শিরোনাম :
আমেরিকা-ইসরাইলী আগ্রাসনে নিহত মুসলিম বিশ্বের শীর্ষ নেতা গণ এর তালিকা। সন্ত্রাস চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে নতুন আইজিপির জিরো টলারেন্স নীতি। বিখ্যাত গিটারিস্ট কাজী অনিরুদ্ধ এবং কিছু স্মৃতিচারণ। ডিসি অফিস এলাকা থেকে ২২ মামলার আসামি ‘মাদক সম্রাট’ জসিম গ্রেপ্তার। নরসিংদীতে আলোচিত মিজান মিয়া ওরফে হৃদয় হত্যা মামলার প্রধান আসামী গ্রেফতার। সেহরির পরপরই সং/ঘ/র্ষে জড়ালো দুই গ্রুপ, বাবা ছেলেসহ প্রাণ গেল ৪ জনের। বিখ্যাত চলচ্চিত্র পরিচালক ক্যাপ্টেন এহতেশাম এবং তার চলচ্চিত্র জীবন। বিখ্যাত চলচ্চিত্রাভিনেত্রী সাবিত্রী চট্টোপাধ্যায় এর অজানা তথ্য। শিক্ষা মন্ত্রী এহসানুল হক মিলনের শিক্ষাগত যোগ্যতা। মন্ত্রী পরিবারের সন্তান এবার ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জামানত হারালেন।
বুধবার, ০৪ মার্চ ২০২৬, ১০:৫৬ পূর্বাহ্ন

নরসিংদীর ডন,ঘোড়াশালের রং#বাজ ইমরান এর অজানা কাহিনি।

Reporter Name / ৮৬ Time View
Update : বৃহস্পতিবার, ৮ জানুয়ারী, ২০২৬

 

মেহেদী মোল্লা:

আমাদের দেশের আন্ডারওয়ার্ল্ডের গল্পগুলো রোমাঞ্চকর। কিন্তু কাজী আবু এমরানের জীবনটা যেন একটা থ্রিলার সিনেমা – শুরুতে দুর্ধর্ষ রংবাজ, ব্যাংক ডাকাত, খুনি, রাজনৈতিক মাস্তান; শেষে সব ছেড়েছুড়ে আধ্যাত্মিক গুরুতে পরিণত হওয়া, আর মরার পর তার কবর হয়ে যায় মাজার শরিফ! লোকে আজও সেখানে গিয়ে মানত করে, আগরবাতি জ্বালায়। এমন আজব জীবন আর কয়জনের হয়?

রংবাজ এমরানের পুরো নাম কাজী আবু এমরান। বাবা কাজী আবদুস সামাদ, গ্রামের বাড়ি ঘোড়াশালের পাঁচদোনা গ্রামে (নরসিংদী জেলা)। ঢাকায় তাদের বাড়ি ছিল জিগাতলায়। পরিবারটা সচ্ছল, কোনো অভাব ছিল না। ফরিদপুরের ভাঙ্গা থেকে এসএসসি পাস করে ভর্তি হয় তৎকালীন কায়েদে আযম কলেজে (সোহরাওয়ার্দি কলেজ)। মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানি বাহিনী তাকে গ্রেফতার করে – পুরো যুদ্ধকালীন সে সময়টা জেলে কাটান তিনি। সে সময় পাকিস্তানীরা নির্যাতন করে অসুস্থ বানিয়ে দিয়েছিল ওনাকে। যুদ্ধের পর তিনি জেল থেকে মুক্তি পান। এরপর প্রবেশ রাজনীতিতে। প্রথমে ছাত্র ইউনিয়ন (মেনন গ্রুপ), তারপর বাংলা ছাত্র ইউনিয়ন, অতঃপর ভাসানী ন্যাপ (মশিউর রহমানের দল)। ভাসানী ন্যাপ বিএনপিতে বিলীন হওয়ার পরে অনেক পরে এমরান বিএনপিতে যোগ দেন। ১৯৯১ সালের জাতীয় নির্বাচনে লড়েন, কিন্তু হেরে যান।

কিন্তু এমরানের আসল পরিচয় ছিল আন্ডারওয়ার্ল্ডের ডন হিসেবে। স্বাধীনতার পরপরই পথভ্রষ্ট হয়ে যান তিনি। তিনি সেই সময় করেননি এমন অপকর্মটি নেই। দেশের অধিকাংশ বড় ব্যাংক ডাকাতির পিছনে তার নাম উঠে আসত। টাকাপয়সার অভাব না থাকলেও ডাকাতি করতেন ধুমসে – যেন অপরাধকে তিনি একটা শিল্পের পর্যায়ে নিয়ে গিয়েছিলেন। নিজের মতো ডাকাবুকো কিছু তরুণদের নিয়ে দুর্ধর্ষ একটা গ্রুপ গড়ে তোলেন তিনি। তার গ্রুপে ছিল গুলিস্তানের জাফরের মতো পেশাদার খুনিরা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মুহসীন হলের ছয়তলায় একটা রুমে দীর্ঘদিন থেকেছেন তিনি। ব্যাংকে ঢুকতেন- অস্ত্র দেখিয়ে লুটে নিয়ে গাড়ি নিয়ে পালিয়ে যেতেন তিনি। ধুমাধুম গুলি চালিয়ে দিতেন। ব্যাস- সবাই ভয়ে পালাতো। এভাবেই তিনি যুদ্ধবিধবস্থ দেশে চালিয়েছিলেন একের পর এক ডাকাতি, ব্যাংকডাকাতি, হত্যা। দিনে দুপুরে গুলি চালাতেন তিনি। কোন রাখঢাক ছিলোনা।

কাজী আবু এমরানের ব্যক্তিগত জীবন ছিল ট্রাজিক। ১৯৭২ সালে বেনজীর আহমেদের একমাত্র মেয়ে মুন্নিকে বিয়ে করেন তিনি। কিন্তু তার অপরাধমূলক জীবনের কারণে স্ত্রীর সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন হয়ে যায়। স্ত্রীকে নিয়ে বিদেশে ও চলে গিয়েছিলেন পরিবারের চাপে- কিন্তু প্রতিশোধ নেয়ার নেশায় দেশে এসে অপরাধ করেছিলেন বলে ছাড়াছাড়ি হয়ে যায় ওনাদের।

এমরানের সবচেয়ে বড় চাঞ্চল্যকর অপরাধগুলোর মধ্যে একটা ১৯৭৩ সালে ফজলুল হক মণি হত্যাচেষ্টা । সেদিন সন্ধ্যা ৭টায় মতিঝিলের ‘বাংলার বাণী’ অফিসের সামনে ৬-৭ জনের একটা দুর্ধর্ষ অস্ত্রধারী গ্রুপ অবস্থান নিয়েছিল। তাদের হাতে স্টেনগান, পিস্তল, গ্রেনেড। টার্গেট – বঙ্গবন্ধুর ভাগ্নে, দৈনিক বাংলার বাণীর সম্পাদক ও যুবলীগ চেয়ারম্যান শেখ ফজলুল হক মণি হ ত্যা। পুরো পরিকল্পনা এমরানের। কিন্তু তার গাড়িচালক খবর ফাঁস করে দেয়, মণির বদলে চলে আসে পুলিশ। দুই পক্ষের প্রচণ্ড গোলাগুলি চলে-শেষে পেরে ওঠেনা এমরানের দল। এমরান ধরা পড়েন। জেলে চলে যান এমরান। কিন্তু বার বার জেলখানায় গিয়েও তিনি শোধরাননি। ফিরে এসে আবারো অপরাধে জড়াতেন।

১৯৭৫-এ জেল থেকে ছাড়া পেয়ে আবার ব্যাংক ডাকাতি শুরু। ১৯৭৭-এর শেষ দিকে পরিবারের পীড়াপিড়িতে স্ত্রীকে নিয়ে ইরান হয়ে জার্মানি চলে যান তিনি। কিন্তু ১৯৭৯-এ একটা “শেষ মিশন” নিয়ে দেশে ফিরে আসেন। স্ত্রী বারবার মিনতি করে নিষ্ঠুরতা ছেড়ে দেয়ার জন্য, কিন্তু এমরান শোনে না। বলে, “আমার জীবনের একটা শেষ কাজ আছে, ওটা না করলে শান্তি পাব না।” সেই শেষ কাজটাই ছিল রহমান-দুলাল হত্যা।

১৯৮১ সালের ৭ মে। রাজধানীর বিজয়নগরে (পল্টনের কাছে) শ্রমিক নেতা আবদুর রহমান (ঘোড়াশাল শ্রমিক লীগের সভাপতি) আর উদীয়মান সাংবাদিক ফেরদৌস আলম দুলাল (বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থার সিনিয়র রিপোর্টার)কে রিকশায় বসা অবস্থায় ফিল্মি কায়দায় খুন। একটা ভেসপা মোটরবাইকে তিনজন এসে রিকশার সামনে ব্যারিকেড দিয়ে গুলি চালায়। রহমানের শরীর ঝাঁজরা, দুলালের মাথা ভেদ করে বুলেট। ঘটনাস্থলেই দুজনের মৃত্যু। প্রধান টার্গেট ছিল রহমান, ঘোড়াশালের রাজনীতিতে তার সবচেয়ে বড় বাধা। সাংবাদিক দুলাল ছিলেন অনিচ্ছাকৃত শিকার। খুনের পর সোজা অফিসে গিয়ে স্ত্রী মুন্নিকে ফোন করে বলে, “মুন্নি, আমার কাজ শেষ। আমি আসছি।”

কিন্তু বিধি বাম- তিনি স্ত্রীর কাছে যেতে পারেন নি। সোজা গ্রেফতার হন, দীর্ঘদিন জেলে থাকেন।

একবার জিগাতলা থেকে ছিনতাই করে পালাতে গিয়ে দেওয়াল টপকানোর সময় পিছন থেকে পুলিশের গুলি খান পায়ে। তার সহযোগী সাঈদ, বুলবুল, সাহাবুদ্দিনও ধরা পড়ে। রাজনৈতিক প্রভাবে (মশিউর রহমানের) ছাড়া পান তিনি, কিন্তু সহযোগীরা ছাড়া পায়নি। পরে ফিল্মি কায়দায় জেল ভেঙে তাদের বের করে এমরান নিজেই। হাল আমলে এরকম কিছু হলে ভেবে দেখেন কতোটা বিভৎস ঘটনা ঘটতো, কিন্তু সেই আমলে এসব ছিল ওনার কাছে দুধভাত।

হঠাৎ করে সব ছেড়েছুড়ে দেন তিনি। তিনি ঠিক করেন রাজনীতিতে মন দেবেন। ব্যাস- তিনি নির্বাচন করার জন্যে নেমে গেলেন। কিন্তু পারলেন না। হেরে গেলেন তিনি।নির্বাচনে হারার পর রাজনীতি থেকে ধীরে ধীরে মন উঠে যায়। ঘোড়াশালে ফিরে আসেন। এবার মনে হল- তিনি আধ্যাত্মিক গুরু হবেন। ব্যাস- সাধারণ কাপড় ছেড়ে সাদা থান কাপড় পরা শুরু করেন তিনি, চুল-দাড়ি লম্বা করে নিজেকে ধর্মীয় গুরু হিসেবে সবার সামনে হাজির হলেন। ধর্মীয় একটা তরিকায় নিজেকে আবদ্ধ করে ফেললেন তিনি। নিজের বাড়িতেই গড়ে ওঠে খানকা। লোকজন আসতে থাকে তার কাছে – রীতিমতো ধর্মীয় মুরব্বি হয়ে ওঠেন তিনি। ১৯৯৭ সালের ৯ আগস্ট তিনি ইন্তেকাল করেন। পীর ফকিরদের আস্তানার মধ্যেই ওনাদের কবর দেয়া হয়। তাই ওনার আস্তানার কাছেই তাই ওনাকে দাফন করা হয়। তাঁর কবর রাতারাতি মাজারে পরিণত হয়! ঘোড়াশাল বাজারের কাছে বড় মাজারটা এখন তারই। ভক্ত-আশেকানরা ওনার মাজারে যায় , আগরবাতি-মোমবাতি জ্বালায়, মানত করে। প্রতি বছর ওনার মৃত্যুদিনে ওরস হয়, প্রচুর লোকের সমাগম।

একজন রংবাজ যে একসময় ফ্রাঙ্কেনস্টাইনের দানবের মতো নৃশংস খুন করতেন, সেই লোক শেষমেষ পীরের মর্যাদা পেয়ে গেলেন! শুধু বাংলাদেশ না- পৃথিবীতেই এমন নজির খুব কম আছে।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category