বশীর আহমেদ:
ঢাকা -দিল্লি বিরোধ এখন চরমে। স্মরণকালে দুই দেশের মধ্যে এমন তিক্ত সম্পর্ক আর চোখে পড়েনি। ভারতে অবস্থিত বাংলাদেশের কূটনৈতিক মিশনগুলোতে অব্যাহতভাবে হিন্দু জঙ্গীদের হামলা অগ্নিসংযোগ ও কুটনীতিকদের হত্যার হুমকির মতো ঘটনা নজিরবিহীন। মুদি সরকারের মদদে শত শত উগ্রবাদী হিন্দু বাংলাদেশের মিশনগুলোতে একের পর এক সহিংস বিক্ষোভ হামলা চালিয়ে যাচ্ছে বলে জানা গেছে।
এসব ঘটনা নিশ্চিত ভাবেই পূর্ব পরিকল্পিত বলে মনে করে সরকার মঙ্গলবার ঢাকায় ভারতীয় হাই কমিশনার প্রণয় ভার্মাকে তলব করে এই বক্তব্য সাফ জানিয়ে দেওয়া হয়েছে। এ ধরনের ঘটনা কেবল কুটনৈতিক কর্মীদের নিরাপত্তার জন্য হুমকি নয় বরং পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ শান্তি ও সহনশীলতার মূল্যবোধেরও পরিপন্থী।
গতকাল দিল্লিতে বাংলাদেশ হাই কমিশনের সামনে উগ্রবাদী হিন্দুদের বিক্ষোভকে ঘিরে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে।হিন্দুত্ব বাদী সংগঠন বিশ্ব হিন্দু পরিষদ(ভিএইচপি) ও বজরং দলের শত শত কর্মী হাইকমিশনের সামনে জড়ো হয়ে বিক্ষোভে অংশ নেয়। সেখানে বাংলাদেশ বিরোধী চরম উস্কানিমূলক স্লোগানের পাশাপাশি অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড.
মোঃ ইউনুসের কুশ পুত্তলিকা পুড়ানো হয়। বাংলাদেশে হিন্দু ধর্মাবলম্বী ময়মনসিংহের দীপু দাস হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে এই বিক্ষোভ আয়োজন করা হয় বলে দাবি আয়োজকদের। ঐদিন গেরুয়া পতাকা হাতে স্লোগান দিতে দিতে কূটনৈতিক এলাকার দিকে অগ্রসর হলে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে, তারা পুলিশ ব্যারিকেড ভেঙ্গে সামনে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে।
প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, উগ্রপন্হিরা অন্তত দুটি স্তরের ব্যারিকেড ভেঙ্গে ফেলে। পরিস্থিতি সামাল দিতে পুলিশ ও আধা সামরিক বাহিনীর সদস্যরা বাঁধা দিলে উভয় পক্ষের মধ্যে ধাক্কাধাক্কি ও সংঘর্ষ হয়। বিক্ষোভ কারীরা প্লেকার্ড ও ব্যানার হাতে স্লোগান দেন সেখানে বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মোঃ ইউনুস এর কুশপুত্তলিকা পোড়ানো হয়।
পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে বেশ কয়েকজন বিক্ষোভকারীকে আটক করে এলাকা থেকে সরিয়ে নেয়। পরে ফের ব্যারিকেড বসিয়ে হাইকমিশনের চারপাশে নিরাপত্তা জোরদার করা হয় এর আগে সম্ভাব্য বিক্ষোভের কথা মাথায় রেখে বাংলাদেশ হাইকমিশনের সামনে তিন স্তরের নিরাপত্তা বলয় গড়ে তোলা হয়। সন্ধ্যায় একই এলাকায় আবারও মিছিল করে বামপন্থী দলগুলো। কিন্ত ২০০ মিটার আগেই থামিয়ে দেয় পুলিশ।ভারতের কমিউনিউস পার্টি( মার্কসবাদী) সিপিআই, সমাজতন্ত্রী দল, এসএসপি ফরওয়ার্ড ব্লক এতে অংশ নেয়।
ভারতের হাইকমিশনার কে তলব :
ঢাকায় নিযুক্ত ভারতীয় হাই কমিশনার প্রণয় ভার্মাকে তলব করে নয়া দিল্লি ও শিলিগুড়িতে বাংলাদেশের কুটনৈতিক স্থাপনায় হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনায় গভীর উদ্বেগ জানিয়েছে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। এসব ঘটনাকে পূর্বপরিকল্পিত সহিংসতা ও ভয়ভীতি প্রদর্শন উল্লেখ করে তীব্র নিন্দা জানায় বাংলাদেশ সরকার। এ ধরনের ঘটনা কেবল কুটনৈতিক কর্মীদের নিরাপত্তার জন্য হুমকি নয়, বরং পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ ও সহনশীলতার মূল্যবোধেরও পরিপন্থী।
উল্লেখ্য গত শনিবার রাতে দিল্লিতে একদল হিন্দু উগ্রবাদী ভারত সরকারের সম্মতিতে নিরাপত্তা বেষ্টনী পার হয়ে হাউসে হামলা এবং হাই কমিশনার কে হত্যার হুমকি দেওয়ার পর ভারত -বাংলাদেশ সম্পর্কে চরম অস্থিরতা শুরু হয়। তারপর অব্যাহতভাবে মিশনগুলোতে হামলার কারণে দিল্লি সম্পর্ক স্মরণকালের মধ্যে সবচেয়ে নাজুক পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছে। নিরাপত্তা বেষ্টনী পার হয়ে বাংলাদেশ হাউজের মূল ফটকের সামনে বিক্ষোভ,অগ্নিসংযোগ এবং ভারতে নিযুক্ত বাংলাদেশের হাইকমিশনার রিয়াজ হামিদুল্লাহ কে হত্যার হুমকির মতো নজিরবিহীন ঘটনা ঘটেছে। অখন্ড হিন্দু রাষ্ট্র সেনার অন্তত ২০ থেকে ২৫ জনের একটি উগ্রবাদী দল ৪/৫ টি গাড়িতে করে সব নিরাপত্তা বেষ্টনিপার হয়ে বাংলাদেশ হাউজের মূল ফটকের সামনে চলে আসে এ সময় তারা বাংলাদেশ বিরোধী স্লোগান দিতে থাকে। তাদের মধ্যে কয়েকজন চিৎকার করে হাইকমিশনারের উদ্দেশ্যে বলতে থাকে শালাকে গুলি করে মার ইত্যাদি ইত্যাদি।
বাংলাদেশের কুটনৈতিক মিশন গুলোতে উগ্র হিন্দুদের হামলা, ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ সহ কর্মরত বাংলাদেশী কুটনৈতিকদের হত্যার হুমকির প্রতিক্রিয়ায় দিল্লিতে বাংলাদেশ হাইকমিশন ভারতীয় নাগরিকদের অনির্দিষ্ট কালের জন্য ভিসা সার্ভিস বন্ধ করে দিয়েছে।
তাছাড়া গত সোমবার পশ্চিমবঙ্গের শিলিগুড়িতে অবস্থিত বাংলাদেশ ভিসা সেন্টারে হামলা চালিয়ে তছনছ করে দিয়েছে উগ্রবাদী হিন্দুরা। বেলা দুইটার দিকে লক্ষষ বানশালের নেতৃত্বে বিশ্ব হিন্দু পরিষদ এবং হিন্দু জাগরণ মঞ্চের ৮০০থেকে ১০০০ হিন্দু উগ্রবাদী শিলিগুড়িতে অবস্থিত বাংলাদেশ ভিসা সেন্টার অভিমুখে যাত্রা করে।
তারা নানা ধরনের বাংলাদেশ বিরোধী প্লেকার্ড হাতে নিয়ে সেখানকার নিরাপত্তা কর্মীদের কোন রকম বাঁধা ছাড়াই ভিসা সেন্টারে উপস্থিত হয়। একপর্যায়ে উস্কানিমূলক স্লোগান দিতে দিতে ব্যাপক ভাংচুর চালায়। এ সময়ে ভিসা সেন্টারের বাইরে অগ্নি সংযোগের ঘটনাও ঘটে।
বাংলাদেশ হাইকমিশন সূত্রে জানা গেছে, পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভার বিরোধী দলীয় নেতা শুভেন্দু অধিকারীর নেতৃত্বে শত শত উগ্রবাদী হিন্দুরা কলকাতায় অবস্থিত বাংলাদেশ মিশনে আক্রমণের চেষ্টা চালায়। পুলিশের বাঁধা সত্ত্বেও তারা বাংলাদেশ মিশনের ২০০ মিটার ভেতরে ঢুকে পড়ে সেখানে চরম উস্কানিমূলক বাংলাদেশ বিরোধী স্লোগানের পাশাপাশি অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড.ইউনুস এর কুশ পুত্তলিকা দাহ করে।
বিষয়টি নিয়ে ভারত -বাংলাদেশ আন্ত:সম্পর্কে টানা পোড়েন চলছে।
তথ্যসূত্র:
* দৈনিক আমার দেশ
* দৈনিক নয়াদিগন্ত
* বিবিসি বাংলা
ছবি- ইন্টারনেট থেকে সংগৃহিত।