন্নয়ন এবং কল্যাণে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে।কিশোর গ্যাং সংস্কৃতির প্রভাব শুধু সংশ্লিষ্ট কিশোরদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না গোটা সমাজে অস্হিরতা সৃষ্টি করে। সাধারণ মানুষ নিরাপত্তাহীনতায় ভোগে,শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের পরিবেশ ব্যাহত হয় এবং সামগ্রিকভাবে সামাজিক মূল্যবোধ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সবচেয়ে বড় কথা, একটি সম্ভাবনাময় প্রজন্ম ধীরে ধীরে অন্ধকারের দিকে ধাবিত হয়। কিশোর গ্যাং সংস্কৃতি কোন একক কারণে তৈরি হয় না —এটি পরিবার,সমাজ, শিক্ষা ও রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার সম্মিলিত দুর্বলতার ফলাফল। আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তথ্যমতে, শুধু রাজধানীতেই সক্রিয় রয়েছে অন্তত ১১৮টি কিশোর গ্যাং।দেশের ৩৫ টিরও বেশি থানা এলাকায় এই গ্যাং কালচার বিস্তৃত।সারাদেশে গ্যাং এর সংখ্যা ২৩৭ টি সদস্য প্রায় ৫০০০০। প্রতিটি গ্রুপে ১০থেকে ২০ জন সদস্য থাকে। যাদের বয়স সাধারণত ১৪ থেকে ২০ বছরের মধ্যে। এসব গ্যাং এর নিয়ন্ত্রণ থাকে স্থানীয় সন্ত্রাসী, রাজনৈতিক নেতা কিংবা প্রভাবশালী ব্যক্তি —যা সমস্যাটিকে আরো জটিল ও গভীর করে তুলছে। এ সমস্যার শেকড় অনুসন্ধান করলে দেখা যায়, এর পেছনে রয়েছে বহুমাত্রিক কারণ। প্রথমত: দারিদ্রতা। প্রায় ৭০ শতাংশ কিশোর দারিদ্রতার কারণে অপরাধে জড়িয়ে পড়ে। দ্বিতীয়তঃ পারিবারিক বন্ধনের শিথিলতা। পারিবারিক অবহেলা,মা-বাবার মধ্যে দ্বন্দ্ব এবং মানসিক বিকাশের প্রতিবন্ধকতাও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।ব্যস্ত জীবনে অনেক অভিভাবক সন্তানের সঙ্গে মানসিক যোগাযোগ রাখতে ব্যর্থ হন। ফলে কিশোররা পরিবারের যে স্নেহ ও দিকনির্দেশনা পাওয়ার কথা; তা না পেয়ে বাইরে বিকল্প আশ্রয় খোঁজে। তৃতীয়তঃ সঙ্গের প্রভাব । বন্ধুত্বের টানে তারা এমন একটি পরিবেশে প্রবেশ করে যেখানে অপরাধ ও সহিংসতা ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হয়ে ওঠে। চতুর্থত: প্রযুক্তি ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের অপব্যবহার। বিভিন্ন চলচ্চিত্র, ওয়েব কন্টেন্ট বা অনলাইন প্লাটফর্মে সহিংসতা ও অপরাধ কে কখনো কখনো এমন ভাবে উপস্থাপন করা হয় যা কিশোরদের কাছে আকর্ষণীয় বলে মনে হয়। পঞ্চমত:লক্ষ্য হীনতা, শিক্ষা বিমুখতা,এবং কিছু ক্ষেত্রে অপরাধী চক্রের প্রলোভনও এই পথে ঠেলে দেয়।
ষষ্ঠত : এর পাশাপাশি মাদকাসক্তি, পর্ণগ্রাফির সহজলভ্য ও উগ্রতা।
