ক্রাইম ডেক্স:
১৯৫৫ সালের ২৬ ডিসেম্বর, মহারাষ্ট্রের রত্নগিরি জেলার খেদ গ্রামে জন্ম এক সাধারণ পরিবারে জন্ম হয় এক শিশুর, যার জন্যে পুরো পৃথিবীর সন্ত্রাসের গল্প ভিন্নভাবে লেখা হয়েছিল।
দাউদের বাবা ইব্রাহিম কাসকার মুম্বাই পুলিশের কনস্টেবল ছিলেন, মা আমিনা ছিলেন সাধারণ গৃহিণী।পরিবারটি ছোটবেলা থেকে দাউদকে শৃঙ্খলাপূর্ণ জীবনযাপন শেখানোর চেষ্টা করলেও দাউদ যেন জন্মেছিল সন্ত্রাসী হবার জন্যেই। তৎকালীন মুম্বাইয়ের সামাজিক বাস্তবতা—দারিদ্র্য, বেকারত্ব, বন্দরনির্ভর অবৈধ অর্থনীতি— দাউদ ইবরাহিমকে ধীরে ধীরে অপরাধের পথে ঠেলে দেয়। দাউদের পরিবার মুম্বাইয়ের ডোংরিতে চলে আসে—যেখানে অপরাধ থাকে প্রতিটি ছায়ার অন্ধকারে। এই অন্ধকারেই দাউদের সর্বনাশের শুরু। সে স্কুল ছেড়ে দেয় কিশোর বয়সেই। শুরু হয় ছোটখাটো চুরি, প্রতারণা। ডোংরিতে তখন হাজি মাস্তান, করিম লালা, ভারাদারাজান মুদালিয়ারের রাজত্ব। দাউদ প্রথমে যোগ দেয় বাশু দাদার গ্যাংয়ে, পরে তার বড় ভাই শাব্বিরের সঙ্গে মিলে গড়ে তোলে নিজস্ব দল—ডি-কোম্পানি।
দাউদ ইবরাহিম কাসকরের উত্থান কোনো হঠাৎ বিস্ফোরণ ছিলনা; এটি ছিল সময়, পরিস্থিতি ও সংগঠিত অপরাধের শূন্যস্থানকে কাজে লাগানোর এক দীর্ঘ প্রক্রিয়া। আশির দশকের শুরুতে মুম্বাই ছিল দ্রুত বদলে যাওয়া এক বাণিজ্যিক শহর, যেখানে বন্দর, আমদানি–রপ্তানি, চলচ্চিত্র শিল্প ও রিয়েল এস্টেটকে ঘিরে বিশাল অর্থনৈতিক প্রবাহ তৈরি হচ্ছিল। এই প্রবাহের ফাঁকফোকরেই গড়ে উঠছিল আন্ডারওয়ার্ল্ডের শক্ত ঘাঁটি। তরুণ দাউদ শুরুতে ছোটখাটো চোরাচালান ও অবৈধ লেনদেনে জড়ালেও খুব দ্রুত বুঝে নেয়—একক অপরাধ নয়, সংগঠিত নেটওয়ার্কই ক্ষমতার চাবিকাঠি।
সেই সময় মুম্বাইয়ের আন্ডারওয়ার্ল্ডে বিভিন্ন গোষ্ঠীর মধ্যে আধিপত্যের লড়াই চলছিল। দাউদ কৌশলে নিজের চারপাশে বিশ্বস্ত লোক জড়ো করে এবং পুরোনো গোষ্ঠীগুলোর দুর্বলতা কাজে লাগায়। প্রতিদ্বন্দ্বী গ্যাংগুলোর অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব, নেতৃত্বের শূন্যতা ও অর্থনৈতিক লোভ—সব মিলিয়ে সে ধীরে ধীরে নিজের জায়গা পাকাপোক্ত করে। বন্দরের পথ, হাওয়ালা লেনদেন, সোনা ও ইলেকট্রনিক্স চোরাচালান—এসব ক্ষেত্রে সে দক্ষতা দেখায় এবং আন্তর্জাতিক যোগাযোগ গড়ে তোলে। এখানেই তার উত্থানের মূল বাঁক: অপরাধকে সে কেবল স্থানীয় নয়, আন্তর্জাতিক ব্যবসার মতো পরিচালনা করতে শেখে।
দাউদের উত্থানকে ত্বরান্বিত করে আরেকটি বিষয়—সে সহিংসতার পাশাপাশি ভয় ও প্রভাবের রাজনীতি ভালো বুঝত। প্রত্যক্ষ সংঘর্ষ এড়িয়ে কখনো সমঝোতা, কখনো কৌশলগত দূরত্ব, আবার প্রয়োজন হলে শক্ত অবস্থান—এই মিশ্র পদ্ধতিতে সে প্রতিদ্বন্দ্বীদের কোণঠাসা করে তুলত। একই সঙ্গে বৈধ ব্যবসার আড়ালে অবৈধ অর্থ ঘোরানোর ব্যবস্থা গড়ে তোলে, যা তাকে দীর্ঘদিন ধরেই ধরা–ছোঁয়ার বাইরে রাখে। এভাবে আশির দশকের মাঝামাঝি এসে দাউদ ইবরাহিম মুম্বাইয়ের আন্ডারওয়ার্ল্ডে এক প্রভাবশালী নাম হয়ে ওঠে, আর তার সংগঠন- ডি–কোম্পানি—একটি বিস্তৃত নেটওয়ার্কে রূপ নেয়।
১৯৭০-এর শেষে শুরু হয় সোনা চোরাচালান, চাঁদাবাজি। কিন্তু উপরে উঠতে গেলে শত্রু তৈরি হয়। করিম লালার পাঠান গ্যাং (আমিরজাদা, আলমজেব, সামাদ খান) দাউদের দলকে চ্যালেঞ্জ করে। ১৯৮১ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি রাতে প্রভাদেবীর এক পেট্রোল পাম্পে ফাঁদে ফেলে গুলি করে খুন করা হয় দাউদের গ্যাং এর শাব্বিরকে। সামাদ খানের নির্দেশে আমিরজাদা, আলমজেবরা পাঁচ রাউন্ড গুলি চালায়। শাব্বিরের মৃত্যু দাউদের জীবন বদলে দেয়। সে প্রতিজ্ঞা করে পুরো পাঠান গ্যাং ধ্বংস করবে।
শুরু হয় মুম্বাইয়ের ইতিহাসের সবচেয়ে রক্তাক্ত গ্যাং ওয়ার। ১৯৮৩ সালে সেশনস কোর্টের বাইরে খুন হয় আমিরজাদা। ১৯৮৪ সালে দক্ষিণ মুম্বাইয়ের এক হোটেলে (বা রেস্তোরাঁয়) ফাঁদে ফেলে ২০টির বেশি গুলি চালিয়ে খুন করা হয় সামাদ খানকে—দাউদের লোকেরা (ছোটা রাজান সহ)। আলমজেব গুজরাতে এনকাউন্টারে মারা যায়। খুনের পর চলে পালটা খুন। সেই খুনের পর আবার খুন। এভাবে রাস্তায় রক্তের নদী বয়, পুলিশের চোখে ধুলো দিয়ে দাউদের দল উঠে আসে শীর্ষে।
১৯৮৬ সালে সামাদ খান হত্যার জন্য পুলিশের চাপে দাউদ পালিয়ে যায় দুবাইয়ে। সেখান থেকে ডি-কোম্পানি হয়ে ওঠে আন্তর্জাতিক—মাদক, অস্ত্র, হাওয়ালা, বলিউড চাঁদাবাজি। ছোটা শাকিল, টাইগার মেমন, আবু সালেম হয়ে ওঠে দাউদের ডান হাত। ১৯৯০-এর শুরুতে ডি কোম্পানির সদস্য ৫০০০-এর ওপর হয়ে যায়। কিন্তু ১৯৯২-এর বাবরি মসজিদ ধ্বংস এবং তার পরের দাঙ্গায় দাউদ ক্ষুব্ধ হয়। সে প্রতিশোধ নেয় ভয়ংকরভাবে।
১৯৯৩ সালের ১২ মার্চ: মুম্বাইয়ে দুপুর ১:৩০-এ প্রথম বিস্ফোরণ বোম্বে স্টক এক্সচেঞ্জের বেসমেন্টে—৫০ জন মারা যায়। পরের ২ ঘণ্টায় আরও ১২টি বিস্ফোরণ: এয়ার ইন্ডিয়া বিল্ডিং, হোটেল সি রক, জুহু সেন্টর, জবেরি বাজার, প্লাজা সিনেমা, ওরলি, পাসপোর্ট অফিস, মাহিম ফিশারম্যান কলোনি ইত্যাদি। মোট ১৩টি বিস্ফোরণে মারা যায় ২৫৭ জন নিরীহ মানুষ, আহত ১৪০০-এর বেশি। দাউদের স্মাগলিং রুট দিয়ে আরডিএক্স আনে টাইগার মেমন। পাকিস্তানের আইএসআই-এর সাহায্যে পরিকল্পনা। দাউদ দুবাই থেকে নির্দেশ দেয়। এতে সে হয়ে যায় গ্লোবাল টেররিস্ট।
