এম রাসেল সরকার :
নব্বইয়ের দশকের ঢাকার আন্ডারওয়ার্ল্ডের সেই রক্তক্ষয়ী দিনগুলোর স্মৃতি ফিরে আসছে। ২০০০ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর পুরান ঢাকার জজকোর্ট চত্বরে শীর্ষ সন্ত্রাসী হুমায়ুন কবীর ওরফে মুরগি মিলনকে যেভাবে প্রকাশ্য দিবালোকে ঝাঁঝরা করে দেওয়া হয়েছিল, ঠিক প্রায় একই কায়দায় সম্প্রতি নিউ মার্কেট এলাকায় খুন হয়েছেন আরেক শীর্ষ সন্ত্রাসী খন্দকার নঈম আহমেদ টিটন। এই হত্যাকাণ্ডকে কেন্দ্র করে আন্ডারওয়ার্ল্ডে নতুন করে মেরুকরণ ও রক্তক্ষয়ী সংঘাতের আশঙ্কা করছেন অপরাধ বিশেষজ্ঞরা।
২০০০ সালের সেই দিনটিতে আদালত চত্বরে মুরগি মিলনকে হত্যার মিশনটি ছিল গা শিউরে ওঠার মতো। ককটেল বিস্ফোরণ ঘটিয়ে আতঙ্ক সৃষ্টি করে কালা জাহাঙ্গীরের অনুসারীরা মিলনকে পাখির মতো গুলি করে হত্যা করে। সেই হত্যার পর রাজধানী জুড়ে শুরু হয়েছিল ‘সেভেন স্টার’ ও ‘ফাইভ স্টার’ গ্রুপের মধ্যে পাল্টাপাল্টি খুনের মহোৎসব। বর্তমান পরিস্থিতিতে টিটন হত্যাকাণ্ড আন্ডারওয়ার্ল্ডের সেই পুরনো স্মৃতিকেই নতুন করে উসকে দিচ্ছে।
দীর্ঘ ১৬ বছর আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ‘ক্রসফায়ার’ ও কঠোর নজরদারিতে ঢাকার আন্ডারওয়ার্ল্ড অনেকটা নিষ্ক্রিয় ছিল। অনেকে প্রাণ বাঁচাতে কারাগারকেই নিরাপদ আশ্রয় মনে করেছিলেন। তবে ৫ আগস্ট পরবর্তী পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে একে একে কারামুক্ত হয়েছেন, সুইডেন আসলাম (তেজগাঁওয়ের আলোচিত সন্ত্রাসী), কিলার আব্বাস (মিরপুরের আতঙ্ক), পিচ্চি হেলাল (মোহাম্মদপুর এলাকা), ফ্রিডম রাসু ও খন্দকার নঈম আহমেদ টিটন (হাজারীবাগ এলাকা), সানজিদুল ইসলাম ইমন (ধানমন্ডি-হাজারীবাগ এলাকা, বর্তমানে বিদেশে)।
আন্ডারওয়ার্ল্ড সংশ্লিষ্টদের মতে, জোসেফ আহমেদ যেমন দীর্ঘ ২৭ বছর পর তার ভাই হত্যার বদলা নিয়েছেন, তেমনি টিটনের বোন জামাই সানজিদুল ইসলাম ইমন কিংবা টিটনের অনুসারীরা এই হত্যার পর হাত গুটিয়ে বসে থাকবে না। ফলে রাজধানীতে আবারও ‘গ্যাং কালচার’ ও এলাকাভিত্তিক আধিপত্য বিস্তারের লড়াই শুরু হওয়ার প্রবল আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
সরকার পরিবর্তনের পর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাঠামোয় যে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে, তাকেই অপরাধীরা সুযোগ হিসেবে নিচ্ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। পুলিশের কাছে অনেক নতুন ও পুরনো অপরাধীর হালনাগাদ তথ্য নেই। ডিএমপির গোয়েন্দা শাখার (ডিবি) অতিরিক্ত কমিশনার শফিকুল ইসলাম অবশ্য দাবি করেছেন, “জামিনে বের হয়ে কেউ যেন নতুন অপরাধে জড়াতে না পারে, সেজন্য আমাদের কঠোর নজরদারি রয়েছে। অপরাধী যেই হোক, তাকে ছাড় দেওয়া হবে না।”
অপরাধ বিশ্লেষক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক তৌহিদুল হক বলেন, শীর্ষ সন্ত্রাসীরা যখন কারাগারে থাকে, তখনও তারা বাইরে নিজেদের নেটওয়ার্ক নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করে। এখন তারা জামিনে মুক্ত হয়ে সরাসরি মাঠে নামছে। পুলিশের নিষ্ক্রিয়তা বা গোয়েন্দা তথ্যের অভাব থাকলে এই সন্ত্রাসীরা পুরনো হিসাব মেলাতে আরও হিংস্র হয়ে উঠতে পারে, যা জননিরাপত্তার জন্য চরম হুমকি।”
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সন্ধিক্ষণে অপরাধীরা সবসময়ই প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করে। অতীতের ‘মুরগি মিলন’ হত্যাকাণ্ডের পর ঢাকা যেমন অস্থির হয়ে উঠেছিল, টিটন হত্যার পর সেই একই ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি ঘটার আগে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে সর্বোচ্চ সতর্ক থাকতে হবে।
কারাগার থেকে বের হওয়া শীর্ষ সন্ত্রাসীদের গতিবিধি নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে এবং পুলিশি নজরদারি জোরদার না হলে ঢাকার রাজপথ আবারও অপরাধীদের অভয়ারণ্যে পরিণত হতে পারে। আন্ডারওয়ার্ল্ডের এই ‘ফিল্মি স্টাইল’ কিলিং মিশনগুলো বন্ধ করাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ।