অনুলিখন মাহবুবুর রহমান৷ খান :
কাজী অনিরুদ্ধ,বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের কনিষ্ঠ সন্তান জন্ম: ১৯৩১ খ্রিস্টাব্দের ২৪ ডিসেম্বর কলকাতায়। মাতা প্রমীলা দেবী তাকে ‘নিনি’ নামে সম্বোধন করতেন। অতি শৈশব থেকেই পিতার কাছে অনিরুদ্ধের সঙ্গীত শিক্ষা। কলেজে পড়ার সময় তিনি প্রখ্যাত গিটারবাদক সুজিত নাথের কাছে গিটার শিক্ষা গ্রহণ করেন। কিন্তু পিতামাতার অসুস্থতার কারণে ও আর্থিক অনটনে তাঁর সঙ্গীত শিক্ষায় ব্যাঘাত ঘটে।
এরই মাঝে ১৯৫২ খ্রিস্টাব্দের অক্টোবর মাসে রাঁচিতে অপ্রত্যাশিতভাবেই কল্যাণীর সঙ্গে তার প্রথম আলাপে প্রেম ও পরে ১৯৫৫ খ্রিস্টাব্দের ২৪ ডিসেম্বর শুরু হয় তাদের বিবাহিত জীবন। ‘নজরুল নিরাময় সমিতি’র সংগৃহীত অর্থে অসুস্থ পিতা ও মাতার বিদেশে চিকিৎসার ব্যবস্থা হলে তিনি তাদের সঙ্গী হয়ে ১৯৫৩ খ্রিস্টাব্দের ১০ মে সমুদ্রপথে প্রথমে লন্ডন ও পরে ভিয়েনা যান। প্রায় বছর দেড়েক বিদেশে থাকাকালীন তিনি পাশ্চাত্য সঙ্গীত সন্বন্ধে জ্ঞান অর্জন করেন।
দেশে ফিরে তিনি গিটার,পিয়ানো,অ্যকডিয়ন ও পারকাসনের একটি অর্কেস্ট্রা পার্টির সদস্য হন। অনিরুদ্ধ নিজের প্রতিভা বলে নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে বিদেশী বাদ্যযন্ত্র গীটারকে দেশে জনপ্রিয়তার শীর্ষে নিয়ে গিয়েছিলেন। তিনি কিছু বাংলা ছায়াছবির সঙ্গীত পরিচালনার কাজ করেন। আকাশবাণী কলকাতা কেন্দ্রের তিনি জনপ্রিয় গিটারিস্ট ছিলেন।
বেতার অনুষ্ঠানে ‘ফিলার’-এ তার গিটারের সুর বাজত। এরপর এইচএমভি থেকে বহু গিটার বাদ্যের রেকর্ড করেন। কাজী অনিরুদ্ধ’র সহধর্মিণীর নাম কল্যাণী কাজী। কল্যাণী কাজী নিজেও একজন সঙ্গীত শিল্পী। অনিরুদ্ধের সঙ্গে তার বিয়ে হয় ১৯৫২ সালে।
তিনি লেখালেখিও করতেন। তাদেরও তিন সন্তান। অনিরুদ্ধ পরিবার কোলকাতায় থাকেন। কবির জীবদ্দশাতেই ১৯৭৪ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি মাত্র ৪৩ বছর বয়সে সঙ্গীত জগতের এই খ্যাতনামা গিটারিস্ট কবির কনিষ্ঠ পুত্র অনিরুদ্ধ কোলকাতায় অকালে মারা যান। শুধুমাত্র কাজী সব্যসাচী বাবা নজরুল ইসলামের মৃত্যুর পর ১৯৭৯ সালে মারা যান।
বিয়ের পর স্ত্রী আশালতার ঘরে কাজী নজরুলের ৪ সন্তান জন্ম নেয়। এর মধ্যে প্রথম ২ জনই খুব অল্প বয়সে মারা যান। প্রথম সন্তান কৃষ্ণ মুহাম্মদ জন্মের কয়েক মাস পরেই মারা যান। দ্বিতীয় সন্তান বুলবুল বেঁচে ছিলেন প্রায় ৩ – ৪ বছর। বুলবুল মারা যাওয়ার পর সন্তান হারানোর শোকে নিচের গানটি লিখেছিলেন কবি- ‘ঘুমিয়ে গেছে শ্রান্ত হয়ে আমার গানের বুলবুলি; করুণ চোখে চেয়ে আছে সাঁঝের ঝরা ফুলগুলি’।
কাজী নজরুলের চার পুত্রের নাম ছিল যথাক্রমে…
১। কাজী কৃষ্ণ মুহাম্মদ,
২। কাজী অরিন্দম খালেদ (বুলবুল),
৩। কাজী সব্যসাচী এবং
৪। কাজী অনিরুদ্ধ।
নামগুলো হিন্দু মুসলিম নামের সমন্বয়।
মুহাম্মাদ এর সাথে কৃষ্ণ জুড়ে দিয়েছেন,অরিন্দমের সাথে খালেদ। আজকের দিনে যদি কোন বাবা তার সন্তানের নাম কৃষ্ণ মুহাম্মদ রাখতেন,তাহলে তার পরিণতি কি হত ভাবতেও ভয় হয়। অথচ অসামান্য অসাম্প্রদায়িক নজরুল আজ থেকে প্রায় একশো বছর আগেই এই সাহস দেখিয়েছিলেন,গোঁড়ামি বা নিজের ধর্মকে শ্রেষ্ঠ ঘোষণা করতে অন্য ধর্মাবলম্বীদের ছোট করা বা অপমান করার অন্ধত্বের বিভেদ দূর করতে অসাম্প্রদায়িকতার জয়গান গেয়ে গেছেন!
আশালতার বিধবা মা গিরিবালা ১৯২৪ সালের ২৪ এপ্রিল কলকাতায় মেয়ের বিয়ে দেন কাজী নজরুলের সঙ্গে। মুসলমান পরিবারে জন্ম নেওয়া প্রায় বাউণ্ডেলে চাকরিহীন,বাসস্থানহীন,ব্রিটিশ সরকারের কুনজরে পড়ে জেলখাটা এক কবির সঙ্গে একমাত্র মেয়ের বিয়ে দিতে তাঁর সংস্কারে বাধেনি।
নজরুলের প্রতি কতটা গভীর স্নেহ থাকলে এমন করে সংস্কারের পুরোনো শৃঙ্খলা ভেঙে ফেলা যায় বিধবা গিরিবালা দেবি ছিলেন তাঁর প্রকৃষ্ট উদাহরণ।
তথ্যসূত্রঃ
# বংDoze
# কলকাতা থেকে প্রকাশিত বিভিন্ন সাহিত্য- সাময়িকী।