সপ্তমত:লেজুর বৃত্তির রাজনীতি কিশোরদের অপরাধ প্রবণতাকে আরো উসকে দিচ্ছে। সমাজের নীরব অলিগলি থেকে শুরু করে নগরের ব্যস্ত সড়ক- সব খানেই আজ এক নতুন উদ্বেগের নাম শোনা যায় কিশোর গ্যাং।অল্প বয়সি কিছু ছেলে কখনো মেয়ে দলবদ্ধ হয়ে নিজেদের মধ্যে এক ধরনের আধিপত্য ও ক্ষমতার বলয় তৈরি করছে। তাদের আচরণে দৃশ্যমান হচ্ছে আগ্রাসন, ভাষায় উগ্রতা,আর কর্মকাণ্ডে সহিংসতার ছাপ।এই প্রবণতা শুধু বিচ্ছিন্ন কিছু ঘটনার সমষ্টি নয়;এটি একটি গভীর সামাজিক সংকটের প্রতিচ্ছবি যা আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে নীরবে গ্রাস করছে। রাজধানীতে আবার মাথা ছাড়া দিয়ে ওঠেছে কিশোর গ্যাং এর অপরাধমূলক কর্মকান্ড। প্রতিদিনের সংবাদে কুপিয়ে হত্যা, চাঁদাবাজি, মাদক কেনা বেচা, কিংবা ইভটিজিং এর মত ঘটনার সঙ্গে জড়িয়ে পড়ছে। কিশোররা–যে বয়সে তাদের বই খাতা হাতে স্বপ্ন গড়ার কথা,সেই বয়সে তারা অপরাধের অন্ধকার গলিতে হারিয়ে যাচ্ছে। সাম্প্রতিক একটি ঘটনা এর সংকটের ভয়াবহতাকে স্পষ্ট করে তুলেছে।
রাজধানীর মোহাম্মদপুরে এলেক্স গ্রুপের প্রধান ইমন হোসেন ওরফে এলেক্স ইমনকে প্রতিপক্ষ গ্যাং সদস্যরা নির্মমভাবে কুপিয়ে হত্যা করে। একটি ছিনতাই হওয়া মোবাইল ফোনকে কেন্দ্র করে এলেক্স গ্রুপ এবং আরমান- শাহরুখ গ্রুপের দ্বন্দ্ব শেষ পর্যন্ত রক্তপাতের দিকে গড়ায়। এ ঘটনা প্রমাণ করে তুচ্ছ কারণও এখন ভয়াবহ সহিংসতার জন্ম দিচ্ছে,যেখানে মানব জীবনের মূল্য তুচ্ছ হয়ে পড়ছে। এ ঘটনা শুধু একটি হত্যাকাণ্ড নয় ;বরং এটি আমাদের সমাজের ভেতরে জমে ওঠা সহিংসতা, নৈতিক অবক্ষয় এবং কিশোরদের বিপথগামীতার এক ভয়ঙ্কর প্রতিচ্ছবি। একটি সম্ভাবনাময় জীবন এভাবে ঝরে পড়া আমাদের জন্য একটি গভীর সতর্কবার্তা।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো এই কিশোরদের পেছনে যারা পৃষ্ঠপোষকতা করছে তাদেরকে চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনা হোক। কারণ কিশোররা একা অপরাধী হয়ে ওঠেনা, তাদের ব্যবহার করে বড় একটি স্বার্থান্বেষী চক্র। সেই চক্রকে ভাঙতে না পারলে সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। কিশোরদের অপরাধের ভয়াবহতা যতই বড় হোক, তারা এখনো কিশোর -তাই শাস্তির চেয়ে সংশোধন ও পুনর্গঠনের দিকেই গুরুত্ব দেওয়া উচিত।
কিশোর গ্যাং সংস্কৃতি আজ আমাদের সমাজের এক গভীর সংকটের নাম। এটি শুধু আইনশৃঙ্খলার সমস্যা নয় ;বরং পরিবার, শিক্ষা, সামাজিক মূল্যবোধ ও নৈতিক নেতৃত্বের দুর্বলতার সম্মিলিত প্রতিফলন। গ্যাং সংস্কৃতি দমন করতে হলে শুধু পীড়ন মূলক ব্যবস্থা যথেষ্ট নয়; বরং ভালোবাসা, দিকনির্দেশনা ও সুযোগ সৃষ্টি –এই তিনটি বিষয়কে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। কিশোরদের সঠিক পথে পরিচালিত করতে পারলেই আগামী দিনের সমাজ হবে আরো নিরাপদ, সুস্থ্য ও মানবিক। অন্যথায়, এই দাপটের মোহ একসময় আমাদের সম্মিলিত ভবিষ্যৎ কে বিপন্ন করে তুলবে।
চলবে—–
প্রতিবেদক:
সম্পাদক -প্রকাশক,দৈনিক জনতার দেশ।