বিস্ফোরণের পর দাউদ পালিয়ে যায় করাচিতে। ভারতের দাবি, সে আইএসআই-এর সুরক্ষায় ক্লিফটনে থাকে। বাংলাদেশের এক সময়ের কুখ্যাত আন্ডারওয়ার্ল্ড ডন কালা জাহাঙ্গীরের সাথে দাউদের বন্ধুত্ব ও যোগাযোগ ছিল শোনা যায়। এছাড়াও বাংলাদেশের সোনা ও মাদক চোরাচালানের কয়েকটা মামলায় দাউদের সংশ্লিষ্টতা আছে বলে শোনা গিয়েছিল বছর পনেরো আগেই।
বলিউডে দাউদ ইব্রাহিমের প্রভাব ছিল অন্যরকম। আশির দশকের শেষ ভাগ থেকে নব্বইয়ের শুরুর দিকে হিন্দি চলচ্চিত্র শিল্প দ্রুত বাণিজ্যিক রূপ নেয়—বড় বাজেট, বিদেশি শুটিং, তারকা-নির্ভর বাজার। এই প্রসারের সঙ্গে সঙ্গে কালো টাকা, অনানুষ্ঠানিক অর্থায়ন ও নিরাপত্তাহীনতা বাড়ে—যা আন্ডারওয়ার্ল্ডের অনুপ্রবেশের পথ খুলে দেয়। দাউদের ডি–কোম্পানি এই সুযোগকে কাজে লাগায়। দাউদ ওর কালো টাকা সাদা করার জন্য বলিউডে অর্থ লগ্নি করতে শুরু করে। এবং এই ভাবে সে প্রচুর টাকা সাদা করার সুযোগ পায়। কিন্তু ঠিক করে দিত কোন অভিনেতা অভিনেত্রী কাজ করবে- কে কাজ করবেনা। এভাবে সে বলিউডের এক মূর্তিমান আতংকে পরিণত হয়। হাওয়ালা নেটওয়ার্কের মাধ্যমে হওয়া অনেক সিনেমা সে আমলে বেশ নাম করেছিল। সে চাইলেই সিনেমা হয়ে যেত হিট। আবার কখনো সখনো সে চাইলেই নতুন আনকোড়া মুখ হয়ে যেত সুপারহিট। অনেক নায়িকাকে দাউদের ফোন কলের জন্যেই ভয়ে হোক বা টাকার লোভে দুবাই এ উড়ে যেতে হত, হতে হত প্রণয়াসঙ্গীনি- এটা ছিল বলিউডের ওপেন সিক্রেট মুখরোচক গল্প। সে সময় অনেক নায়ক নায়িকাকে বাধ্যতামূলক দুবাই এর বিভিন্ন স্টেজ শো তে যেতে হত, যেগুলোতে দাউদের ফাইন্যান্সিং আছে বলে গুজব ওঠে। যদিও কোন ঘটনাই প্রমাণিত হয়নি। ১৯৯৩–পরবর্তী সময়ে এবং নব্বইয়ের শেষভাগে সরকার মানি লন্ডারিং বিরোধী আইন, বিদেশি বিনিয়োগের স্বচ্ছ পথ, ব্যাংকিং সংস্কার—এসব জোরদার করে। এর ফলেই ধীরে ধীরে বলিউডে আন্ডারওয়ার্ল্ডের সরাসরি অর্থায়ন কমে আসে।
১৯৯৭ সালে গুলশন কুমারকে (টি-সিরিজের মালিক) ১২টি গুলি চালিয়ে খুন করা হয়। পুলিশের তদন্তে বের হয়ে আসে এই খুনের পেছনে ছিল দাউদ ইবরাহিম। গুলশান কুমার দাউদকে চাঁদা না দেওয়ায় এই হত্যা চালানো হয়। এছাড়াও জ্যোতির্ময় দে (সাংবাদিক, ২০১১), প্রমোদ মহাজনের মৃত্যুর সঙ্গে দাউদের নাম জড়িয়ে যায়।
২০২৫ সালেও দাউদ পলাতক অবস্থায় মারা গেছে বলে গুজব ছড়ায়। পাকিস্তানের এক হাসপাতালে দাউদের মৃত্যুর গুজব ওঠে। কিন্তু সে সত্যিই মারা গেছে কিনা সেটা এখনো অজানা। দাউদের উত্থান- সহিংসতার গল্প বলিউডকে অনুপ্রাণিত করেছে। D, Company, Once Upon a Time in Mumbaai সহ নানা সিনেমায় দাউদের জীবন উঠে এসেছে সেলুলয়েডে। কিন্তু বাস্তবে দাউদ ইবরাহিম সন্ত্রাসের এক অন্ধকার অধ্যায়, যা মুম্বাইকে চিরকাল বদলে দিয়েছে, সেলুলয়েডে যা সত্যিই ধারণ করা সম্ভব হয়নি।
তথ্য সূত্রঃ ছবি ও তথ্য ইন্টারনেট;থেকে সংগৃহীত।